হাজরা মোড় থেকে রাসবিহারীমুখো এগোলে পরের স্টপেজ উজ্জ্বলা সিনেমা। সিনেমা হল উঠে গেছে কবেই, রয়ে গেছে উজ্জ্বলার চানাচুর। ছোট্ট এতটুকু পায়রার খোপের মতো দোকান। যখনই যাওয়া যাক না কেন নিদেনপক্ষে পাঁচ থেকে পঁচিশজনের লাইন দোকানের সামনে। ওজন করে বাদামি রঙের ঠোঙায় পুরে তুলে দেওয়া হচ্ছে হাতে হাতে। নো পলিপ্যাক বিজনেস। পিয়োর বাদাম তেলে ভাজা। মোটা সেঁউভাজা, চিনেবাদাম আর ডালের সঠিক মেলবন্ধন। খাওয়ার পরমুহূর্তে পোয়াপাত্তি দুধের চা বা এক গ্লাস জল যে-কোনও একটা খেয়ে ফেলুন ঢকঢক করে। একফোঁটা অম্বল হবে না। আর ঠিক এই কারণেই আমার সোমরসিক কিছু বন্ধুর কাছে আজও উজ্জ্বলার চানাচুরের কোনও বিকল্প নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এই মহার্ঘ খাদ্যপদটির আকর্ষণ কিছুটা কম। ঝালমশলাহীনতার কারণে। অবশ্য তাতে উজ্জ্বলার মাহাত্ম্য এতটুকুও কম হচ্ছে না। অতএব শুভস্য শীঘ্রম। ডেস্টিনেশন উজ্জ্বলা।
চানাচুর তো অনেক হল। এবার ‘একটু ভাল চা পাওয়া যায় কোন দোকানে।’ চা মানে লাল চা। কালীঘাট পার্কের গায়ে যোগেশ মাইমের সামনে ফুটপাতে ছোট্ট চায়ের দোকান। চা-পাতা, গরম জল আর চিনির পারফেক্ট ব্লেন্ড। চাহিদা অনুযায়ী লেবু আর মশলা মিশিয়ে দেওয়া হয়। তবে খেতে হলে প্লেন লিকারের বিকল্প নেই। যদিও এটা একান্তভাবেই ব্যক্তিগত মতামত। এবার আপনার মর্জি। কালীঘাট ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটা লাল চায়ের ঠেক রয়েছে পাশাপাশি ভবানীপুর আর লেক মার্কেট অঞ্চলে। এর মধ্যে সামথিং স্পেশাল দেশপ্রিয় পার্কের গায়ে দাদাবউদির লাল অথবা লেবু চা। না খেলে সত্যিই মিস করবেন।
বালিগঞ্জ বিজন সেতু ধরে সটান নেমে এসে গড়িয়াহাটের দিকে এগোতে না এগোতেই হাতের বাঁ পাশে একটা হাতে ঠেলা গাড়ির ওপর বিশাল ঝুড়ি। ওপরে আধখোলা প্লাস্টিকের চাদরের আড়াল থেকে উঁকি মারছে গোল গোল ফুচকার ঘিয়ে-রঙা মাথা। পাশে চকচকে স্টেইনলেস স্টিলের হাঁড়িতে গোলা তেঁতুল জল (আগে স্টিলের জায়গায় থাকত মেটে হাঁড়ি)। একপাশে ডাঁই করে রাখা সেদ্ধ মটর আর আলু। কুচোনো কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা আর অন্তত পাঁচ-সাত রকম মশলার বাটি। গাড়ি ঘিরে ভিড়। বেশিরভাগই মহিলা। আট থেকে আশি। সবার হাতে ছোট ছোট শালপাতার বাটি। দোকানি, মাঝবয়েসি। আলু-মটর, বিটনুন, মশলা, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা সবকিছু নিপুণ হাতে মেখে হাঁড়ির তেঁতুলগোলা জলটা ঘুলিয়ে নিচ্ছেন ফের একবার। কে বেশি ঝাল, কার ঝাল কম, জিজ্ঞেস করে নিচ্ছেন ওর মধ্যেই। অতঃপর ঝুড়িতে হাত গলিয়ে বের করে আনা ফুচকার পেটে আঙুলের চাপে ছোট্ট একটা ফুটো। ভেতরে পুরে দেওয়া মশলামাখা আলুমটরের পুর। অবিশ্বাস্য দ্রুত হাতে তুলে দিচ্ছেন পাতে থুড়ি শালপাতার বাটিতে। কিমাশ্চর্যম! ক্রেতারা সবাই আলাদা আলাদাভাবে তাদের পছন্দের স্বাদটা পাচ্ছেন। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের চূড়ান্ত নমুনা। অভিযোগের কোনও জায়গাই নেই। ক্রেতাদের চোখমুখের চেহারাই বলে দিচ্ছে অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে চলেছেন প্রত্যেকে। শেষপাতে একটা পুরঠাসা ফুচকা, তেঁতুলজল ছাড়া, ফাউ হিসাবে। চিবিয়ে শেষ করামাত্র শালপাতায় ঢেলে দেওয়া একটু তেঁতুলজল, ওপরে বিটনুন মশলার ছিটে (রিকোয়েস্টে রিপিটও করা হয়)। ‘সুরুৎ’—পরম পরিতৃপ্তির চুমুক একটা। অম্লায়েন সমাপয়েৎ। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এই পেট্রল পাম্প ছাড়াও আরও অন্তত কুড়ি থেকে পঁচিশটি সেরা ফুচকার ঠিকানা রয়েছে এ শহরে। গোলপার্ক, গড়িয়াহাট, রবীন্দ্র সরোবর, যাদবপুর, মধ্য কলকাতার পার্ক স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিট, থিয়েটার রোড আর বড়বাজার অঞ্চলে। সাধারণ ফুচকা ছাড়া দই-ফুচকা, বুঁদিয়া ফুচকা বা দহিবড়া ফুচকাও বানিয়ে থাকেন অনেক বিক্রেতা। সঙ্গে আরেক অমোঘ আকর্ষণ—চুরমুর। আধচটকানো ঝাল ঝাল মশলাদার আলুর সঙ্গে শুকনো ফুচকার পাপড়ির যুগলবন্দি। প্রতিটি মহিলার হার্টথ্রব। কোথায় লাগে উত্তমকুমার বা শাহরুখ খান। তবে সেরার সেরা ফুচকা আর চাট তথা চুরমুরের সেরা ঠিকানাটি কিন্তু উত্তর কলকাতায়, হেদোর মোড়ে। বৃথা বাক্যব্যয়ে অযথা সময় নষ্ট। সন্ধের মুখে মুখে পৌঁছে যান একদিন। শ্রবণ আর জিহ্বার বিবাদ ভঞ্জন হয়ে যাবে।
ঝালমুড়ি আর আলুকাবলি। অমর হয়ে আছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদার গল্পে। এক সময় পাওয়া যেত পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ করে উত্তর কলকাতায়। সন্ধেবেলায়, গলির মোড়ে মোড়ে। আজ বিলুপ্তপ্রায়। দু’-একটা ভাল ঠেকের কথা জিজ্ঞেস করলে অনেকেই মাথা চুলকোবেন। সে আলুকাবলি খেতাম বটে তিন-চার যুগ আগে হৃষিকেশ পার্কের গায়ে। লম্বাটে বেতের মোড়া ধরনের স্ট্যান্ডের ওপর চ্যাটালো ডালায় উঁচু করে সাজানো চাক চাক করে কাটা আলু আর সেদ্ধ মটর। গোল গোল, নিটোল। পাকা তেঁতুলের রস আর মশলায় জড়ানো, সামান্য একচিমটে বিটনুন আর লঙ্কাকুচি ছিটিয়ে, ‘চেরি অন কেক’-এর মতো আলুর মাথায় গোঁজা একটা ছোট কাঠি। শালপাতা আর তেঁতুল-মশলার গন্ধ মিলেমিশে একাকার… যেন স্বপ্ন। তারপর ‘সময় গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার’… পার্কের মাঠে কেষ্টিদার ফুটবল কোচিং ক্যাম্প, বুকসমান হাইটের লোহার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝালমুড়ি আর আলুকাবলিওয়ালা… সবকিছু মিলিয়ে গেছে ভোরবেলার অলীক স্বপ্নের মতো। কেষ্টিদার স্বপ্নের এবং মিনিমাগনার কোচিং ক্যাম্পে এখন ছেলেকে শচীন-সৌরভ বানানোর স্বপ্ন ফিরি করা হয়। চড়া দামে। গেটের সামনে আলুকাবলি আর ঝালমুড়িওয়ালার জায়গায় দাঁড়ানো গাড়িঠেলা ফুচকাওয়ালা। ক্রেতারা চাইলে তিনিই আলুকাবলি বানিয়ে দেন। কিন্তু ওই যে কথায় বলে—‘যার যেটা কাজ।’ ফুচকাওয়ালার বানানো আলুমটর মাখা কখনওই আলুকাবলির হাজার আলোকবর্ষের কাছাকাছিও পৌঁছতে পারে না। তবে আমি হাল ছাড়িনি। গোটা কলকাতা তিল তিল করে ঢুঁড়ে বের করে ফেলেছি এক্সক্লুসিভ আলুকাবলি আর ঝালমুড়ির ঠিকানা। আর প্রদোষ সি মিটারের মতোই লাফ দিয়ে চিৎকার করে উঠেছি সোল্লাসে—“আছে! আছে!”
