কোনো রকমের দুর্ঘটনা ছাড়াই ১৯নং রেজিমেন্টের সেপাইদের নিরস্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো। সরকার নিজ সিদ্ধান্তে অটল রইলেন, কিন্তু কম্যান্ডিং অফিসারদের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন না। প্রধান সেনাপতি গভর্ণর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করলেন না। আমবালা হচ্ছে তিনটি সামরিক ট্রেনিং কেন্দ্রের একটি। বিভিন্ন রেজিমেন্টের কিছু কিছু নির্বাচিত সেপাইকে নতুন রাইফেল চালনা শিক্ষা দেয়ার জন্য আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলো কাশীরাম তেওয়ারী নামে একজন হাবিলদার। আর ছিলো জিউলাল দুবে নামে ৩৫নং রেজিমেন্টের একজন নায়েক। এই ৩৬নং রেজিমেন্টেই ছিলো প্রধান সেনাপতির অগ্রবর্তী বাহিনী।
সুবাদার কমিশনপ্রাপ্ত নয়, এমন দু’জন অফিসারকে ডাকলেন। তিনি জানালেন, তাঁরা কার্তুজ স্পর্শ করেছেন এবং সে জন্য ধর্ম থেকে পতিত হয়ে খ্রীস্টান হয়ে গেছেন। চোখের জল মুছতে মুছতে তারা ইন্ট্রাক্টর মার্টিনোর কাছে এলেন। তাঁর কাছে সবিস্তারে সবকিছু জানালেন। আপন রেজিমেন্টের একজন সুবাদার যখন তাদের ধর্ম থেকে পতিত বলে ঘোষণা করেছেন, গ্রামে যে কি রকম ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ পোহাতে হবে সে সম্বন্ধে তাঁকে জানালেন। লেফটেনান্ট মার্টিনো বিষয়টিকে প্রধান সেনাপতির গোচরীভূত করলেন। জেনারেল এ্যানসন পরিদর্শন করে সমবেত সেপাইদের জানালেন, যে গুজব রটেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
লেফটেনান্ট মার্টিনোর মতে, তাদের ভয় অকারণে হয়নি। এতে তারা বাড়াবাড়ি করেনি। ট্রেনিং কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা ভদ্রভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের অসুবিধার কথা নিবেদন করেছে। সুবাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করার জন্য তাড়াতাড়ি একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছে। কিন্তু কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি। ১৬ই এপ্রিল সেপাইরা জানতে পারলো যে সুবাদার ছকু পাল সিংয়ের আচরণ অন্যায় এবং সৈনিকোচিত নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদী দু’জনকে এতো সহজে ছেড়ে দেয়া হলো না। তারা ডিপোতে সুবাদারের অসৈনিকোচিত আচরণের কথা জোর করে প্রচার করেছে, সেপাইরা মনে করতে লাগলো, আপনাপন সৈন্যদলে ফিরে যাওয়ার পর তাদের একই রকম হেনস্থা ভোগ করতে হবে। এ ধরনের আপত্তিকর কাজের জন্য সেপাইদের প্রকাশ্যে সাজা দেয়া হলো।
কম্যান্ডিং অফিসারেরা ব্যগ্রভাবে প্রমাণ করতে চাইতেন যে সেপাইরা তাদের সদাশয় প্রভুর ইচ্ছা ভুল বুঝেছে। তারা মনগড়া কতিপয় ধারণার সৃষ্টি করেছিলো। সেপাইকে অস্ত্র রাখার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলেও ইউনিফর্ম পরার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। তাদের বেতন এবং পেনশন থেকে বঞ্চিত করা হলো, কিন্তু সরকার ঘরে ফিরবার পথ খরচ দিলেন। ঘরে ফেরার পথে ইচ্ছা করলে যে কোনো মাজার, যে কোনো তীর্থস্থানে যেতে পারতো। সরকারের তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো দুরভিসন্ধি নেই। ধর্মীয় সকল আচার আচরণের স্বাধীনতা মেনে নিতে সদা প্রস্তুত। ১৯নং রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়ার পরে উত্তরে ভারতের শত শত গ্রামে চাকুরীহারা সেপাইরা চর্বি মাখানো কার্তুজের খবর রটিয়ে দিয়েছিলো এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না। তেমনি করে তারা অগুণতি গ্রামীণ জনতার মধ্যেও বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়ে দিলো। প্রকৃত ঘটনা ঘটে যাবার পরে সহজেই জ্ঞানী হওয়া যায়। সেপাইদেরকে পারস্য কিংবা চীনে পাঠিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু তার বিপক্ষেও যুক্তি ছিলো। সাগর পরপারে পাঠানোর জন্য দু’বার বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগ তালিকাভূক্তিকরণ আইনের (General Service Enlistment Act) ফলে সেপাইদের মধ্যে কম আতঙ্কের সঞ্চয় হয়নি। কারণ খ্রীস্টান সরকারের শয়তানী মনোভাবের পরিচয় তারা ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছে। স্যার অবফিয়ার কেভেনাগ আবিষ্কার করেছেন, অধিকাংশ সেপাই বিশ্বাস করে সাগরের পরপারে চাকুরী করা আর অস্ত্রহীন থাকা একই কথা। সুতরাং তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেপাইদের চীনদেশে পাঠিয়ে দেয়া হোক, সেখানে তাদের প্রয়োজন ছিলো। এই পরামর্শ গ্রহণ এবং সে অনুসারে কাজ করা হলো। সরকারের সততা সম্বন্ধে যখন সেপাইদের মনে সন্দেহ জেগেছে এবং প্রত্যেক ভুলের মধ্যে ধর্মচ্যুত হওয়ার সতেজ সম্ভাবনা যখন দেখা যাচ্ছে, ততোই তারা মনে করতে থাকলো তাদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
অস্ত্র হারালে যে অপমান ভোগ করতে হয়, জনমত তার চাইতেও অপমানজনক পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে পারে। সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করার পরেও সরকার সে অপমান থেকে নিষ্কৃতি পেলো না। ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে প্রধান সেনাপতি সিমলা যাওয়ার পথে আমবালাতে এলেন। স্পষ্টতঃই সরকার কলকাতার নিকটে সেপাইদের বিক্ষুদ্ধ চীকারে যথেষ্ট গুরুত্বদান করেননি এবং এ সম্বন্ধে আপন রেজিমেন্টে গুজব ছড়াবার কারণে তাদের পেনশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে শেষ নয়, সেপাইদের ভয় এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কার্তুজ ব্যবহার করতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন সরকার। পরের দিন সকালেই তাদের কার্তুজ ব্যবহার করতে হলো। তারা যদি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রধান সেনাপতির কাছে কার্তুজ ব্যবহারে তাদের ভয়ের কারণ নিবেদন করতো তাহলে প্রধান সেনাপতি তাদের রাজভক্তিতে সন্তুষ্ট হতেন, কিন্তু ভয়কে আমলই দিতেন না। সেপাইদের দোষ দেয়া যায় না, কারণ ধর্ম এবং মনিবের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছিলো।
