সরকার যখন ড্রিলের পদ্ধতি এভাবে বদলালেন যে দাঁতে কার্তুজ কেটে বন্দুক ভর্তি করা অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়লো, তখন প্রধান সেনাপতির এরকম নির্দেশ সত্য সত্যই আপত্তিকর। মীরাটের লেফটেনান্ট কর্নেল হুগ উল্লেখ করেছেন ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে, কার্তুজের পেছনটা ছিঁড়ে ফেলা হলে দাঁতে কামড়ানো বন্ধ করা যেতো। অন্যান্য অফিসারেরাও তা সমর্থন করেছেন। এ ব্যাপারে গভর্ণর জেনারেল প্রধান সেনাপতির কাছে লিখেছিলেন এবং তার জবাব দেবার পূর্বেই দমদমে বন্দুকে টোটা ভর্তি করা বন্ধ করতে নির্দেশ দান করলেন। ৫ই মার্চ সরকার দাঁতে কামড়িয়ে টোটা ভর্তি করা বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেপাইদের কাছ থেকে এই নির্দেশটি গোপন রাখা হয়। মে মাসের পয়লা দিকে লখনৌতে বিপদের লক্ষণ দেখা গেলো। আমবালার ঘটনার খবর সে সময়ে অয্যোধ্যায় এসে পৌঁছেছিলো কিনা সে বিষয়ে কিছু জানার উপায় নেই। অফিসারদের আপত্তি সত্ত্বেও সেপাইরা কার্তুজ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলো এবং দাঁতে কামড়াতে অস্বীকৃতি জানালো। দু’মাস আগে কার্তুজের প্রচলন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, অথচ তাদের দাঁতে কেটে কেনো বন্দুকে পুরতে হবে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। কোম্পানীর সেপাইদের সঙ্গে অযোধ্যার সেপাইদের পরিচয় খুবই সাম্প্রতিক। স্যার হেনরী লরেন্সের মতো সুবিবেচক চীফ কমিশনার, যিনি ভারতবর্ষ এবং ভারতবাসীকে ভালো করে চেনেন, তাঁর শাসনের সময়েও এমন বিক্ষোভের প্রবল হাওয়া ছড়িয়ে পড়তে পারলো। তা-ই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। এখানে উল্লেখ্য যে অযোধ্যার ৭নং অনিয়মিত পদাতিক বাহিনী কার্তুজ নিতে গররাজি হলো না, কিন্তু দাঁত দিয়ে কাটতে অস্বীকার করলো। মার্চের ৩ তারিখে স্যার হেনরী লরেন্সের কাছে খবর দেয়া হলো অযোধ্যার ৭নং অনিয়মিত বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে খুন-খারাবীর নেশায় মেতে উঠেছে। তিনি তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। গুলিভর্তি বন্দুকের সামনে থেকে বিদ্রোহীরা পলায়ন করলো। এক’শ বিশজন সেপাই মাটিতে অস্ত্র রেখে দিলো। সরকার বিদ্রোহীদের রুটিন মাফিক শাস্তি দিতে মনস্থ করলেন।
মে মাসের ৪ তারিখে ব্যারাকপুরের মঙ্গল পান্ডের রেজিমেন্টকে ভেঙ্গে দেয়া হয়। সেপাইদের কাছ থেকে ইউনিফর্ম কেড়ে নেয়া হলো। এ খবর সমস্ত ঘাঁটিগুলোতে পড়ে শোনানো হলো। তাদের সমপেশার অন্যান্য সেপাইরা শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের নিন্দা করার বদলে বীরের সম্মান দেবে এ কথা কর্তৃপক্ষ ভাবতেও পারেনি। এ সেপাইরাও ধর্মের কারণে পার্থিব সমস্ত কিছুর মায়া মোহ পরিত্যাগ করেছিলো। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, ধর্মপ্রচারক কর্ণেল এস. জি. হুইলার ছিলেন ৩৪নং রেজিমেন্টের কম্যান্ডার।
১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম সরকারকে অস্ত্রের সাহায্যে উৎখাত করার জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। সরকার যদি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেপাইদের বিক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা করতো তাহলে জল্পনা কল্পনার প্রয়োজন হতো না। সম্মানবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো বিদেশী সরকার কর্তৃত্ব বিস্তার করতে পারে না। তা হলে তার শক্তির মূল উৎসেই আঘাত আসবে। অনেক অফিসার সত্তাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে সেপাইদের দাবির সামনে শৈথিল্য প্রদর্শন করা উচিত হবে না। কারণ এ ধরণের শৈথিল্য দুর্বলতারই পরিচয় দিয়ে থাকে। অবিশ্বাসী সেপাইদের জেনারেল হীয়ার্সে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে সেপাই এবং দেশীয় অফিসারদের চর্বি সম্বন্ধে কথা বলার জন্য শাস্তিও দান করা হলো। ১৯নং রেজিমেন্টে যেমনটি ঘটেছে, তেমনি সম্পূর্ণভাবে রেজিমেন্টের বিলুপ্তিকরণ সৈন্যদের আতংক কমানোর চাইতে বরঞ্চ বহুল পরিমাণে বাড়িয়েই দিয়েছিলো। আমবালার ব্যাপারে প্রধান সেনাপতি খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সুবিবেচনাকে তো তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন বরঞ্চ ন্যায় নীতির খেলাফ করেছেন। সেপাইরা বুঝে নিলো তাদের অসুবিধার সময়ে তারা উধ্বতন অফিসারদের কোনো সহানুভূতি পাবে না। যদিও ব্যক্তিগতভাবে হুগ মার্টিনো এবং বন্টেনের মতো অফিসারেরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। যদি মনে করে থাকে সরকার তাদেরকে দিয়ে জোর করে কার্তুজ ব্যবহার করাতে চায় তা হলে মোটেও অন্যায় করেনি। আরো দুঃখজনক হলো, অবিবেচক অফিসারেরা আপন ইচ্ছামতো কাজ করেছে এবং স্যার হেনরী লরেন্স মে মাসের প্রথম দিকে সম্ভবতঃ তাঁর অতি উৎসাহী সহকর্মীদের দ্বারা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আগের মাসে শৃঙ্খলার একনিষ্ঠ রক্ষাকর্তারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার ফলশ্রুতিস্বরূপ ১০ই মে তারিখে প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়।
মীরাটের ৩নং দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনী পরিচালনা করতেন কারমাইকেল স্মিথ। তিনি ছিলেন আত্মমতসর্বস্ব এবং গোঁয়ার মানুষ। অধীনস্থ সেপাইরা তাকে পছন্দ করতো না। যে সকল ঘটনা ঘটে গেছে তার প্রেক্ষিতে বিচার করলে তাকে কিছুতেই সাহসী বলা যায় না। ৩১মে তারিখে স্থিরীকৃত উপমহাদেশ জুড়ে বিদ্রোহের পরিকল্পনা বানচাল করে তিনি উপমহাদেশকে রক্ষা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি যদি সে রকম ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেন, তাহলেও তিনি সমপেশার কম্যান্ডিং অফিসারকে তা জানাননি। ২৩শে এপ্রিল তারিখে তিনি নির্দেশ দিলেন, পরের দিন সকালে এক প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে। তাতে সমস্ত রেজিমেন্ট নয়, বিভিন্ন বাহিনীর মাত্র নব্বই জন সেপাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় ছিলো। কর্ণেল তার অধীনস্থ সেপাইদের দেখাতে চাচ্ছিলেন কিভাবে দাঁতে না কামড়ে হাত দিয়ে বন্দুক কার্তুজ প্রবিষ্ট করাতে হয়। এর আগে সেপাইদের নতুন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। সুতরাং কোনো রকমের কোনো ভয়ের কারণ ছিলো না। অধিকন্তু তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুরাই চর্বি মাখানো কার্তুজকে ভয় করে মুসলমানদের মধ্যে সে রকম কোনো সংস্কার নেই। বিলুপ্তকৃত ১৯নং রেজিমেন্টের মধ্যে হিন্দুরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং স্মিথের অশ্বারোহীদের মধ্যে মুসলমানরাই সংখ্যায় অধিক। যে কার্তুজ নিয়ে ঘাঁটিতে এতো ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেছে, নির্দোষ এবং ক্ষতিকর না হলে এর পরীক্ষা করার কি প্রয়োজন আছে, কোনো কোনো সেপাইয়ের মনে এ প্রশ্ন উদিত হলো। ব্রজমোহন নামে একজন সেপাইকে কার্তুজ ব্যবহারের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। তার নৈতিকতা বলতে কিছুই ছিলো না। নীচ জাতীয় এ লোকটা পয়লা পদাতিক বাহিনীতে ভর্তি হয়। চুরি করার অপরাধে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং নাম ভাড়িয়ে পরে অশ্বারোহী বাহিনীতে ভর্তি হয়। সে দিনের বেশিরভাগ সময় কর্ণেল স্মিথের বাসাতেই কাটাতো এভং কার্তুজ পরীক্ষা করাবার জন্য নিজে কর্ণেলকে প্ররোচিত করে। সে আবার সেপাইদের কাছে এসে নিজের দোষ খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে এবং জানায় যে, সে যা করছে, সকলকে তা-ই করতে হবে বাধ্যগতভাবে। তখন অশ্বারোহীরা কঠিন শপথ নিলো, সেনাবাহিনীর সমস্ত সেপাইরা যতো দিন বিরত থাকবে, ততোদিন তারা ঐ অপবিত্র কার্তুজ স্পর্শও করবে না।
