বাঘাযতীন থেকে ছোট ছোট তিনটে স্টপেজ। চাইলে হেঁটেও মেরে দিতে পারেন। এইট-বি বাসডিপোর উলটোদিকে যাদবপুর বাজার লাগোয়া গলিতে বউদির চায়ের দোকান। সবসময় থিকথিক করছে ভিড়। ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে ঘোড়েল বাজারু হয়ে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. সুজয় বসু, কে নেই সেই ভিড়ে? আর চায়ের কথা? লিকার, লেবু বা দুধ, বিজ্ঞাপনের ভাষায়—‘চুমুকেই চমক!’ সঙ্গে কম মিষ্টির খাস্তা ‘টোস্ট’ লেড়ো বা ‘এস’ বিস্কুট। অহো, ‘এই তো জীবন কালীদা!’
একটা জরুরি তথ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গ্লাসে চা পাওয়া যায় এখানে। বোধহয় এই দোকানের জন্যই স্পেশালি অর্ডার দিয়ে বানানো। দাম মাত্র তিন টাকা। গ্লাসের নয়, চায়ের।
‘উদ্ভ্রান্ত একঝাঁক যুবক মিলে রাখত ফুটপাত সরগরম/অযথা জ্ঞান দিলে গালিগালাজ গিলে চায়ের দাম দেওয়া শাস্তি চরম…।’ গান বাজছে ছোট সাউন্ডবক্সে। চার দেয়াল ভর্তি নচিকেতার ছবি। ওপরে সাইনবোর্ডে সাদার ওপর নীল লেটারহেডে বড় বড় করে লেখা দোকানের নাম—‘চা ও নচিকেতা। Just for today।’ দুই ভাই পালা করে দোকানটা চালায়, যাদবপুর বাসস্টপেজের গায়ে ফুটপাতের ওপর। বয়স মেরে-কেটে আঠাশ থেকে পঁয়তিরিশের মধ্যে। আর কী অবাক কাণ্ড! পরানদার থেকে প্রায় প্রজন্ম দুয়েকের ছোট এরাও নাকি সেই চা-টা বানায় প্রচণ্ড আবেগ দিয়ে। দুনিয়ার যত নচিকেতাপ্রেমীদের ফেভারিট জয়েন্ট এই— ‘চা ও নচিকেতা।’ দোকানের দুটি বিশেষত্ব। ১. কড়া লিকারের দুধ-চা ছাড়া আর কোনও ধরনের চা পাওয়া যায় না এখানে। ২. সকাল এগারোটা থেকে রাত দশটা— যতক্ষণ দোকান চলবে, নচিকেতা থামবে না এক সেকেন্ডের জন্য। গান আর কড়া দুধ চায়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় উত্সাহী হয়ে অন্যান্য অঞ্চলের নচিকেতাপ্রেমীরা নাকি ব্রাঞ্চ খোলার প্রস্তাব দিয়েছে বলে শুনেছি। দু’ ভাইয়ের গা নেই তেমন। ওদের মতে ‘এই বেশ ভালো আছি।’
কথায় বলে কলম অশরীরী। সত্যিই তো দেখছি কেবল চায়ের চক্রপথে ঘুরে চলেছে চক্রাকারে। যত অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছি ফের টেনে এনে ফেলে দিচ্ছে সেই চায়ের গাড্ডায়। এভাবে তো চলতে পারে না। শুধু কলকাতার চা আর চায়ের ঠেক নিয়ে লিখতে গেলেই একটা হাজারখানেক পৃষ্ঠার বই হয়ে যাবে। তারপরেও লক্ষ লক্ষ চা-তক (আদৌ যদি তারা লেখাটা পড়েন) চেঁচিয়ে পাড়া মাত করবেন—‘কই মশাই, আমাদের পাড়ার দোকানটার কথা তো লিখলেন না?’ তাই এই মুহূর্তে চা-পর্বে ইতি টানলাম। কত দোকান আর ঠেকের কথা যে বলা হল না। বাদ পড়ে গেল শ্যামবাজার, শোভাবাজার, গড়পার, মানিকতলা, কলেজস্ট্রিট, ভবানীপুর, কালীঘাট। লেক আর অকাদেমি চত্বরের অলৌকিক সব চা-বিপণি। অক্ষমতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আশাকরি সেটা পাব।
‘দুধকলা দিয়ে সাপ পোষা’—বাংলার প্রবাদে আছে। সাপ আদৌ পোষ মানে কি? আর পোষ মানলেও দুধকলা খায় কি? সাপ সত্যিই দুধ কলা খায় কি না জানা নেই। তবে মানুষ যে দুধ-কোলা খায়, এক পরিচিতের কাছে এহেন অদ্ভুত এবং বিচিত্র তথ্য জানার পর চোয়াল ঝুলে গেছিল মিনিট খানেকের জন্য। বলে কী রে লোকটা। পাগল না পেট খারাপ? কোলা মানে সোডাভিত্তিক একটা ঝাঁঝালো পানীয়ের সঙ্গে দুধের মতো স্নেহজাতীয় পানীয়ের মিশেল? এ তো আদা-কাঁচকলা বা তেল আর জলের মিশ খাওয়ার চাইতেও জটিল ব্যাপার যাকে বলে। হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম ইয়েতি বা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের চেয়েও রহস্যময় সেই পানীয়ের ঠিকানা। তারপর সুযোগ বুঝে একদিন অগ্রজপ্রতিম বন্ধু সত্যবান মিত্রের সঙ্গে পৌঁছে গেছিলাম হরিশ মুখার্জি রোডে পিজি হসপিটাল সংলগ্ন গুরদোয়ারার গায়ে বলবন্ত সিংস ইটিং হাউজ বা বলবন্ত সিং ধাবায়। আর পান করেছিলাম সেই আশ্চর্য তরল। প্রাণ ভরে। দুধ আর কোলার সংমিশ্রণে যে এরকম সুস্বাদু পানীয় তৈরি হতে পারে নিজের চোখে অথবা নিজে চেখে না দেখলে বিশ্বাসই হত না। এতটাই সুমধুর। দুধ-কোলা ছাড়া দুধ-সোডাও বানিয়ে থাকেন এরা। সেটিও সমান সুস্বাদু। দুধ কোলা বা সোডার পাশাপাশি এখানকার চিকেন তড়কা ফ্রাই আর বাটার নান, সঙ্গে মিক্সড সালাড—জাস্ট অ্যামেজিং! খাবারদাবার ছাড়া ঐতিহাসিক কারণেও এ হোটেল বিখ্যাত। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এটি ছিল পাঞ্জাবের গদর পার্টির বিপ্লবীদের গোপন আশ্রয়স্থল। বর্তমান মালিকদের পূর্বপুরুষরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আশ্রয় দিতেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের। টেবিলে বসে খেতে খেতে নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলাম খুব। হয়তো এই টেবিলে বসেই ভবিষ্যৎ বৈপ্লবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ভগৎ সিং, আসফাকুল্লা খান, রাজগুরু, বটুকেশ্বর দত্তরা। পিকরিক বোমার মশলা আবিষ্কার করেছিলেন শুকদেব, যতীন দাস, চন্দ্রশেখর আজাদ। শুধু ভাল খাওয়া নয়, একইসঙ্গে ইতিহাসকে ছুঁয়ে ফেলার তৃপ্তিটা মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে আজও।
ধাবা বা পাঞ্জাবি হোটেলের কথা যখন উঠলই তখন বলি এরকম আরও কয়েকটা ধাবা রয়েছে এই শহরে যারা নিজগুণেই স্বনামধন্য। শংসাপত্র বা স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই তেমন একটা। যার মধ্যে অন্যতম বালিগঞ্জ ফাঁড়ির ধাবা আর তাদের অজস্র ধরনের পাঞ্জাবি ঘরানার খাদ্যসম্ভার। এই তালিকায় প্রথমেই থাকবে মক্কি (মকাই/ভুট্টা) দি রোটি আর সর্ষোঁ দা শাক। শহরের খুব বেশি পাঞ্জাবি হোটেলে সবসময় এই পদ দুটো পাওয়া যায় না। গরমাগরম মকাইয়ের রুটির সঙ্গে ওপরে ‘মাঠ্ঠা’ (তাজা ক্রিম) ছড়ানো ঘন সবুজ সরষে শাকের যুগলবন্দি। আহা! মুখের মধ্যে যেন রবিশঙ্কর আর আলি আকবরের ডুয়েট কনসার্ট। পাশে একপ্লেট সালাড আর একটুখানি পাঁচমিশেলি আচার। যোগ্য সংগত আল্লারাখা বা জাকিরের মতোই। বুঁদ হয়ে যান মূর্ছনায়! কথা না বাড়িয়ে।
