এইসব বৈষম্য সত্ত্বেও এক আদিবাসী আর এক আদিবাসীকে শোষণ করত সামান্যই। শোষণ তার চরমতম রূপ পরিগ্রহ করেছিল উচ্চবর্ণের মহাজন এবং পারসি সুরা-ব্যবসায়ীদের হাতে। বলপূর্বক শ্রম আদায় ছাড়াও বিভিন্ন আইনসম্মত ও বেআইনি কর আরোপ করার মাধ্যমে আদিবাসী শ্রমশক্তি শোষণের কাজে যোগ দিয়েছিল ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র। পুলিশ, এবং রাজস্ব, আবগারি ও বনবিভাগের অফিসাররা প্রত্যেকেই এতে ভাগ বসাত। মহাজনদের অধিকাংশই ছিল বানিয়া, পারসি আর ব্রাহ্মণ। বানিয়া আর ব্রাহ্মণরা থাকত তালুকের সদর শহরগুলিতে। তারা টাকা ধার দিত হয় তাদের শহরের বাড়ি থেকে, অথবা সাপ্তাহিক হাট থেকে, যেগুলি বসত সমগ্র আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন জায়গায়। যারা মহাজনী কারবার এবং মদের ব্যবসা দুইই একসঙ্গে চালাত, সেই পারসির সাধারণত থাকত বড় বড় আদিবাসী গ্রামগুলিতে। এই সব গ্রামে তাদের মদ বিক্রি করার একচেটিয়া অধিকার ছিল। মাণ্ডবী তালুকের ১৩৫টি গ্রামে ১৩টি, অর্থাৎ গড়পড়তা প্রতি দশটি গ্রামপিছু একটি মদের দোকান ছিল। এই তথ্য থেকে গ্রামবাসী পারসিদের সংখ্যা ও তাদের প্রভাব সম্বন্ধে খানিক ধারণা করা যায়। প্রায়ই তারা একাধিক গ্রামে জমির মালিকানা ভোগ করত। বিশ শতকের গোড়ার দিকের মধ্যেই তাদের কেউ কেউ বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক হয়, এবং স্থানীয় গোমস্তাদের হাতে এগুলির ব্যবস্থাপনার ভার ছেড়ে দিয়ে শহরে বসবাস করতে শুরু করে। কিন্তু ছোটখাটো পারসি ভূস্বামীদের অনেকে আদিবাসী গ্রামগুলিতেই থেকে যায়। আদিবাসীদের খড়ে-ছাওয়া মাটির কুঁড়ের পাশাপাশি এদের বাড়ি হত দোতলা, ইঁট আর টালির তৈরি। সারা বছর ধরে এরা মদ আর তাড়ি ধার দিয়ে যেত, আর ফসল কাটার সময় আদায়ীকৃত শস্যের হিসেবে বহুগুণ বর্ধিত হারে ফিরে পেত তাদের দাম। ভূমিহীন আদিবাসীরা তাদের ধার শোধ দিত পারসিদের ক্ষেতে গায়ে খেটে।১৫ আদিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পারসিরা যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করত তার অসংখ্য বিবরণ মেলে।১৬ শ্রম আদায় করা ছাড়াও, যৌন উদ্দেশ্যে আদিবাসী মেয়েদের অপব্যবহার করা হত।১৭ গরিব আদিবাসীরা সবসময়েই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। যে কোনও প্রতিবাদকে চটপট উত্তম-মধ্যম দিয়ে ঠাণ্ডা করে দিত পারসি মালিক নিজে অথবা তার পোষা গুণ্ডাবাহিনী। স্থানীয় সরকারি কর্মচারি এবং পুলিশ সবসময়েই পারসিদের পক্ষই অবলম্বন করত।
পারসিদের হাত শক্ত করেছিল মদব্যবসা সংক্রান্ত সরকারি আইনকানুনও, যার মধ্যে মুখ্য ছিল ১৮৭৮ সালের বোম্বাই আবগারি আইন। ওই বছরের আগে মদ চোলাই এবং বিক্রি করার অধিকার ইজারা-বিলি করা মদের উপর শুল্কও ছিল কম। মদ (যা গুজরাটে ‘দারু’ নামে পরিচিত) চোলাই করা হত গ্রামে, আর এর প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হত ‘ম্হৌরা’ (mhowra) গাছের শর্করাসমৃদ্ধ ফুল। তাড়ি ছিল গেঁজে-ওঠা তালের রস, যা প্রায় বিয়ারের মতোই কড়া। যেসব তালগাছের রস থেকে তাড়ি বানানো হত সেগুলির উপর সামান্য শুল্কের মাধ্যমে এর উপর কর আরোপ করা হয়েছিল। দারু এবং তাড়ি, উভয়ক্ষেত্রেই কর ফাঁকি দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থাকায় এই ব্যবস্থা ব্রিটিশদের পছন্দসই ছিল না। ১৮৭৮ সালের আইন স্থানীয় ভিত্তিতে মদ উৎপাদন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পর কেবল জেলা সদরগুলিতে একটি করে কেন্দ্রীয় ভাটিখানা চালু রাখার অনুমতি দেয়। এই কেন্দ্রীয় ভাটিখানাগুলি চালাত জেলার একচেটিয়া ব্যবসাদারেরা, যাদের ফি বছর সরকারকে মোটা টাকা দিতে হত। কেন্দ্রীয় শুল্কব্যবস্থার আয়ত্তাধীন এই মদ যারা গ্রামে বিক্রি করত, পরওয়ানা বাবদ তাদেরও ফি বছর সরকারকে দিতে হত নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। তাড়ির সঙ্গে দামের তারতম্যহেতু এই নতুন মহার্ঘ্য মদের ক্রয়যোগ্যতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকায় তালগাছগুলির উপর কর প্রচুর বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আরও নিখুঁতভাবে গাছগুলিকে তালিকাভুক্ত করা হয়।১৮
এমন নতুন ব্যবস্থায় আবগারি রাজস্বের যে বিপুল বৃদ্ধি হয়েছিল তা নীচের সারণী থেকেই স্পষ্ট হবে। বাঁ-দিকের স্তম্ভে প্রদত্ত সংখ্যাগুলির মাধ্যমে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির সর্বমোট রাজস্বের শতাংশকে বোঝানো হয়েছে। সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ভূমিরাজস্বের যে অনুরূপ শতাংশের হিসেব এই সারণীতে দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে একই সময়সীমার নিরিখে আগের সংখ্যাগুলির তুলনামূলক বিচার করা যেতে পারে।১৯
বছর আবগারি ভূমিরাজস্ব
১৮৬৫-৬৬ ৪.৪ ৪০.৩
১৮৭৫-৭৬ ৪.২ ৩৮.৮
১৮৮৫-৮৬ ৮.২ ৩৮.৭
১৮৯৫-৯৬ ৭.৭ ৩৪.৭
১৯০৫-০৬ ৮.৯ ২৪.২
১৯১৫-১৬ ১৩.৭ ৩১.৪
১৯২৫-২৬ ২৯.৩ ৩৮.১
আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে একটি জেলায় (সুরাট) দেশি মদ ও তাড়ির উপর আবগারি শুল্কের পরিমাণ কিভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল তা নীচে টাকার অঙ্কের হিসেবে দেখানো হয়েছে।২০
রাজস্ব বছর রাজস্ব (টাকার অঙ্কে)
১৮৭৭-৭৮ ৩,৭০,৪২৩
১৮৮৫-৮৬ ৭,৯৪,২২১
১৮৯৫-৯৬ ১১,৬৪,৫৮৫
১৯০৫-০৬ ১১,৬৭,৭১৮
১৯১৫-১৬ ১৭,৪৪,৮৬৭
১৯২৫-২৬ ৩৪,৩৬,২৯১
সুরাট জেলায় এই শুল্কবৃদ্ধির ভার নিচুজাতের লোকেদের, বিশেষত আদিবাসীদেরই বহন করতে হয়েছিল। এই নতুন ব্যবস্থার মুনাফা ভালভাবেই লুটেছিল মদবিক্রেতারা। তাদের মদ চোলাইয়ের অধিকার চলে গেলেও, গ্রামকে গ্রাম জুড়ে কারখানায়-তৈরি মদ বিক্রি করার একচেটিয়া অধিকার ছিল। গ্রামে বাস করার দরুন মদবিক্রেতারা বেআইনি মদচোলাইয়ের বেশির ভাগটাই রুখতে পেরেছিল। কারখানায় তৈরি চড়াদামের মদের উপর লাভ করা হত ওজনে মেরে, জল মিশিয়ে বা চড়া সুদে এই মদ ধার দিয়ে। দোকানদারেরা ঠগবাজি আর জুলুমের মাধ্যমে তাদের পকেট ভারি করত, আর আবগারি বিভাগের কর্মচারীদের ঘুষ দেওয়া হত এ ব্যাপারে নাক না গলানোর জন্য।২১ ১৯২৩ সালে বোম্বাই আবগারি কমিটির কাছে দেওয়া সুরাটের হরিভাই দেশাই-এর সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে কোনও মদের দোকান পরিদর্শনে যাবার আগে আবগারি অফিসাররা বেশ ভালরকমই আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখত। দোকানদারেরা প্রায়ই অফিসারদের টাকা ধার দিত এবং অন্যান্যভাবেও তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করত। দেশাই আরও বলেন:
