এই ধরনের আন্দোলনগুলিকে আরও ভাল করে বোঝার উদ্দেশ্যে এই প্রবন্ধে আমি দেবী আন্দোলন সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করব। আলোচ্য বিষয়গুলি হল, পর্যায়ক্রমে, সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পটভূমি, আন্দোলনের যথাযথ ইতিহাস, এবং আদিবাসীদের গৃহীত সংস্কারসূচির নিহিতার্থ ও তাৎপর্য।
২
যাদের জীবন এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু, সেই আদিবাসীদের অধিকাংশই বাস করত ‘রানিমহল’ নামে পরিচিত দক্ষিণ গুজরাটের এক জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায়। রানিমহল মোটামুটি সমতল এলাকা; সহ্যাদ্রি পর্বতশ্রেণীর খাড়া পাহাড়গুলি দাঁড়িয়ে আছে এর পূর্বসীমানার উপর। উনিশ শতকের গোড়ায় রানিমহলের অধিকাংশই ছিল জঙ্গলে ছাওয়া। অবশ্য এই এলাকার গাছপালা কেটে ফেলে মাঠ বানানো হয়েছিল এই শতকের মধ্যেই। ১৯২০ সাল নাগাদ ঘন জঙ্গল বলতে আর যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তা এই এলাকার উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রানিমহলের মাটি ছিল উর্বর, আর বৃষ্টিপাতও হত প্রচুর, ফলে একবার চাষের আওতায় এলে একই জমি থেকে বছরের পর বছর ভাল ফসল পাওয়া যেত।
‘কালিপরজ’ নামে পরিচিত প্রধান উপজাতিগুলি ছিল চোধ্রী (Chodhri), গমিৎ (Gamit), ধোড়িয়া (Dhodiya) আর কোঙ্কনী (Konkani)। এছাড়া নায়েক (Naikas), কোতওয়ালিয়া (Kotvaliya) আর কাঠোড়িয়ার (Kathodiya) মতো ছোটখাটো উপজাতিও ছিল। রানিমহলের যে অঞ্চলগুলিতে প্রধান চারটি উপজাতি বাস করত সেগুলি ছিল পরস্পরসংলগ্ন, এমন কী এক এলাকা আর-একটিতে উপচে পড়েছিল অনেকখানি। চোধ্রীদের বাস ছিল প্রধানত মাণ্ডবী, ভালোড়, ভিয়ারা আর মাহুবা (Mahuva) তালুকে। গমিৎরা আস্তানা গেড়েছিল ভিয়ারা আর সোনগড় তালুকে, আর পশ্চিম খান্দেশে। ধোড়িয়ারা থাকত দক্ষিণের দিকে, মাহুবা, পশ্চিম ভাঁসদা (Vansda), চিখ্লি (Chikhli), পূর্ব ভালসাদ (Valsad), পশ্চিম ধরমপুর আর পার্দিতে (Pardi)। আর কোঙ্কনীরা ছড়িয়ে পড়েছিল রানিমহল ছাড়িয়ে সহ্যাদ্রি পর্বতমালায়—ভাঁসদা, ধরমপুর, দাং (Dang), সুরগনা (Surgana) আর নাসিক জেলায় বাসা বেঁধেছিল তারা। পশ্চিম ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে যারা বৃহত্তম, সেই ভিলদের রানিমহলে খুঁজে পাওয়া যেত না বিশেষ; তাদের এলাকা শুরু হয়েছিল বাজপুর (Vajpur) আর রাজপিপলা (Rajpipla) রাজ্য থেকে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম ছিল দাং—যেখানে প্রভুত্বকারী গোষ্ঠীনেতারা ছিল ভিল, আর চাষিদের অধিকাংশই কোঙ্কনী। ভিলদের সঙ্গে দক্ষিণ গুজরাটের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির কৃষ্টিগত তফাৎ ছিল অনেক; শেষোক্তদের কোনওমতেই এই প্রধান উপজাতিটির প্রশাখা বলা চলত না।
রানিমহলের আদিবাসীদের অধিকাংশই ছিল স্থায়ী কৃষক, যারা থাকত ছোট ছোট গ্রামে বা ‘ফলিয়ায়’ (faliya)। রাজস্ব আদায়ের একক হিসেবে পরিগণিত হত যে গ্রাম, তা গঠিত হত বেশ কয়েকটি ‘ফলিয়া’ নিয়ে। কারিগর বা অন্যান্য বিশেষ জীবিকানির্বাহী জাতির অস্তিত্ব না থাকায় এইসব গ্রামের কোনও নাভিকেন্দ্র ছিল না। এদিক থেকে বিচার করলে, ব্রাহ্মণ পুরোহিত, আধিপত্যশালী জাতি, অধস্তন শ্রমজীবী জাতি, বানিয়া দোকানদার, কারিগর জাতি আর অস্পৃশ্যদের স্তরবিন্যাস নিয়ে গড়ে-ওঠা তথাকথিত ‘সনাতন’ ভারতীয় গ্রামের সঙ্গে এইসব আদিবাসী গ্রামের বৈপরীত্য সুস্পষ্ট। অধিকাংশ আদিবাসী ফলিয়ার সদস্যই ছিল একই উপজাতির লোক। হয় তারা ছিল নিজেরাই জমির মালিক, অথবা তারা জমি ভাড়া খাটাত, এবং সাধারণত তাদের নিজস্ব চাষবাসের সরঞ্জাম আর হালটানার বলদ থাকত।
আদিবাসী গ্রামের উদাহরণ হিসেবে মাণ্ডবী তালুকের সাতভাও (Sathvav)-কে বেছে নেওয়া যেতে পারে। তিরিশের দশকের প্রথমদিকে সমাজতত্ত্ববিদ বি. এইচ. মেহ্তা এই গ্রামটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নিরীক্ষণ করেন।১৩ সেই সময়ে সাতভাও-এর জনসংখ্যা ছিল ৫৮৮, যা ১১৪টি পরিবারে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে ১০৬টি ছিল চোধ্রী আদিবাসী পরিবার, ৪টি ভিল, ২টি অস্পৃশ্য ঢের (Dhed) জাতের এবং ২টি পারসি। প্রত্যেক পরিবার কি পরিমাণ জমির মালিক ছিল এবং/অথবা কতটা জমি ভাড়া খাটাত সে সম্পর্কে মেহ্তার সংগৃহীত তথ্য থেকে নীচের সারণীটি তৈরি করা সম্ভব:
অধিকৃত জমির পরিমাণ (একর হিসেবে) পরিবারের সর্বমোট সংখ্যা পরিবারের শতাংশ
শূন্য ২১ ১৮
৫-এর কম ২১ ১৮
৫ থেকে ১০ ১৪ ১২
১০ থেকে ২০ ৩৪ ৩০
২০ থেকে ৩০ ১২ ১১
৩০ থেকে ৪০ ৫ ৪
৪০ থেকে ৫০ ৩ ৩
৫০-এর বেশি ৪ ৪
মোট ১১৪ ১০০
সবচেয়ে বেশি জমির মালিক ছিল এক পারসি, যার দখলে ছিল ১০৮ একর জমি। তিনজন চোধ্রী যথাক্রমে ৬৪, ৬০ এবং ৫২ একর জমির মালিক ছিল। মেহ্তার মতে একটি পরিবারের উপযুক্ত ভরণপোষণ যোগানোর জন্য দরকার তো অন্তত কুড়ি একর জমি।১৪ এর চেয়ে কম জমির মালিক অথবা একেবারেই ভূমিহীন ছিল ৮৮টি (৭৭ শতাংশ) পরিবার। সুতরাং সাতভাওয়ের আদিবাসীদের একটি বৃহৎ অংশ যে বেশ দারিদ্রের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছিল, এমন মনে করাটা অযৌক্তিক হবে না। এবং এর থেকে সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে, শুধু যে তারা দরিদ্র ছিল তাইই নয়, তিরিশের দশকের মধ্যেই গ্রামগুলিতে বৈষম্য ছড়িয়ে পড়েছিল ভালভাবেই। অবশ্য যেখানে অসংখ্য চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক উচ্চবর্ণের ভূম্যধিকারীদের হয়ে কাজ করত, দক্ষিণ গুজরাটের সেই আদিবাসীহীন গ্রামগুলির তুলনায় আলোচ্য আদিবাসী গ্রামগুলিতে বৈষম্যের তীব্রতা ছিল অনেক কম।
