বাখরখানি। বাখরখণ্ডি নামেও ডাকা হয় পুববাংলা অধুনা বাংলাদেশের কোথাও কোথাও। সনাতন কাকার ঘুগনির মতো এটিও পাওয়া যেত ছেলেবেলায়। সেই উত্তর কলকাতাতেই। ময়দার বানানো অপার্থিব এক খাস্তাভাজা। নুন মিষ্টি দুটোই কম। বেকিং সোডার হালকা গন্ধ। মুখে দিলেই বাক্যহারা, মানে হতে বাধ্য। এতটাই অপ্রতিরোধ্য এর টান। এখন প্রায় অবলুপ্ত। সুন্দরবন, সরিষ্কা বা বান্ধবগড়ের বাঘের মতোই। শুনেছি খিদিরপুর, মার্ক্যুইস স্ট্রিট আর রিপন লেনের দুয়েকটি বেকারিতে এখনও তৈরি হয়। কালেভদ্রে রাস্তাঘাটে দেখা পেয়েছি দুয়েকজন বিক্রেতার। চারদিকে কাচ লাগানো টিনের বাক্স কাঁধে নিয়ে হাঁক পাড়ছেন গলির মোড়ে—“বাখরখানি আছে, বাখরখানি-ই-ই…”। চোখে পড়ামাত্র কিনে ফেলেছি। নিদেনপক্ষে আড়াইশো গ্রাম। ভোরবেলা ভাল ফ্লেভার আর পাতলা লিকারের লাল চায়ের সঙ্গে দু’-চার পিস বাখরখানি মানে বাকি দিনটা ভাল কাটতে বাধ্য। হাতে পেলে মিলিয়ে নেবেন।
দরবেশ বা লাড্ডু তো অনেক খেয়েছেন। বলি আলাউদ্দিনের লাড্ডু চেখেছেন কখনও? ভীম নাগ, নকুড় বা বলরামের মতোই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ডেলিকেসি। প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে চিৎপুর রোডে নাখোদা মসজিদের নীচে প্রাচীন এই দোকান। নামে লাড্ডু হলেও মিল কিন্তু অনেকটা সেই দরবেশের সঙ্গেই। আপাদমস্তক জমাট ক্ষীরের গোল্লার মধ্যে বোঁদের টুকরো। দরবেশের মতো শুধুমাত্র ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া খোয়া ক্ষীরের গুঁড়ো নয়, আলাউদ্দিনের লাড্ডুর মূল উপকরণই খোয়াক্ষীর। লাড্ডু বা দরবেশের তুলনায় মিষ্টি খানিকটা কম। ফারাক শুধু এতটুকুই। এদের আরেকটি অসামান্য মিষ্টান্ন পদের নাম আফলাতুন। দুধ মেরে মেরে কালচে বাদামি হয়ে যাওয়া ক্ষীরের বরফির মধ্যে কাজু, পিস্তা, কিশমিশ আর কাঠবাদামের (আলমন্ড) টুকরো। দিল্লি কা লাড্ডু না খেলে পস্তাতে হয় কিনা জানা নেই তবে আলাউদ্দিনের লাড্ডু আর আফলাতুন না খেলে যে সত্যিই পস্তাবেন এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
কলকাতার বুকে আজ যারা নিদেনপক্ষে পঞ্চাশ-ষাটের হার্ডল টপকে গেছেন তাদের মনে থাকার কথা ছেলেবেলায় বাড়ির দরজায় দরজায় কালো ট্রাঙ্ক মাথায় ঘুরে বেড়ানো ফেরিওয়ালাদের। বেশি হাঁকডাক নেই। শুধু ‘কেক চাই’—মৃদু একটা আহ্বান। তাতেই কাজ হয়ে যেত। ‘কেকওয়ালা, এদিকে এসো’… দরজার সামনে গুছিয়ে উবুর হয়ে বসে মাথা থেকে ট্রাঙ্কটা নামাতেন বিক্রেতা। ঢাকনাটা খোলা মাত্র চকলেট-স্ট্রবেরি-অরেঞ্জ-বাটারস্কচ-ভ্যানিলার সে কী দুর্দান্ত মিশ্র সুগন্ধ। থরে থরে সাজানো রঙবেরঙের ছোট ছোট পেস্ট্রি। প্রত্যেকটার তলায় ট্রেসিংপেপারের মোনক। ট্রাঙ্কের ওপর লেখা বেকারির নাম—‘মিসেস সালদানাস কেক’, ‘রেইনবো বেকারি’… ইত্যাদি ইত্যাদি। অনির্বচনীয় সেইসব পেস্ট্রির স্বাদ। মুখে দিতে না দিতেই কোঁত করে গিয়ে সোজা পেটের মধ্যে। পেস্ট্রির ডালাটা সরালে তলায় আরেকটা কম্পার্টমেন্ট। দুভাগে ভাগ করে সাজিয়ে রাখা প্যাটিস। চিকেন আর ভেজিটেবল। ওপরের পরতটা সোনালি-বাদামি। মুচমুচে, খাস্তা। ভেতরে আলু-পিঁয়াজ-গাজর আর মুরগির মাংসের সুগন্ধি পুর। ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী তুলে দেওয়া হত হাতে হাতে। যে সময়ের কথা বলছি তখন বাড়ির নীচে পাড়ার মোড়ে মোড়ে কেক পেস্ট্রির দোকানের গাদা লেগে যায়নি। নিউ মার্কেট, গ্রেট ইস্টার্ন আর ফ্লুরিজের বাইরে আর কোথাও এসব জিনিস পাওয়া যেত না। একমাত্র বড়দিনের সময় স্টেশনারি দোকানে সাজানো বড়ুয়ার কেক ছাড়া। ফলে রেইনবো বেকারি আর মিসেস সালদানারাই ছিলেন সেসময় মধ্যবিত্ত বাঙালির পেস্ট্রি ভরসা। বহুদিন হল হারিয়ে গেছেন শহর থেকে। সঙ্গে হারিয়ে গেছে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো সেই সুরেলা ডাক— ‘কেক চাই।’
কেক-পেস্ট্রি-প্যাটিসের কথা যখন উঠল তখন তো একবার যেতেই হবে নিউমার্কেটে। মানে কেক গলিতে। সরু গলিটা জুড়ে রঙবেরঙের কেক, পেস্ট্রি আর ক্যান্ডির মেলা। ম ম করছে সুগন্ধে। ছুটিছাটায় বাবার সঙ্গে ওদিকটায় গেলেই বায়না করতাম ‘জুজুপ’ কিনে দেবার জন্য। না লজেন্স, না চকলেট। থরে থরে সাজানো থাকত দোকানের সামনে কাঠের ডালায়। চিনির আবরণের তলায় স্ট্রবেরি-গোয়াভা-অরেঞ্জ জেলির ছোট ছোট তুলতুলে টুকরো। কোন বেহেস্তের বেকারিতে তৈরি হয় কে জানে? আজও ওদিকটা দিয়ে গেলে টুক করে কিনে ফেলি এক ঠোঙা। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে টুপ করে একটা মুখে ফেলে দিয়ে চারপাশটা ভাল করে দেখে নিই একবার। চেনাশোনা কেউ দেখে ফেলল না তো? বাড়িতে কমপ্লেন করে দিলেই চিত্তির। ‘ছি ছি… বুড়ো বয়সে… লজ্জা করে না? তোমার না সুগার?…” হোম ফ্রন্টের বাক-মিসাইলের আঘাতে আঘাতে জেরবার হয়ে যেতে হবে একেবারে।
কেক গলি ধরে মিটার পঁচিশেক এগোলেই আর এক কেক কিংবদন্তী নাহুমের গা ঘেঁষেই ম্যাক্স-ডি-গামা। হালফিলে নামীদামি দেশি বিদেশি সব বেকারির ভিড়ে হারিয়ে গেছে নামটা। পুরনো কলকাতায় কেক-পেস্ট্রির সমার্থক পাঁচটি নাম। নাহুম-গ্রেট ইস্টার্ন-ফিরপো-ফ্লুরিজ আর অতি অবশ্যই ম্যাক্স-ডি-গামা। কনফেকশনারির পঞ্চপাণ্ডব। ম্যাক্স-ডি-গামা। সময়ের কালগ্রাসে তার অতীত জৌলুস হারিয়েছে অনেকদিন। তবু একবার যান। (যদি বন্ধ না হয়ে গিয়ে থাকে এখনও)। পুরনো কাঠের দরজাটা ঠেলে ঢুকে পড়ুন ভেতরে। অরেঞ্জ, চকলেট, ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি… কলকাতা সেরা অ্যাসর্টেড পেস্ট্রি এখানেই পাওয়া যায়।
