তিনকড়ির প্রায় গা ঘেঁষেই হিন্দুস্থানি চানাচুর ভুজিয়ার দোকানটা। নামগোত্রহীন। দাঁড়িয়ে পড়ুন দোকানের সামনে। লম্বাটে একটা টিনের একদিক খোলা পাত্রে থরে থরে সাজিয়ে রাখা জুঁইফুল রঙা সাদা ছাঁকা তেলের চিঁড়েভাজা। ওপর থেকে ফোকাস মারছে তিনশো ওয়াটের একটা সি এফ এল লাইট (আগে বাল্ব জ্বলত)। চিঁড়েভাজার রঙটা জুঁইফুলের মতো লিখলাম বটে, আসলে ওটা হবে কুমোরটুলি থেকে সদ্য নিয়ে এসে মণ্ডপে অথবা বাড়িতে বসিয়ে দেওয়া বীণাপাণি ঠাকরুনের গাত্রবর্ণের মতো। সঙ্গে কারিপাতা, কড়া ভাজা বাদাম, ঝুরিভাজা আর একচিমটে বিটনুনের সঠিক মিশেল। চাইলে দোকান থেকে সেলোফেনের প্যাকেটে ভরে মোমবাতির আগুনে প্যাক করে দেবে কিন্তু আপনি ঠোঙাতেই নিন। তখনই খাওয়া শুরু করবেন না, প্লিজ। ঠোঙা হাতে ট্রামলাইন পেরিয়ে এপারে আসুন। সামনেই বিন্তুদের বাড়ির রোয়াক। পাড়ার বাকিগুলো সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে কবেই হারিয়ে গেছে। বিন্তুদেরটা কিন্তু টিকে আছে আজও। এই ছোট্ট একফালি রোয়াক জুড়ে কত স্মৃতি। বাড়ির সামনে হারিয়ে যাওয়া পাড়ার ছোট্ট পার্ক। কুমিরডাঙ্গা, চোর চোর… একটু বড় হয়ে চার দশ হাইটের ফুটবল। বিন্তু দুরন্ত সেন্টার ফরোয়ার্ড। কাইজার স্ট্রিটের রেলমাঠে দ্রোণাচার্য বাঘা সোমের প্রিয় ছাত্র। পাড়ায় সবাই বলত বড় হয়ে ইন্ডিয়া খেলবে। একদিন মাঝরাত্তিরে গলায় দড়ি বেঁধে সিলিংয়ে ঝুলে গেল। বিন্তুদের দোতলায় ছোনুদা, পিন্টুদা, তপুদি… ছোনুদা স্কটিশ চার্চ স্কুল থেকে ন্যাশনাল স্কলার হয়েছিল। এখন ঘোর অপ্রকৃতিস্থ। একগাল সাদা দাড়ি। সারাদিন উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায় আর ফিজিক্সের থিয়োরি আওড়ায়। মেজ ভাই পিন্টুদা। সত্তরের দশকে পিন্টুদার খোঁজে এলাকার পর এলাকা তোলপাড় করে ফেলেছিল গোটা উত্তর কলকাতার ছ’-সাতটা থানার পুলিশ। বীরভূমের কোনও একটা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ধরা পড়ে বছর সাতেকের কারাবাস। ঘেঁটে যাওয়া জীবনটা আর ঠিকঠাক হয়নি কখনওই। ছোট বোন তপুদি। বাগবাজারে ডাকের সাজের দুগ্গাঠাকুর দেখেছেন কখনও? তপুদিকে দেখতে হুবহু ওইরকম। সেইসঙ্গে প্রচণ্ড দাপট আর প্রখর ব্যক্তিত্ব। লাল স্কার্ট আর সাদা শার্ট পড়ে দুটো কলাবিনুনি দুলিয়ে যখন ব্রাহ্ম গার্লসে যেত, পাড়ার সব লক্কার দল রক থেকে বেমালুম হাওয়া। পাড়ায় সমবয়সি বন্ধুদের রক্ষাকবচ ছিল তপুদি। এই অধমকে খুব ভালবাসত। মণিমেলার পিকনিকে চূড়ান্ত অবাধ্য আর ভয়ংকর রকম ব্যাদড়া এই এতটুকু একটা ছেলেকে ধমকে ধামকে জোর করে খাইয়ে দেবার দায়িত্বটা সর্বদাই বর্তাত তপুদির কাঁধে। সেই তপুদি শেষমেশ কিনা সাধিকা হয়ে গেল। পরনে লালপাড় গরদের শাড়ি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। ইয়া লম্বা সিঁদুরের টিকা কপালে। প্রতিদিন প্রচুর ভক্তসমাগম হয় বাড়িতে। কী একটা মা নামে যেন তপুদিকে ডাকে ভক্তরা। অবাক হয়ে মাঝে মাঝে ভাবি পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে তপুদিকেই ডেস্টিনি এরকম একটা অবস্থানের জন্য নির্বাচিত করল!
যাকগে, হটান এসব পুরনো কথা। ফুটপাত পেরিয়ে সোজা হয়ে এসে বসে পড়ুন বিন্তুদের রোয়াকে। ভয় নেই, উত্তর কলকাতার রোয়াকে এখনও অচেনা কেউ এসে বসলে বাড়ির লোকেরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় না। তাই জুত করে বসুন। ঠোঙা খুলে তারিয়ে তারিয়ে খান দুনিয়ার সেরা চিঁড়েভাজা। কোনও নামী ব্র্যান্ডের ঝলমলে প্যাকেজিং বা অমুক তমুক ভুজিয়াওয়ালার দোকান এর ঠিকানা দিতে পারবে না। রোয়াকে বসেই খান, কারণ আজ থেকে প্রায় বছর পঞ্চাশেক আগে একটা বাচ্চা ছেলে এই রোয়াকে বসেই তার বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খেত দুনিয়াসেরা এই চিঁড়েভাজা। বিন্তুদের রোয়াকে বসে খেলে স্বাদটা যে আরও কয়েক লক্ষ গুণ বেড়ে যাবে সে বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
একটু এগিয়েই রাজাবাজার। রাস্তার ওপর দাঁড়ানো সার সার ঘোড়ার গাড়ি। মোড়ের ওপর সস্তা মুসলমান হোটেল। সামনে লম্বাটে মাটির উনুনে কুচো কয়লার গনগনে আঁচে ঝলসানো হচ্ছে শিককাবাব। মশলা মাখানো আধপোড়া মাংসের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। দাম মাত্র সাত পয়সা। সেটা সত্তর কি একাত্তর সাল। মনে আছে প্রথম নিষিদ্ধ মাংস ভক্ষণের জিভেখড়ি এখানেই। তখন নিয়মভঙ্গের পর্ব চলছে চারদিকে। এতদিনে অনেককিছু পালটেছে। সেই টালি খোলার দোকানের সামনে আজ ঝকঝকে গ্লো-সাইনবোর্ড। কাবাবের দাম সাত পয়সা থেকে বেড়ে আট টাকা। তবু সেই নিয়মভঙ্গের সাক্ষী হয়ে আজও রয়ে গেছে হোটেলটা।
উত্তরের মায়া কাটিয়ে চলুন এবার যাওয়া যাক মধ্য কলকাতায়। লেনিন সরণি ধরে সোজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের মোড়। হাতের বাঁদিকে মোড়ের মাথায় ছোট্ট দোকান। তাকে সাজানো রকমারি ছোলাভাজা, বাদাম আর চানাচুরের বয়াম। তবে প্রিমিয়াম প্রোডাক্ট পট্যাটো চিপস। দোকানের সামনে বিশাল লোহার কড়াইয়ে ফিনফিনে পাতলা করে কাটা আলুর চাকা, গনগনে আঁচে, ডুবো তেলে ভাজা হয়ে চলেছে অনবরত। ভেজে তোলার পর প্রত্যেকটা চাকা দেখতে ঠিক হলুদ ডানা ছোট ছোট প্রজাপতির মতো। বহুকাল আগে পুজোর মুখে মুখে আসত আমাদের শহরে। প্রত্যেকবার দোকানটার সামনে দিয়ে গেলেই পুরীর ঢেউয়ের মতো লাফ দিয়ে ফিরে আসা কৈশোর যৌবন। সে এক অলৌকিক সময়। পঁচাত্তর কিংবা নব্বই পয়সায় ‘ফাইভ মেন আর্মি’, ‘ড: জিভাগো’ বা ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। মেট্রো, গ্লোব, লাইট হাউস, নিউ এম্পায়ারে। ষাট পয়সায় ময়দানের সবুজ গ্যালারিতে ফুটবল। পিন্টু, শ্যাম, সুরজিৎ, হাবিব, মজিদ বাসকারের সোনা বাঁধানো বুটের জাদু। দেখে ফেরার পথে অবধারিত স্টপেজ সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার। কাগজের ঠোঙায় চিপস। ওপরে ছড়ানো বিটনুন আর লঙ্কাগুঁড়োর ছিটে। চার-পাঁচজনের চাঁদা মেলানো পয়সায়। ভাগযোগ করে খেতে খেতে বাড়ি ফেরা। তখন কলকাতার দোকানগুলোর সামনে অমুক কুড়কুড়ে, তমুক মুড়মুড়ের ঝাঁ চকচকে লাল-নীল-সবুজ প্যাকেটগুলো ঝোলানো থাকত না। সুতরাং পটাটো চিপস মানেই সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার। সমার্থক দুটো শব্দ। বিশ্বায়নের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে সটান দাঁড়িয়ে আছে আজও। টম্যাটো, তন্দুরি বা চিলিসস মার্কা নকল স্বাদগন্ধের প্রলোভন বা হাতছানি নেই। নেই বিজ্ঞাপনের চমক বা জাগলারি। উপকরণ বলতে খাঁটি তেল আর টাটকা আলু। ‘যে চিনবে সে কিনবে’—শুধুমাত্র এই আপ্তবাক্যটিকে সম্বল করে আজও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পুরনো ক্রেতার দল। সেটাই বা কম কিসে।
