শেয়ালদা থেকে কলেজ স্ট্রিটের আগের স্টপেজ কলেজ স্কোয়ার। বঙ্কিম চাটুয্যে স্ট্রিট ধরে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের মোড়ে রোজ বিকেলে এসে দাঁড়ান একজন। সেই লম্বাটে ধরনের মোড়া আর চওড়া গোল ঝাঁকা। চাক চাক সেদ্ধ আলু আর মটর… কোনও এক্সট্রা কায়দাবাজি নেই। সিম্পল, ওল্ড ফ্যাশনড, এথনিক অ্যান্ড এক্সক্লুসিভ আলুকাবলি। ঠিক সেই ছেলেবেলার মতো। আর কী চাই? তা হলে একদিন বেরিয়ে পড়ুন সেই ছেলেবেলা থুড়ি আলুকাবলির সন্ধানে।
এখনও পাওয়া যায়। চৌকোনা টিনের ঘেরাটোপে খোপে খোপে সাজানো সেদ্ধ আলু, সেদ্ধ ছোলা, কাঁচা ছোলা, কাঁচা লঙ্কা-পেঁয়াজ-শশা-টম্যাটো কুচি, সেঁউভাজা, বাদামভাজা আর চানাচুর, শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো আর দু’-চার রকম মশলা। ঘেরাটোপের মাঝখানে ফুঁড়ে ওঠা টিনের ড্রামভর্তি মুড়ি। পাশে দুটো শিশিতে তেঁতুলগোলা জল আর সরষের তেল। চাওয়া মাত্র মিলিয়ে মিশিয়ে, নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে তৈরি হবে সেই পুরনো ঝালমুড়ি। ঝাঁকানোমাত্র নাকে মশলা মাখা মুড়ির প্রাণকাড়া সুবাস! গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন যেখানটায় রবীন্দ্র সরোবরের গায়ে শেষ হচ্ছে, তারপর থেকে পুরো লেক চত্বরের রেলিং ঘেঁষে এরকম দু’-চারজন আছেন যারা বাপ-পিতেমোর ছেড়ে যাওয়া রিলে রেসের ব্যাটনটাকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন আজও। অনেকটা সেই লাস্ট অফ দ্য টাইটানসের মতো। হালফ্যাশনের কায়দায় চাট-ভেলপুরির সঙ্গে ঝালমুড়ি নয়। শুধু শুধু এবং শুধুমাত্র ঝালমুড়ি। আদি এবং অকৃত্রিম। অভিযোগ শুধু একটাই। ঠোঙার বদলে যদি সেই সাবেকি কায়দায় কাগজের মোড়কে মুড়িয়ে দিতেন। বিক্রেতারা একটু ভেবে দেখবেন কথাটা।
ঝালমুড়ি নয়। মুড়িমাখা। ঝালমুড়ি গোত্রের হলেও স্বাদে অনেকটাই স্বতন্ত্র। মূলত বাদাম, সেঁউ, ছোলাভাজা আর দুর্দান্ত সুগন্ধি একটা চাটমশলা মিশিয়ে বানানো হয় এই মুড়িমাখা। একমাত্র অল্পস্বল্প সেদ্ধ আলুর টুকরো সরষের তেল ছাড়া পেঁয়াজ-শসা-টম্যাটো বা তেঁতুলজল কিছুই মেশানো হয় না। ফলে অনেকটা বেশি শুকনো আর ঝরঝরে থাকে। প্রত্যেকটা পদের স্বাদ আলাদা আলাদাভাবে অনুভূত হয় মুখে, বানানোর কায়দাটাই এরকম। মুড়িমাখার সেরা ঠিকানা এ শহরে মাত্র কয়েকটি। লর্ড সিনহা রোড আর এজেসি বোস রোডের মোড়ে ক্যাথলিনের গায়ে, লাইটহাউস-নিউমার্কেটের মাঝখানে গলির মোড়ে আর পার্কস্ট্রিট, বিবাদী বাগের খাবার পাড়ায়। বিক্রেতারা সবাই অবাঙালি। তবে বারবার খেয়ে একটা কথাই মনে হয়েছে মুড়িমাখার আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে রয়েছে ওই চাট মশলায় (বিক্রেতারা বলেন ‘কুটা মশালা’)। প্যাকেটে আলাদা করেও বিক্রি হয়। বাড়িতে কিনে নিয়ে গিয়ে বানিয়ে দেখেছি। ফুটপাতের সেই সু’তারটা পাইনি কখনও। হাতের গুণে কি? কে জানে?
চানাচুর আর ঘটিগরমের কথাই যখন উঠল তখন ঘটিগরম আর চানাচ্যাপটাই বা বাদ থাকে কেন? প্রথমে ঘটিগরম দিয়েই শুরু করা যাক। মোটামুটি পড়ন্ত বিকেলের মুখে মুখে উত্তর চব্বিশ পরগনার গুমা, বিড়া, চাঁদপাড়া, মছলন্দপুর, ঠাকুরনগর, বনগাঁ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে লোকাল ট্রেন ধরে কলকাতায় নেমে পড়েন এই ঘটিগরম বিক্রেতার দল। ছড়িয়ে পড়েন শহরের এদিক ওদিক। গলায় ঝোলানো অ্যালুমিনিয়ামের বালতি ভর্তি চানাচুর। মাঝখানে জ্বলন্ত কাঠকয়লার আঙড়া ভর্তি একটা ছোট ঘটি। চানাচুরকে টাটকা, মুচমুচে, গরম রাখার জন্য। চানাচুরের জুড়িদার হিসেবে পিঁয়াজের বদলে ফিনফিনে কাটা কাঁচা আম বা বিলিতি আমড়ার কুচি। সিজন অনুযায়ী। যখন যেটা পাওয়া যায়। অতঃপর হালকা করে ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া সামান্য বিটনুন আর মশলা। ব্যস, তাতেই অসামান্য হয়ে ওঠে কম ঝালমশলার সস্তা চানাচুর। শহরের অনেক জায়গাতেই সন্ধের মুখে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলেও দেখা পাওয়ার শিয়োর শট কলকাতা ময়দান। কমপক্ষে দশ-পনেরো জনের দেখা তো মিলবেই। ভীষণ সরল, দরিদ্র আর দলিত মতুয়া সম্প্রদায়ের এই মানুষরা, মুখে সর্বদা একটা মিঠে হাসি নিয়ে আজও ঘটিগরম বিক্রি করে যাচ্ছেন বাবুদের এ শহরে।
চানাচ্যাপটা, চালু ভাষায় মিক্সচারওয়ালা। কলকাতার ফুটপাতে দেখা মিলবে এদেরও। এরা সবাই উত্তরপ্রদেশ নিবাসী। প্রত্যেকের কমন ইউনিফর্ম সাদা ধুতি পাঞ্জাবি, মাথায় গান্ধিটুপি। কাঁচাছোলাকে খলনোড়া কিংবা হামানদিস্তেয় পিটে পিটে চ্যাপটা করে খোলার আঁচে ভাজা হয়। তেল ছাড়া। হলদে কালো ছোপ ছোপ, গা-টা অমসৃণ, এবড়ো খেবড়ো। ঘটি গরমের মতো এদের ঝুড়ির মাঝখানেও বসানো থাকে একটা কাঙড়ার পাত্র। তবে ঘটিগরমের মতো ধাতুর নয়, মাটির। উদ্দেশ্য একই। খাবার গরম রাখা। দু’-চার ফোঁটা লেবুর রস। সামান্য মশলা আর বিটনুন। তাতেই পুরো ব্যাপারটা টেনিদার বয়ানে—‘ডিলা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস!’ শুধুমাত্র এই কারণেই মুড়িমাখা-চাট-চুরমুর-ঝালমুড়ির চেয়ে চানাচ্যাপটা আর ঘটিগরমকে অনেকটা এগিয়ে রাখব আমি। হাজার রকম মশলার কারিকুরি নেই। নেই নানা ধরনের আনাজপাতির ঝক্কি। বেসিক প্রোডাক্ট একটা। সামান্য দু’-একটা উপকরণের যোগ্য সংগত। ব্যস তাতেই কেল্লাফতে। অনেকটা ঠিক সেই উনিশশো ছিয়াশির বিশ্বজয়ী আর্জেন্তিনা টিমের মতো। সেরকম তারকা কোনও খেলোয়াড় নেই। কিন্তু একা সেই ফুটবলের ঈশ্বর! পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির লোকটা। দশনম্বর সাদা-নীল জার্সি। দলের মূল গায়েন। এক থেকে এগারো নম্বর—সব ক’জনই দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। আর তাতেই গোটা ফুটবল দুনিয়া পদানত। ঘটিগরম আর চানাচ্যাপটাও হুবহু ওই একরকম। মূল পদটা জিনিয়াস। সঙ্গে মামুলি কিছু উপকরণের ক্ষুদ্র কিন্তু আন্তরিক সহযোগিতা। ঠিক এখানেই বাকিদের দশ যোজন পিছনে ফেলে দিয়েছে এই দুই ফুটপাত ডেলিকেসি। এই প্রতিবেদকের অন্তত মত তাই।
