কেকের কথা যখন উঠলই তা হলে তো একবার যেতেই হবে বো-ব্যারাকে। চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউর গায়ে বউবাজার থানার পাশে। চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যদের থাকার প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল এই ব্যারাক। দু’পাশে লম্বা লাল ইটের দুটো ব্যারাকবাড়ি। মাঝখানে প্রশস্ত রাস্তা। কলকাতার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের একটা উল্লেখযোগ্যঅংশের বাস এখানে। এদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা। তবু যারা রয়ে গেছেন তাদের মধ্যে বিশেষ করে প্রবীণাদের হাতে আজও রয়ে গেছে এক জাদু-রসুইঘরের চাবিকাঠি। কেক আর ওয়াইন। আমাদের পৌষপরবের পুলিপিঠের মতো। বানানো হয় শীতকালে, বিশেষত বড়দিন আর নববর্ষের সময়। তা ছাড়া শীতকালটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের বিয়ের মরশুমও বটে। এই সময় চাহিদা তুঙ্গে ওঠে কেক আর ওয়াইনের। মদিরা রন্ধন-পটীয়সী ঠাকুমা-দিদিমাদের দরজার সামনে ভিড় বাড়ে। সঙ্গে উইন্টার থুড়ি ক্রিসমাস স্পেশাল কেক। আপনিও যান। কিনে ফেলুন প্লাম, ফ্রুট অথবা প্লেন কেকের মধ্যে যেটা খুশি। নামীদামি বেকারির কেক তো সবসময়ই খাচ্ছেন। বো-ব্যারাকের কেক একবার ট্রাই করুন। চেনা রুট বদলে ফেলবেন। একদম সিয়োর। অতঃপর মদিরা পর্ব। গ্রেপস, জিঞ্জার, বানানা আর লিচি— এই চার ধরনের ওয়াইন বানানো হয় এখানে। আমি চিরকেলে অম্বুলে রুগি। সাধারণত টক স্বাদের ওয়াইন খেলে গ্যাস অ্যাসিডিটির সমস্যা হয় একটা। ব্যতিক্রম বো-ব্যারাক আর এদের টকমিষ্টি ঝাঁঝালো স্বাদের ওয়াইন। মদিরা জাদুকরীদের অন্যতম দু’জন, জর্জিনা আর সুজানা আন্টি। বহু বছর ধরে উত্কৃষ্ট হোম মেড ওয়াইন বানিয়ে চলেছেন এই শহরে। এরপর আর একটাও কথা নয়।
ফের সেই ছেলেবেলা। আর ছেলেবেলা মানেই টিফিনের সময় আর ছুটির পর ইস্কুলের গেট। মাস্টারমশাইদের প্রবল চোখরাঙানি আর ‘পেটখারাপ হবে!’ ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছোট ছোট লাল পুঁতির মতো মশলা মাখানো বুনোকুল, হজমি, কাঠির আগায় লাল নীল বরফগুঁড়ো আর সরবতের তীব্র আকর্ষণ। সেটা যে কত তীব্র হতে পারে যারা ইস্কুলে গিয়েছেন তাদের কাউকে নতুন করে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। মনে মনে ভাবতাম ওসব বোধহয় আমাদের মতো বুড়ো হাবড়াদের নস্টালজিয়ার কচকচানি। এতদিনে নিশ্চয় চুকেবুকে গেছে ওসব। এহেন ধারণাকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত প্রমাণিত করে সেদিন চোখ গেল মধ্য কলকাতার নামী একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গেটে। ইস্কুল ছুটির পর গেটের সামনে নামীদামি ব্র্যান্ডের আইসক্রিম আর চিপসের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ফেরিওয়ালারা। সেসবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে গেটের একপাশে রঙিন শরবতের ঠেলাগাড়ি আর হজমির ডালার সামনে ভিড় জমিয়েছে সম্পন্ন ঘরের খুদে পড়ুয়াদের দল। জোগান দিতে দিতে হাঁফিয়ে উঠেছেন বিক্রেতা। হাতের কাঠিতে গোঁজা রামধনু রঙা জমাট বরফের কুচি। ঠোঁটে, গালে, ইউনিফর্মে লেগে যাওয়া লাল, নীল, সবুজের ছোপ। কচি মুখে গোটা একটা পৃথিবী জিতে ফেলার হাসি। দেখামাত্র মনে হল সবকিছুকে এক ছাঁচে মুড়ে ফেলতে চাওয়া বিশাল এই বিশ্বায়নের বাজার কোথায় যেন গো-হারা হেরে গেছে ছোট্ট ওই একটুকরো হাসির সামনে। অন্য খাবারের শেষপর্বে পৌঁছে এটুকুই তো পাওনা এই অধম প্রতিবেদকের।
* লেখাটা শেষ করার কিছুদিন পর জানতে পারলাম কোনও অজ্ঞাত কারণে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির ধাবা বন্ধ হয়ে গেছে। কলকাতার সেরা খাদ্য নক্ষত্রমণ্ডলীর একটি তারকার পতন ঘটে গেল। এছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারি।
১২. এসকর্ট কলকাতা
এসকর্ট সার্ভিস, এসকর্ট গার্ল। বছর কয়েক আগে বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণকাণ্ডের সময় ভিশন মিডিয়ায় আর খবরের কাগজে, একাধিক নামী দামি ব্যক্তিত্বের মুখে বারবার উঠে এসেছিল শব্দগুলো। বেশ কিছু প্রতিবেদনও লেখা হয়েছিল বিষয়টা নিয়ে। এই এসকর্ট সার্ভিস ব্যাপারটা আসলে কী? পাঠকরা জেনেছিলেন এসকর্ট সার্ভিস মানে হাই প্রোফাইল প্রসটিটিউশন। সমাজের উঁচুস্তরে নারীমাংসের কারবার। এদের মধ্যে কেউই নিষিদ্ধপল্লীর দরজায় অথবা রাস্তার ওপর রংচঙ মেখে দাঁড়িয়ে থাকেন না। খোলা চোখে এদের দেখা পাওয়াটা অসম্ভব। সম্পূর্ণভাবে দালাল থুড়ি এজেন্ট নির্ভর। ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত মহিলারা সকলেই কমবেশি শিক্ষিত, বিশেষ করে ইংরেজি সহ আরও দুয়েকটি ভাষায় কথোপকথনে সবিশেষ দক্ষ। পড়তে পড়তে মনটা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল বছর পঁচিশেক আগে। তখন এসকর্ট সার্ভিস কথাটা শোনেনি কেউ। সমাজের উঁচুতলায় এ ধরনের মহিলারা পরিচিত ছিলেন ‘কলগার্ল’ নামে। ঘটনাচক্রে এরকম কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল বিভিন্ন সময় এবং পরিস্থিতিতে। সেই অভিজ্ঞতারই কিছুটা শোনাব এখানে।
উনিশশো একানব্বই কি বিরানব্বই সাল। টুলুদার সঙ্গে বসেছিলাম অলিপাবে। দুটো জাম্বো সাইজের বিফস্টেক আর তিনটে লার্জ পেগের পর টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধে থাপ্পড় লাগাল টুলুদা— “চল, আজ একবার লিলির ফ্ল্যাটে যাব।’ টুলুদা। বেহালা অঞ্চলে বিশাল বনেদি পরিবারের সন্তান। ওই এলাকায় প্রাসাদোপম বাড়ি। পেশায় একটি বহুজাতিক চা-কোম্পানির টি-টেস্টার। যখনকার কথা বলছি তখনও ইএমআই স্কিমের দৌলতে মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে গাড়ি ঢুকে পড়েনি। গাড়ি চড়াটা তখনও বেশ রহিসি ব্যাপারই ছিল। ইন্ডিয়া হবি সেন্টারের সামনে পার্কিং লটে দাঁড় করানো টুলুদার হিলম্যান গাড়িটা। “আব্দুল, থিয়েটার রোড চলো।” গাড়িতে বসে গম্ভীর গলায় ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল টুলুদা।
