অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সেপাইদের সন্তুষ্ট করা যেতো কিনা সত্যিই মুশকিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জানতে পেরেছে এবং নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেছে, যে কার্তুজ তারা ব্যবহার করছে তার সঙ্গে আপত্তিজনক চর্বি মাখানো ছিলো, যার সামান্য ছোঁয়া লাগলেই তাদের ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়। হিন্দুরা গরুর চর্বি যেমন জঘন্য মনে করে, তেমনি মুসলমানেরা শুয়রের চর্বি একই রকম মনে করে। চর্বির সঙ্গে যে আপত্তিজনক কোনো পদার্থ নেই কর্তৃপক্ষ সত্তাবে সে কথা অস্বীকার করেনি। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্বাভাবিক পন্থা ছিলো অসাবধানতাবশতঃ যে ভুল হয়ে গেছে তা স্বীকার করা। কিন্তু তার ফলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে প্রচণ্ডভাবে জ্বলে উঠার সম্ভাবনা ছিলো। অথবা মিনি রাইফেল ব্যবহার কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা যেতো। আবার, তার ফলেও সেপাইদের একগুঁয়েমী থেকে যেতে পারতো এবং সামরিক শৃখলায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ ভয় করলেন। মিঃ হিয়ার্সে জানাচ্ছেন যে মার্চ মাসে দমদম ঘাটিতে ভরতির উপাদানের অভাবে নতুন অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেপাইদের উত্তেজনা বাড়তে লাগলো। তারা অস্বাভাবিক ঝলোমলো কার্তুজের কাগজের প্রতি ঘৃণাব্যঞ্জক দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করলো। কাগজে কোনো চর্বি ছিলো না, কিন্তু একটি আদালতে মানুষের পর মানুষ এসে প্রমাণ দিলো যে তার সঙ্গে চর্বি আছে। আরেকটা প্রবল গুজব রটলো যে হাড় চূর্ণ করে আটা কুয়োর পানিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে করে কারো ধর্ম রক্ষা না পায়। ধর্মনাশ করার জন্যই সরকার সুপরিকল্পিতভাবে এ গর্হিত কাজ করেছে।
সেপাইদের ক্রমশ: বিশ্বাস হারানোর সময়ে অফিসারেরা শুধু নির্বাক দর্শক ছিলেন না। প্রেসিডেন্সী ডিভিশনের অধিকর্তা জেনারেল হীয়ার্সে ছিলেন কৌশলী এবং সাহসী পুরুষ। বিদ্রোহের প্রারম্ভিক সময়ে তিনি তার অধীনস্থ সেপাইদের পাঞ্জাব নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সেপাইদের ভাষাতেই তিনি কথা বলতেন। যে ভুল হয়ে গেছে, সেজন্য তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করতেন। তিনি বলতেন, ইংরেজরা হলো প্রোটেস্টান্ট ধর্মাবলম্বী। তাদের নীতিতে বিশ্বাস না করলে এবং স্বেচ্ছায় তাদের ধর্ম গ্রহণ না করলে, কাউকে তারা আপনার মনে করে না। জেনারেল হীয়ার্সের কথায় সত্যতা না থাকলে সে জন্য সেপাইদের দোষ দেয়া যায় না। সে সময় ব্যারাকপুর ঘাটিতে আরেকজন অফিসার ছিলেন, যিনি এ সম্বন্ধে অন্য রকম ধারণা পোষণ করতেন, তাও তিনি গোপনে রাখতেন না। তাঁর নাম ছিলো কর্ণেল হুইলার। তিনি বলেছেন, দু’বছর ধরে তিনি এদেশীয় সেপাইদের মধ্যে সুসমাচার প্রচার করে আসছেন। কর্ণেল হুইলার সেনাবাহিনীতে একমাত্র মানুষ নন, ভগবানের শ্রীমুখের বাণী মূর্তিপূজকদের পরিত্রাণের জন্য প্রচার করেছিলেন, এমন আরো অনেকে ছিলেন।
চর্বি এবং কাগজ সম্বন্ধে গুজব যখন একবার রটে গেলো, একস্থানে যে তা আর আবদ্ধ রইলো না, সে কথা বুঝিয়ে বলবার প্রয়োজন নেই। আকাশ-বাতাস সন্দেহে ভারী হয়ে উঠলো। সেপাইদের উত্তেজনা এতো প্রচন্ড আকার ধারণ করলো যে ব্যারাকপুর এবং আশেপাশের কয়েকটি স্থানে অগ্নি সংযোগ করা হলো। প্রায় একশো মাইল দূরে রাণীগঞ্জে একই ঘটনা ঘটলো। দুষ্কৃতিকারীদের সন্ধান না পাওয়া গেলেও সেগুলোকে সাধারণ ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটলো নামমাত্র নওয়াবের বাসভূমি মর্শিদাবাদের নিকটস্থ বহরমপুরে। বিশেষ ডিউটিতে ৩৪নং রেজিমেন্টের দু’টো দলকে ব্যারাকপুরে থেকে বহরমপুরে পাঠানো হয়েছিলো। সেখানে আগে থেকে কর্ণেল মিচেলের পরিচালনাধীন ১৯নং বাহিনী ছাউনী ফেলেছিলো। হীয়ার্সের মতো কর্ণেল মিচেল উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন কিন্তু চর্বি মাখানো কার্তুজের খবর তার অধীনস্থ সেপাইদের কানে এসে পৌঁছেছে। একজন ব্রাহ্মণ হাবিলদার তা সত্য কিনা জানতে চাইলো। সে যাক, ৩৪নং রেজিমেন্ট এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুই ঘটলো না। কিন্তু রেজিমেন্টে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ১৯নং রেজিমেন্টের সৈন্যদের মনে গভীর সন্দেহের শিকড় বিস্তার করলো। চর্বিতে সন্দেহ হওয়ায়, তারা বন্দুকের ক্যাপ স্পর্শ করলো না। তাদের মনে কোন নৃশংস ইচ্ছা ছিলো না। কারণ সংঘর্ষ ক্যাপের অভাবে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু মিচেল তাদেরকে গালাগালি করলেন এবং দণ্ডদানের ভয় দেখালেন। তিনি নিজে পল্টনে গিয়ে দেশীয় অফিসারদের ডেকে বললেন, এক বছরেরও আগের তৈরি কার্তুজ ব্যবহার করতে আগামীকাল অস্বীকার করলে কঠোর দণ্ডদান করা হবে। চতুর্থ কোম্পানীর সুবেদার শেখ করিম বক্স বলেছেন, তিনি কর্ণেলকে বলতে শুনেছেন, তাদেরকে অবশ্যই কার্তুজ ব্যবহার করতে হবে নইলে ব্রহ্মদেশ, চীন ইত্যাদি দূরদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দুর্ভাগ্যবশত সেপাইদের সন্দেহের নিরসন হলো না। তদুপরি কর্ণেলের কড়া নির্দেশের কারণে, সন্দেহ আরো গাঢ়রূপ ধারণ করলো। সকালের প্যারেড শুরু হওয়ার আগেই গোলযোগ শুরু হলো। জোর করে সেপাইরা অস্ত্রশালা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে নিলো এবং বন্দুকে গুলি ভর্তি করলো। মিচেল কাপুরুষ ছিলেন না, তিনি অস্ত্রের সাহায্যে অস্ত্রের সম্মুখীন হতে ইচ্ছা পোষণ করলেন। কিন্তু ধারে কাছে কোথাও ইউরোপীয় সৈন্য ছিলো না। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে দমাতে পারলো না। দেশীয় অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে গেলেন। দেশীয় সেপাইরা কর্ণেলকে বুঝালেন যে তাদের লোকেরা বিদ্রোহের বশবর্তী হয়ে নয়, ভয়েই উচ্ছল হয়ে পড়েছে। কর্ণেলকে অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী ফেরত পাঠাতে পরামর্শ দিলেন। কারণ তাদের উপস্থিতি সৈন্যদের অসংযত করে তুলতে পারে। কর্ণেল মিচেল তাদের কথা শোনার ফলে এ ঘটনা আর বেশিদূর গড়ালো না। তিনি প্যারেডের নির্দেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেপাইরা শান্ত হয়ে এলো।
