১৯নং রেজিমেন্ট যেমনি উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন, তেমনিভাবে শান্ত হয়ে পড়লো। তারা সেনাবাহিনীর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে চলতে লাগলো। মহারাণীর ৮৪নং রেজিমেন্ট তখন রেঙ্গুনে ছিলো। তাদের বাঙলায় ফিরিয়ে আনার জন্য একখানা ষ্টীমার পাঠানো হলো। সেপাইদের কাছে এটা কোনো গোপন খবর ছিলো না। স্যার এডওয়ার্ড প্যাজেটের নিষ্ঠুর বিচারের কথা সেপাইরা ভুলতে পারেনি। সমস্ত রেজিমেন্ট ভীত হয়ে পড়লো। ৮৪নং রেজিমেন্ট এসে পড়লে সমস্ত রেজিমেন্টের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে কঠিন দণ্ডদান করা হবে। জেনারেল হীয়ার্সে তাঁর অধীনস্থ সেপাইদের কাছে বললেন, সেপাইদের ধর্ম এবং জাতের উপর সরকারের কোন বিদ্বেষ নেই। তিনি নিশ্চিত করে বললেন, অপরাধী ছাড়া আর কারো ডর ভয় করার কারণ নেই। অল্পদিনের মধ্যেই ৮৪ং রেজিমেন্ট এসে পড়লো ব্রহ্মদেশের চিনশুরা থেকে। ১৯নং রেজিমেন্টকে ব্যারাকপুর থেকে মার্চ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য কর্ণেল মিচেলকে নির্দেশ দেয়া হলো। দেশে ফেরার সময় ৮৪নং রেজিমেন্ট বহু কষ্টে পরিকল্পিত বিদ্রোহ করা থেকে বিরত থেকেছে। তাদের দৃষ্টিতে সমপেশায় নিযুক্ত সেপাইরা চর্বি মাখানো কার্তুজ ব্যবহার না করে উত্তম কাজ করেছে।
২৬শে ফেব্রুয়ারি বহরমপুরের সেপাইরা বিক্ষোভ শুরু করলো। ২৯শে মার্চ ব্যারাকপুরের ভীত-সন্ত্রস্ত সেপাইরা আরো প্রচণ্ডভাবে বেপরোয়া বিক্ষোভ শুরু করলো। ৩৪নং পদাতিক বাহিনীর একজন তরুণ সেপাই মঙ্গল পান্ডে। চাকুরীতে তার রেকর্ড খুবই ভালো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী তাকে উৎক্ষিপ্ত করে তুলেছে। কিছুদিন আগে দু’জন সেপাইকে ষড়যন্ত্র করার অপবাদে ১৪ বছরের সশ্রমদন্ড দেয়া হয়েছে। জমাদার শালিগ্রাম সিংকে তাঁর সাথীদের চর্বি মাখানো টোটা ব্যবহার করতে নিষেধ করার কারণে কোর্ট মার্শালের সামনে হাজির হতে হয়েছে। চাকুরি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ধর্মীয় কারণে ১৯নং রেজিমেন্টের একজন সেপাইয়ের কাছে যা মূল্যবান সবকিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ সকল ঘটনা সেপাইদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না-এ সকল ঘটনা মঙ্গল পান্ডের মনেও গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিলো। ২৯শে মার্চ রোববার দ্বি-প্রহরে ৩৪নং রেজিমেন্টের এ্যাডজুট্যান্ট লেফটেনান্ট বাগ জানতে পারলেন, তাঁর রেজিমেন্টের একজন সেপাই ক্ষিপ্ত হয়ে সার্জেন্ট মেজরকে গুলী করেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে গমন করলেন। তাঁকেও গুলি করা হলো। গুলি এসে ঘোড়ার গায়ে লাগলো। বাগ এবং সার্জেন্ট মেজর দু’জনে সেপাইটির দিকে ধাওয়া করলে, শেখ পন্টু নামে একজন মুসলমান সেপাই তাদেরকে বাধা দিলেন। নয়তো দুজনেই মারা পড়তেন। তখন ডিউটিরত কোয়ার্টার গার্ডরা দূরে ছিলেন না। তারা কিন্তু নীরব দর্শক হয়েই রইলেন। আহত লেফটেনান্ট বাগ ঘটনাস্থল পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে গোলমালের খবর জেনারেল হীয়ার্সের কানে গিয়ে পৌঁছলো। সকলে ধারণা করলো যে সমস্ত সেপাই বিদ্রোহ করেছে। জেনারেল হীয়ার্সে তাঁর পুত্রগণ এবং দেহরক্ষীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে প্যারেড ময়দানে এলেন। জেনারেলকে এ রকম সুসজ্জিত অবস্থায় দেখে মঙ্গল পান্ডে বুঝে নিলো, তার অন্তিম সময় উপস্থিত। মঙ্গল পান্ডে জ্বালাময়ী ভাষায় আপন ধর্মাবলম্বীদের আহবান করলো অস্ত্র তুলে নিতে, কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। তারপরে বুকের কাছে বন্দুক তুলে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলো। কিন্তু জখম মারাত্মক হয়নি। তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলো এবং পরে ফাঁসি দেয়া হয়। ঈশ্বরী পান্ডে নামে অপর একজন প্রহরী, যে মঙ্গল পান্ডেকে গ্রেফতার করতে অস্বীকার করে তার ওপরও ফাঁসির নির্দেশ দেয়া হয়, কিন্তু কতিপয় কারণে কিছু দিনের জন্য তা স্থগিত রাখতে হয়। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলবার সময় সে তার বক্তব্য পেশ করেছে এবং সাথীদেরকে বলেছে এ মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে।
৩৪নং রেজিমেন্টের সাম্প্রতিক রেকর্ডকে কিছুতেই খারাপ বলা যায় না। অধিনায়ক হুইলার এ রেজিমেন্টকে অত্যন্ত ভালোভাবে গড়ে তুলেছেন। এ রেজিমেন্টের সুবাদারের কাছে পদাতিক বাহিনীর দু’জন সৈন্য এসে ষড়যন্ত্রের প্রস্তাব করলে, তিনি তাদের দু’জনকেই গ্রেফতার করেন। ৩৪নং রেজিমেন্টের সঙ্গে বহরমপুরের ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু তাদের এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটলো এক দুঃখজনক ঘটনা। যখন মঙ্গল পান্ডের হত্যা প্রচেষ্টা এবং ঈশ্বরী পান্ডের নিষ্ক্রিয়তার ফলেই কর্তৃপক্ষ ধরে নিয়েছিলেন, সমস্ত সেপাইর মনেই বিদ্রোহের চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে। মঙ্গল পান্ডে সে সময় ভাং খেয়ে নেশাগ্রস্ত ছিলো কিনা তা আলোচনা করার প্রয়াজন আছে। স্পষ্টতই দেখা যায়, সে কোনো ষড়যন্ত্র করেনি এবং অন্যান্যদের নিয়ে কোনো দল গড়েনি। তার সাথীরা তার ডাকে সাড়া দিলেও ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে তাদের মনে প্রবল বিদ্বেষ ছিলো। সে জন্য তারা নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। তাদের মধ্যে যে একজন সক্রিয় হয়েছিলো সেও মঙ্গল পান্ডের পক্ষ নিয়েছিলো। চর্বি মাখানো টোটা সেপাইদের মন বিষিয়ে দিয়েছিলো। তার ফলে তারা সামরিক কর্তব্যের প্রতিও নিষ্ঠা রাখতে পারেনি।
