পওয়া বা পোয়া। এ নামেই ডাকা হয় মুসলিম মহল্লায়। খেতে অবিকল মালপোয়ার মতো। এলাকার ফুটপাত স্টলগুলোয় পাওয়া যায়। মৌরির বদলে গোলাপজলের সুগন্ধ। আর মিষ্টির পরিমাণটা মালপোয়ার তুলনায় খানিকটা কম। যারা কম মিষ্টি পছন্দ করেন তাদের জন্য আদর্শ এই ‘পওয়া’। পড়ন্ত বিকেলে গরম গরম ভেজে তোলা হয়। এর দামও মাত্র তিন টাকা। সত্যিই অকল্পনীয়।
নানখাটাই। এর আদি উৎপত্তিস্থল নাকি আফগানিস্তান। সুজি, ডালডা আর ঘিয়ের তৈরি এ বিস্কুট সত্যিই অমৃত সমান। তৈরি হয় পার্ক সার্কাস, রিপন স্ট্রিট, মল্লিকবাজার অঞ্চলের ছোট ছোট বেকারিগুলোয়। বহু নামী বেকারির নামী দামি কুকিজ তো খেয়েছেন। একবার নানখাটাই ট্রাই করুন। মুখে ফেলামাত্র ঝুরঝুর করে ভেঙে মিলিয়ে যাবে। সঙ্গে মিলিয়ে যাবে অন্য কোনও কুকিজ খাওয়ার ইচ্ছেটাও। চ্যালেঞ্জ। সম্বত্সর পাওয়া যায় মল্লিকবাজারের দোকানগুলোয়। তবে সেরা নানখাটাই পাওয়া যায় মহরমের দিন। হালকা ঝুরঝুরে, হাতেগরম। ঘি-ডালডার যুগলবন্দি। ভেবে দেখুন মহরম অবধি অপেক্ষা করবেন না কি আজই রওয়ানা দেবেন মল্লিকবাজারের দিকে।
শিককাবাবের গল্প তো আগেই করেছি। কিন্তু কাবাব ফ্রাইয়ের কথা বলা হয়নি। সন্ধের মুখে বানিয়ে শিকসুদ্ধু নামিয়ে একআধটু তুতিয়ে পাতিয়ে অনুরোধ করলে চাঁপের তাওয়ার একপাশে এক-আধ চামচে ডালডা আর চাড্ডি পেঁয়াজ ফেলে ভেজে দেয় যে-কোনও চুলিয়া হোটেলে (সংখ্যালঘু এলাকায় সস্তার হোটেলগুলোকে এ নামেই ডাকা হয়)। দাম টাকা দুয়েক বেশি পড়ে। আজ থেকে বছর তিরিশ আগে কাবাব ফ্রাইয়ের সেরা ঠিকানা ছিল যমুনা সিনেমার গায়ে নুরি হোটেল। দোকানের বাইরে বিশাল লোহার তাওয়ায় চাঁপের পাশাপাশি সবসময় ভাজা হত কাবাব। ডিমান্ডও ছিল প্রচুর। সে সময় কাবাবপ্রেমীদের কাছে পরিচিত ছিল ‘যম্নাফ্রাই’ নামে। যমুনায় ইন্টারভেলের সময় অথবা গ্লোব, লাইটহাউসে ম্যাটিনি শো সেরে ফেরার পথে থামতেই হবে নুরি হোটেল। আজ যমুনা নেই, লাইট হাউস নেই, নেই সেভেন্টি এম এম পর্দার সেই গ্লোব। সব সিনেমা এখন মাল্টিপ্লেক্সে নয়তো পেনড্রাইভের সুড়ঙ্গ বেয়ে ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল আর এল ই ডি-র পর্দায়। এদিকে বয়সও বেড়েছে। অনেকদিন যাইনি ওদিকটায়। জানি না ‘যমনাফ্রাই’ আজও বহমান কিনা?
নুরি হোটেলের মতো আরেক অমৃতলোকের ঠিকানা পেয়ে গেছিলাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের পিছনে তালতলা লেনের একটা সরুস্য সরু গলিতে। টালির চালের নামগোত্রহীন চুলিয়া হোটেল। ভাঙাচোরা কাঠের বেঞ্চি আর টেবিল। আধো অন্ধকার ভেতরটা। কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে কয়েকটা। প্রচুর লোক খাচ্ছে। মলিন জামা আর লুঙ্গি পরিহিত বেয়ারাদের ব্যস্ত পদচারণা। হাঁকডাক। একদম সাদামাটা চেহারা। কিন্তু রান্নার মান— এককথায় অসামান্য! কবি বীরেন চাটুজ্জের ভাষায়— ‘কোন উপমাটুপমা চলবে না।’ তো খেয়েছিলাম বটে সেই হোটেলে। খুস্কা পোলাও। বিরিয়ানি নয় মোটেই। গাত্রবর্ণ অনেকটা হলুদ পোলাও-এর মতো। জাফরানের ঝাঁঝটা প্রায় নেই বললেই চলে। বড় একখণ্ড মাংসের বদলে ছোট ছোট সুপক্ব মাংসের টুকরো। আলু বা ডিমের কোনও গল্প নেই। ‘একবার খা কে তো দেখিয়ে’—পরিবেশনকারীর এহেন অনুরোধে সঙ্গে নিতে হয়েছিল হাফপ্লেট ‘পাগলা ভুনা।’ ওই হোটেলের ‘ইসপেশাল’ নাকি। এক টুকরো দাঁতে কাটামাত্র বুঝতে পেরেছিলাম না নিলে কি ভুলটাই না করতাম। এমনিতেই যে-কোনও ছোটখাটো চুলিয়া হোটেলের ভুনা গোস্ত (কষা মাংস) যে-কোনও নামী দামি রসাকষাদের বলে বলে ইনিংস ডিফিট দেবে তায় আবার ‘পাগলা ভুনা’। তা খেয়েছিলাম বটে কবজি ডুবিয়ে। খাওয়া তো নয় যেন একটা প্লেটনিক জার্নি থ্রু দ্য স্টমাক। খাওয়া সেরে ময়লা বেসিনে হাত ধুয়ে কাউন্টারের ওপর রাখা জর্দার কৌটো থেকে মৌরি তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে বিল মেটাচ্ছি, সামনে এসে দাঁড়ালেন পরিবেশনকারী বৃদ্ধ চাচা। বৃদ্ধ মানুষ। একগাল সাদা দাড়ি। মলিন লুঙ্গি আর গেঞ্জি। কিন্তু হাসিটা ভারী সরল আর তরতাজা। কাঁধে একটা আধময়লা তোয়ালে (নিশ্চয়ই অনেকে মুখ মুছে গেছে ওই একই তোয়ালেতে)। এগিয়ে দিয়েছিলেন মুখ মোছার জন্য। না করতে পারিনি স্রেফ ওই ভনিতার লেশমাত্র না থাকা হাসিটার জন্য। খাবারের দামের সঙ্গে এগিয়ে দিয়েছিলাম সামান্য দু’-পাঁচটা অতিরিক্ত টাকা। কতটুকুই বা মানে রাখে? মুহূর্তের মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠে সারা মুখ জুড়ে আরও চওড়া হয়েছিল হাসিটা। আর তাতেই আলোয় আলোময় সংখ্যালঘু মহল্লার ঘুপচি আধো অন্ধকার গরিব হোটেল। পরবর্তীতে বহুবার ওই এলাকার অলিতে গলিতে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি হোটেলটাকে। পাইনি। উঠে গেল? নাকি প্রোমোটারের থাবায় পড়ল? নাকি আদৌ কখনও ছিলই না বাস্তবে? অনেকটা সেই জন লেননের ‘নো হোয়ার ল্যান্ড’-এর মতো। ভোরবেলার ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া সুখস্বপ্নের মতো মিনিট পনেরো-কুড়ি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেছে। উত্তরটা পাইনি বাস্তবে।
একটা কথা ভেবে দেখেছেন কখনও? কলকাতা শহরে রান্না করা শুয়োরের মাংস বা পর্ক পাওয়া যায় কি না? পাঁচতারা হোটেলের ব্যাপারস্যাপার জানি না। তবে আমরা মানে সাধারণ শহরবাসীরা কুকড পর্ক বলতে বুঝি চিনে রেস্তোরাঁর খাবার আর বাড়িতে খেতে হলে দোকানের মাংস বা শপিং মল থেকে কিনে আনা হ্যাম-সালামি-সসেজ-বেকন ইত্যাদি ইত্যাদি। অবগতির জন্য জানাই তার বাইরেও দু’-চারটে কুকড পর্কের ঠিকানা রয়েছে কলকাতায়। যেখানে তৈরি হয় আদি অকৃত্রিম পর্ক কারি। লাল ঝাল, ধনেপাতার সুবাস ছড়ানো শুয়োরের মাংসের ঝোল। পাওয়া যায় গড়িয়া রেল স্টেশনের গায়ে ছোট্ট দোকানে। মাংসের এই পদটি রাঁধার জন্য সবিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। কখন ঠিক তাক করে কড়াইয়ে ছাড়তে হবে যাতে মাংসের ওপরে চর্বির অংশটা গলে না যায়, তীক্ষ্ন নজর রাখতে হবে সেদিকে। আর সেই কৌশলটাই জানেন দোকান মালিক হরিদা। দোকানে মাংসের পাশাপাশি হাতে গড়া রুটিও পাওয়া যায়। লাল লাল ঝোলে চুবিয়ে মাংসসুদ্ধ একটা কামড়। মোটা চর্বিওয়ালা বাদিতে দাঁত কেটে বসার ‘কচ’ মৃদু শব্দ। বাকিটা— পুরো শিল্প।
