দ্বিতীয় ঠিকানাটা রাসবিহারী মোড়ে আজাদ হিন্দ হোটেল। এলাকায় বেশি পরিচিত বচন সিংয়ের ধাবা নামে। কালীঘাট শ্মশানের দিকে যাবার রাস্তাটায় হাতের বাঁদিকে। এখানে আপনার পছন্দের তালিকায় অবশই থাকুক দাল মাখানি, চিকেন বাটার মশালা আর ফিশ অমৃতসরি। সঙ্গে রুমালি রুটি অথবা বাটার নান, যে-কোনও একটা। এমনিতে প্রচণ্ড ভিড় থাকে এখানে। ফলে খাবার দিতে একটু দেরি হয়। তাই টেবিলে এসে নামামাত্র আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে চালু হয়ে যান। এক এক মুহূর্ত দেরি করা মানে এক-এক ফোঁটা অসম্ভব ভাললাগা স্বাদু উষ্ণতা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যাওয়া। মনে রাখবেন কথাটা।
একটা ছোট্ট ফুডি কুইজ। বলুন তো কলকাতা শহরে কোন খাবার হোটেল সবচাইতে বেশি রাত অবধি খোলা থাকে? চোখ বুজে উত্তর— বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে এএইআই ক্লাবের পাশে শের-ই-পাঞ্জাব ধাবা (কালীঘাট বা নিমতলা শ্মশানের পাশে দোকানগুলো এর মধ্যে ধর্তব্য নয়)। রাত তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ বন্ধ হয়ে ফের খুলে যায় ভোর পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। দু’ শিফটে হোটেল চলে। কর্মচারী বদলে যায়। রাতবিরেতে কোথাও খাবার না পেলে আপনার অবশ্যগন্তব্য হোক শের-ই-পাঞ্জাব। বিশ্ববরেণ্য চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনের প্রিয় খাবারের ঠিকানা ছিল এই ধাবাটি। কলকাতায় এলে নামীদামি পাঁচতারা হোটেলের লাঞ্চ-ডিনার ফেলে খেতে চলে আসতেন এখানে প্রায়ই। হুসেনের নামে এদের একটা পদের নামই হয়ে গেছে ‘হুসেনস্ স্পেশাল চিকেন।’ দুয়েকবার খেয়ে দেখেছি। আহামরি কিছু লাগেনি। খেতে যদি হয় সেটা এদের চিকেন ভর্তা আর এগ তড়কা ফ্রাই। ফুলকো ফুলকো চাপাটির সঙ্গে জমাট, হালকা আঠালো, মাসকালাই-কসৌরি মেথি-ডিমের মেলানো মেশানো ফাটাফাটি সুগন্ধি তড়কা। পাশাপাশি অফুরন্ত মাখনে সাঁতলানো ছিলেকাটা মুরগির টুকরোর ভর্তা। শেষে একগ্লাস লস্যি। ওপরে মোটা ননীর পরত। তলানিটা আর প্রায় চুমুক দেওয়া যায় না। চামচে করে তুলে খেতে হয়, এতটাই ঘন। আজ থেকে বছর বিশ-পঁচিশ আগেও হোটেলের বাইরে বসেই খাওয়া চলত। সঙ্গে ফ্রি—মুক্ত বাতাস। অবিকল হাইওয়ের ওপর এথনিক ধাবা বা লাইন হোটেলের স্টাইলে। শোনা কথা, এখানে এলে হোটেলের মধ্যে ভিড়ভারাক্কার চেয়ে বাইরে খাটিয়ায় বসে খেতেই বেশি পছন্দ করতেন হুসেন সাহেব। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কটা এতটাই নিবিড় আর আন্তরিক জায়গায় এসে পৌঁছেছিল যে এঁকে উপহার দিয়েছিলেন প্রমাণ সাইজ গজগামিনীর একটি ছবি। ধর্মের ষাঁড়ের গুঁতোয় বিধ্বস্ত, অপমানিত হয়ে প্রথমে চলে গেলেন প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে। পরবর্তীতে এমন কোথাও যেখানে ধম্মো, জাতপাত এসব নিয়ে বেকার, বেফালতু, বেমতলব কোনও লড়াই নেই। হুসেন চলে গেছেন। ফুটপাতের খাটিয়াপত্তর কবেই তুলে দিয়েছেন মালিকরা। গজগামিনীর ছবিটা কিন্তু আজও টাঙানো রয়েছে হোটেলের দেয়ালে। ক্যাশ কাউন্টারের মাথার ঠিক ওপরে। বিশ্বাস না হলে নিজের চোখে গিয়ে দেখে আসতে পারেন একদিন।
এবার কলকাতার শেষ দুটি ধাবার কথা বলেই এই ধাবা প্রসঙ্গে ইতি টানব। রাসেল স্ট্রিটের মোড়ে কর্তার সিংয়ের ধাবা। কনক বিল্ডিংয়ের ঠিক পিছনে। চিকেন, মাটন অথবা এগ, যে-কোনও তড়কাই এখানে যেন অনেকটা সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা জামাইকার শর্ট ডিসট্যান্স অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ান দৌড়বাজদের মতো। ফটো-ফিনিশে একচুল এগিয়ে পিছিয়ে থাকবে। এখানে আপনার মর্জিমাফিক অর্ডার করা তড়কার সঙ্গে থাকুক প্লেন চাপাটি। সিংজির ধাবায় নান বা তন্দুরি রুটির সঙ্গে কম্পিটিশনে এটাই সেরা। শীতকালে শসা-পেঁয়াজ-টম্যাটোর সঙ্গে মুলোও দেওয়া হয় সালাডে। এত মিষ্টি আর ঝাঁঝহীন মুলো যে কোন স্বর্গীয় আবাদভূমিতে উৎপন্ন হয় কে জানে? কথার সত্যমিথ্যে যাচাই করতে একদিন না হয় চলেই যান রাসেল স্ট্রিটে সিংজির ধাবায়।
ভি আই পি রোড এয়ারপোর্ট হোটেল থেকে ঠিক যেখানটায় উত্তর চব্বিশ পরগণার দিকে বাঁক নিয়েছে, সেই মোড়ের মাথার ধাবাটায় খেয়েছেন কখনও? অনবদ্য সব পঞ্চনদের দেশের পঞ্চব্যঞ্জনের পর নিতেই হবে মোষের দুধে ফোটানো বড় এক গেলাস সরভাসা পোয়াপাত্তি চা। সঙ্গে এলাচের মাতচমাত সুগন্ধ। দাম দশটি টাকা মাত্র। খাওয়ার পর মনে হবে আরও টাকা দশেক বেশি নিলেও কোনও সমস্যা ছিল না। এতটাই স্বাদু আর তরতাজা করে দেওয়া অনুভূতি। এর বেশি আর কিছু বলার নেই।
আরেকটি প্রশ্ন। কলকাতার সেরা জিলিপি কোথায় পাওয়া যায়? এককথায় উত্তর: ফুটপাতে। ফুটপাত বলতে অফিসপাড়ার ফুটপাত। সেই ক্যামাক স্ট্রিট থেকে শুরু করে বিবাদি বাগ চত্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি এলাকায় বিভক্ত হয়ে এর বিস্তৃতি। অফিস পাড়ার খাবার— বিষয়টা নিয়ে এতবার লেখা হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর ম্যাগাজিনে যে এ নিয়ে নতুন করে আর কিছু লেখার অবকাশ থাকে না। ডাল ভাত থেকে শুরু করে বিরিয়ানি হয়ে রুটি-লুচি-তরকারি মায় খিচুড়ি-পাপড়-চাটনি এমনকী দই চিঁড়ের ফলার, কী না পাওয়া যায় এখানে। এককথায় একটা ওপেন এয়ার কমপ্লিট ফুড হাব। তবু দুটো পদের কথা আলাদা করে বলতেই হবে। এক) জিলিপি। পাওয়া যায় কিরণশঙ্কর রায় রোডে হাইকোর্টের ঠিক উলটোফুটে। দ্বিতীয় ঠিকানাটি জওহরলাল নেহরু রোডের ওপর মেট্রো রেল অফিসের সামনে। উত্তর থেকে দক্ষিণ শহরের কোনও ময়রার দোকানের জিলিপি স্বাদে-গন্ধে এর ধারেকাছেও আসবে না। অনেকটা মারকাটারি সেই গানটার মতো। ‘চ্যালেঞ্জ নিবি না…।’ যখনই যাবেন তখনই হাতে গরম, রসালো মুচমুচে। কামড় বসানো মাত্র অফিসপাড়ার ভিড়, হই-হল্লা, বাস আর ট্যাক্সির প্যাঁ পোঁ… সব কর্পূরের মতো উবে গিয়ে একটা ঘোরলাগা ভাব গোটা শরীরে। এবার পাঠকের করণীয় বলতে বাকি রইল ঘটনাস্থলে গিয়ে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করা। দুই) ঘুগনি। চায়ের দোকান বা চাটওয়ালার হড়হড়ে আর পেঁয়াজ রসুনের ঘ্যাঁট নয়। তেঁতুল জল বা লেবুর রসের কোনও গপ্পো নেই। ট্রেসিং পেপারের মতো পাতলা ছিলেকাটা নারকোলের টুকরো দেওয়া। জমাট এবং খাঁটি নিরামিষ ঘুগনি। শালপাতা বেয়ে একটুও গড়িয়ে পড়বে না। ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া এক চিমটে জিরে ভাজার গুঁড়ো আর বিটনুন। ব্যস! তাতেই কিস্তিমাত। মনে আছে ঠিক এইরকম ঘুগনি পাওয়া যেত ছেলেবেলায়, গড়পারে। একটু রাতের দিকে। এই সাড়ে আটটা নাগাদ চাকা লাগানো টিনের গাড়ি ঠেলে আসত সনাতনকাকা। আদতে ওড়িশার বারিপদা নিবাসী। ছোটখাট সৌম্য চেহারা। গলায় কণ্ঠির মালা আর টানা সুরেলা একটা ডাক। ঈষৎ নাকিসুরে—‘ঘুঁ উ উ উ নি।’ শোনামাত্র পাড়ায় একটা হুলুস্থূল পড়ে যেত যেন। পাড়ার ছেলেবুড়ো, মেয়েবউ, সবাই রোয়াক, ঝুলবারান্দা অথবা জানলায়। গাড়ির মধ্যে চৌকোনা একটা পাত্রে চাপ বেঁধে থাকা ঘুগনি। শালপাতার বাটিতে করে। সঙ্গে আইসক্রিমের কাঠ চামচ। ঘুগনির সঙ্গে আরও একটা জিনিস বিক্রি করত সনাতন কাকা। নকুলদানা। খই মুড়ির দোকানে চিনির তৈরি ছোট ছোট অমসৃণ গোলাকার যে বস্তুটিকে আমরা সাধারণত নকুলদানা বলে জানি সেরকমটা নয় মোটেই। ফুরফুরে চিনির আঁশে মাখানো টাটকা খোলাভাজা বাদাম। ঘুগনির পর সেই নকুলদানা। রসনা, স্বাদ এবং স্মৃতি, তিনটেকেই আলোড়িত করে রেখেছে আজও। হুবহু সেই একরকম ঘুগনি আজও পাওয়া যায় অফিসপাড়ায়। লালবাজারের উলটোদিকে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের মোড়ে। ভরাপেটেও ওদিকটা দিয়ে গেলেই একপাতা ঘুগনি মাস্ট। একদিনের জন্যও সে নিয়মের অন্যথা হয়নি অদ্যাবধি।
