মনে আছে আগের প্রতিবেদন ‘মোগলাই কলকাতা’-য় লিখেছিলাম আরবি হালিম পাওয়া যায় একমাত্র রমজানের মাসে, শহরের বেশ কয়েকটা নামজাদা মুসলিম হোটেলে। কথাটা আংশিক সত্যি হলেও পুরোটা নয়। অনেকটাই ওই ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’-র মতো। আসলে হালিম সম্বত্সরই পাওয়া যায় কলকাতায়। তবে হোটেলে নয়, ফুটপাতে। চাকা লাগানো গাড়িতে ধোঁয়া ওঠা ফুটন্ত হালিমের হাঁড়ি। নীচের পাটাতনে বসানো জ্বলন্ত উনুন। বাটিতে বাটিতে ঢেলে কড়া লাল পেঁয়াজ ভাজা, রোগন তেল, পাতিলেবুর রস আর লঙ্কাকুচি ছড়িয়ে তুলে দেওয়া হচ্ছে খদ্দেরের হাতে, এরকম ঠেক শহরে বেশ কয়েকটা রয়েছে খিদিরপুর মোড়, পার্ক সার্কাস ময়দানের গায়ে আর ধর্মতলার মোড়ে স্টেটসম্যান বিল্ডিংয়ের উলটোদিকে। কিন্তু সবার সেরা ঠেকটি বেকবাগান মোড়ে কোয়স্ট মল ঘেঁষা সামসুল হুদা রোড ধরে এগিয়ে ব্রাইট স্ট্রিটের মোড়ে। সামুভাইয়ের ফুটপাত স্টল। গাড়ির সামনে সবসময় খদ্দেরের ভিড়। ঘন ডালের সমুদ্রে সাবমেরিনের মতো আত্মগোপন করে থাকা পাতলা মাংসের সর আর দু-চারটে টুকরো। সে কী সুগন্ধ। অহো! স্বাদে আর খাদ্যগুণে যে-কোনও একনম্বরি মোগলাই রেস্তোরাঁর সঙ্গে পাল্লা দেবে একমুহূর্তে ক্লান্তি অপহরণকারী এই হালিম। দীর্ঘ সময় আমেরিকা প্রবাসী, বর্তমানে সেক্টর ফাইভে এক বহুজাতিক সফটওয়ার সংস্থায় উচ্চপদে আসীন আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু সৌমিত্র বসু ওরফে ক্ষ্যাপা (চেহারাটা অনেক ডব্লু ডব্লু ই অথবা সুমো পালোয়ানকেও লজ্জায় ফেলে দিতে পারে) যখনই এ ঠেকে হানা দেয়, অন্তত পাঁচ থেকে ছ’ বাটি পরপর না খেয়ে থামে না। তবে আপনারা ভুল করেও সে চেষ্টা করবেন না। হালিম স্বাস্থ্যকর এবং একই সঙ্গে প্রচণ্ড সুস্বাদু হলেও খানিকটা গুরুপাক তো বটেই। একবাটি দু’বাটিতে যা ‘রিফ্রেশিং’, চার-পাঁচ বাটিতে সেটাই সমস্যায় ফেলতে পারে। ক্ষ্যাপার পক্ষে যা সম্ভব অন্যদের পক্ষে সেটা কখনওই নয়। রাতবিরেতে ঝামেলা হলে হ্যাপা কে সামলাবে? আর অসামান্য কোনও সৃষ্টি পরিমিত পরিমাণে চাখলেই রসনার সঠিক তৃপ্তি হয়। ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত অবশ্যই ক্ষ্যাপা। তবে ব্যতিক্রমটা ব্যতিক্রমই। নিয়ম নয় কখনওই। স্টলের মালিক সামুভাই। ফরসা ছিপছিপে হ্যান্ডসাম চেহারা। দুর্দান্ত স্মার্ট। ঠোঁটের কোণে সর্বদা লেগে থাকা আন্তরিক একটা হাসি। নিজে অসামান্য পাচক। এখন নিজে হাতে আর না রাঁধলেও দাঁড়িয়ে থেকে পুরো প্রক্রিয়াটার ওপর কড়া তদারকি চালান রোজ। বহু ফ্র্যাঞ্চাইজি আর নামী হোটেলে রাঁধুনির চাকরির অফার পায়ে ঠেলে দিয়ে এই আরবি হালিম ভাণ্ডার আজও চালিয়ে যাচ্ছেন সামুভাই। সামসুল হুদা রোড আর ব্রাইট স্ট্রিট মোড়ের ফুটপাতে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, রমজানের একমাস বিফের পাশাপাশি চিকেন হালিমও বানিয়ে থাকেন সামুভাই অ্যান্ড কোং। গোমাংসে আপত্তি থাকলে রমজানের মাসে যে-কোনও একদিন সন্ধের পর আপনার অবশ্য গন্তব্য হোক সামুভাইয়ের স্পেশাল আরবি হালিম। তবে দোকানে প্রচণ্ড ভিড় হয় এ সময়টায়। টালা টু টালিগঞ্জ, বাবুরা গাড়ি হাঁকিয়ে এসে ঘটিবাটি ভর্তি করে কিনে নিয়ে যান। মোটামুটি সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যে পেল্লায় চেহারার চার-পাঁচটি হাঁড়ি চেঁচেপুছে সাফ একেবারে। দেরি করলে হতাশ হবার সম্ভাবনা প্রবল।
শুধু কি হালিম? আরও কত ধরনের সুস্বাদু খাবার যে ছড়িয়ে রয়েছে সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলো জুড়ে তার লেখাজোখা নেই। কলকাতার আর কোথাও এসব খাবারের দেখা মেলে না। তার মধ্যে অন্যতম পানতারাস। ছোট ছোট মুসলমান হোটেলে বা খাবারের দোকানগুলোয় পাওয়া যায়। এনভেলাপ বা খামের মতো করে চারপাশটা মোড়া। চৌকোনা আকারের। ময়দার পাতলা আস্তরণের মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আলুর টুকরো (মাখা বা চটকানো নয়), পেঁয়াজ-রসুনকুচি আর মশলা মাখানো মাংসের কিমার পুর। ডুবো তেলে ভেজে তোলা হয়। স্বাদ আর কুড়মুড়ে ক্রিসপি ভাবটা আচ্ছা আচ্ছা নামী কনফেকশনারির প্যাটিসকে লজ্জায় ফেলে দেবে। যে-কোনও দিন। সামান্য সসের সঙ্গে… ইরশাদ! ইরশাদ! আর দাম? শুনলে মনে হবে শায়েস্তা খাঁর আমলে ফিরে গেলুম নাকি? মাত্র আড়াই টাকা পার পিস। ভাবা যায়! আশ্চর্যজনক যেটা প্রতিদিন বেলা এগারোটা, বারোটা নাগাদ বানানো শুরু হয় এই অনন্য খাদ্যবস্তুটি। একটা দেড়টার মধ্যে খতম। ফলে খেতে চাইলে ভরদুপুর ছাড়া গতি নেই। এরকম একটা বেখাপ্পা সময়েই কেন? বহুবার জিজ্ঞেস করেছি একাধিক হোটেলওয়ালা বা দোকান মালিককে। “অ্যায়সা হি হোতা হায়”—নিস্পৃহ আর নির্লিপ্ত উত্তর পেয়েছি প্রতিবারই। মাইক্রোওভেনে ফের গরম করে নিলে স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকবে কি? জানা নেই কারণ সে চেষ্টা করিনি কোনওদিন।
সামোসার বাংলা মানে তো সিঙ্গারা। কিন্তু সংখ্যালঘু মহল্লায় সামোসা মোটেই সেরকম নয়। বরং অনেকটা সেই মা-ঠাকুমার বানানো পুলিপিঠের মতো আকারে। ভেতরের পুরটা অবিকল পানতারাসের মতো। স্বাদও প্রায় একইরকম। এখানে উল্লেখ্য যেটা, যে দোকানে সামোসা তৈরি হবে সেখানে পানতারাস বানানো হবে না কখনওই। উলটোদিকে পানতারাস নির্মাতাদের ক্ষেত্রেও ওই একই কানুন প্রযোজ্য। কারণটা কী? আগের প্রশ্নের মতো এ প্রশ্নেরও উত্তর পাইনি কখনও।
