এরকম আরও বেশ কয়েকটা পর্ক কারির ঠেক রয়েছে ট্যাংরায় বৈশালি সিনেমা হলের আশেপাশে। এছাড়া দক্ষিণ কলকাতার গরচা রোডে বাংলা মদের দোকানের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিতে করে নিয়ে বসতেন একজন। টকটকে লাল ঝোলে মাথা উঁচু করে থাকা আধ ইঞ্চি পুরু বাদিওয়ালা চর্বিদার মাংসের টুকরো। প্রতিটি টুকরো চৌকোনা আর নিখুঁত সমান মাপে কাটা। ঝোলের ওপর ভাসমান তেলে ইতিউতি সন্তরণরত কুচোনো ধনেপাতা। স্বাদে মারকাটারি। অনেককাল ঢুঁ মারা হয়নি ওদিকটায়। ফলে আজও পাওয়া যায় কিনা জানা নেই।
সত্তরের শেষভাগ। পার্ক লেন। পার্ক স্ট্রিটের গায়ে সরু ত্যারচা গলিটা তখন গোটা কলকাতায় বিখ্যাত মূলত দুটো কারণে। বব ডিকস্টার শুকনো নেশার ঠেক— ‘ববস্ প্লেস’ আর লিন্ডা গোমস মানে লিন্ডা আন্টির পর্ক কারি জয়েন্ট। গোটা সত্তর-আশির দশক জুড়ে রাজত্ব চালিয়েছিল শহরে। দুটো আড্ডা। কত স্মৃতি, অনভ্যস্ত কানে শুনে ফেলা কত-শত গান। জিম মরিসন, ন্যাট কিংকোল, বিটলস্, ন্যানসি সিনাত্রা, বব ডিলান, জোন বায়েজ, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জন লেনন, ব্রুস স্প্রিং স্টিন, নীল ডায়মন্ড, বব মার্লে, জিমি হেনড্রিক্স, রোলিং স্টোন… গিটারে উথালপাথাল ঝোড়ো স্ট্রোক… ‘আই মিস ইউ বেবি’… বব ডিকস্টা, বহুদিন হল এ শহর থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে বউবাচ্চা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া… লিন্ডা আন্টি, বছর বিশেক আগে চলে গেছেন তারাদের পথে। সঙ্গে চলে গেছে ভুবনমোহিনী পর্ক কারির সেই জাদু ফর্মুলা। আর ঠিক সেই কারণেই ওরকম পর্ক কারি আর কোনওদিন রাঁধা হবে না তিনশো পেরোনো এই তিলোত্তমায়।
স্মৃতিমেদুর ভারাক্রান্ত মন। একটু চাঙ্গা হতে চলুন ফের একবার ফিরে যাওয়া যাক সেই গড়িয়ায়। তবে স্টেশনের দিকটায় নয়, গড়িয়া মোড়ে। মোড়ের মাথায় মহুয়া সিনেমা হল। মহুয়া-বান্টি-মালঞ্চ-মধুবন। একসময় শহরতলির গর্ব। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। সেভেন্টি এম এম স্ক্রিন। বান্টি, মধুবন বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন হল। মালঞ্চ আর মহুয়া, টিমটিম করে টিকে আছে কোনওমতে। নোংরা পর্দা, জায়গায় জায়গায় তাপ্পি মারা… অস্পষ্ট আওয়াজের সাউন্ডবক্স, গদি ছিঁড়ে গিয়ে চেয়ারের কাঠ বেরিয়ে পড়েছে অনেকদিন। দর্শক হয় না হলে, হতাশ মুখ সিনেমা হল কর্মচারী। হালকা হতে চাওয়া মন ভারী হয়ে আসছে ফের। এই ভীষণ মনখারাপের রেশটা কাটাতে ঢুকে পড়ুন মহুয়ার উলটোফুটের গলিটায়। সোজা গিয়ে যেখানে গড়িয়া মেট্রো স্টেশনের গায়ে ধাক্কা খেয়েছে রাস্তাটা, তার দু’-চার পা আগেই তেলেভাজার দোকানটা। জঙ্গলে ঘুরতে যাওয়ার মতো এ দোকান ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল। কারণ বাজার-সেরা ঠাসবুনোটের ফুলকপি আর পেঁজা তুলোর মতো হালকা নরম তুলতুলে জাম্বো সাইজের বেগুন একমাত্র এ সময়টাতেই পাওয়া যায়। যার মানে ফুলকপির বড়া আর আধ হাত লম্বা বেগুনি। এ দোকানের ডেলিকেসি। এত ভাল ফুলকপির বড়া কলকাতার আর কোনও দোকানে পাওয়া যায় না। বেসনের উষ্ণ আবরণে ভেবে ওঠা তাজা ফুলকপির সুবাস। মুখের মধ্যে থেকে থেকেই ফুটফুট করে ফুটতে থাকা ভাজা ডালের কুচি আর বিটনুনের সোঁদাটে গন্ধ। আবেশটা ধরে রাখতে খেতে খেতেই বেরিয়ে আসুন গলি থেকে। উলটোফুটে মহুয়ার প্রায় গা ঘেঁষেই ছোট চায়ের দোকানটা। গম্ভীরমুখো দোকানি। লাল বা দুধ, দু’ধরনের চায়ের ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞ। দ্রুত চামচ চালাচ্ছেন গ্লাসে। মাটির ভাঁড় বা কাগজের কাপেও দেওয়া হয়। দোকানের আয়তন ছোট কিন্তু দুধ বা লাল, শহরে ভাল চায়ের অন্যতম সেরা ঠিকানা এটি। চুমুকে পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
গড়িয়া থেকে গোটা পাঁচেক স্টপেজ। বাঘাযতীন মোড়। বাস থেকে নেমেই ভাঙা টিনের বেড়ার দোকান। লাল আর দুধ—দু’রকম চা-ই পাওয়া যায়। লালটাই বেশি ভাল। দোকানি। দুর্দান্ত রসিক। অসম্ভব হিউমার সেন্স। দু’-চারটে টুকটাক রসিকতার মধ্যেই বেছে নিন প্লেন লিকার অথবা লেবু, মশলা—যে-কোনও একটা। প্রতিটি উপকরণ একদম সঠিক পরিমাপে। অজস্রবার খেয়েছি। মানের উঠতি পড়তি দেখিনি কখনও।
উলটোফুটে বাঘাযতীন স্টেশন রোডে ঢুকতেই হাতের ডানপাশে পরানদার চায়ের দোকান। পরানদা। সর্বদা হাসিমুখ। কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরির লড়াকু ইউনিয়ন কর্মী ছিলেন। লক আউট হতে হতে একদিন বন্ধই হয়ে গেল কারখানা। গ্লাস কিন্তু পিছু ছাড়ল না পরানদার। উলটে কেটলি-চামচ-উনুন-ছাঁকনি-চা পাতা আর মিল্ক পাউডারকে সঙ্গে নিয়ে উঠে এল ফুটপাতের ধারে একফালি দোকানে। পরানদা। প্রায় সত্তর। একদা একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট পার্টি কর্মী। অফিসিয়াল বামপন্থীদের রকমসকম দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন বছর কুড়ি আগেই। নাটকের পোকা। এখনও মুখে মুখে বলে যেতে পারেন টিনের তলোয়ার, কল্লোল, ব্যারিকেড, ফেরারি ফৌজ, সেতু, মারীচ সংবাদ, দেবীগর্জন… এরকম বহু নাটকের সংলাপ। ওর নিজের বয়ানে—“কমিউনিস্ট পার্টিটা যেরকম সততার লগে করতাম, চা-ডাও ঠিক হেইভাবেই বানাইয়া থাকি। আসলে হেই দুইডাই তো আবেগ।” কথাটা যে কদ্দুর সত্যি সেটা পরানদার চা খেলেই প্রমাণিত হবে। শুধুমাত্র তীব্র প্যাশনের কারণে সস্তার চা পাতা আর গুঁড়ো দুধের মিশেল যে কোন উচ্চতায় উঠতে পারে তার একমেবঅদ্বিতীয়ম দৃষ্টান্ত বোধহয় পরাণদা। আশার কথা গোটা শহরটা এখনও ‘ক্যাপুচিনো’ সভ্যতার মেঘে ঢাকা পড়ে যায়নি। কারণ পরাণদা আজও রয়েছেন কলকাতায়।
