* আসলে মোগলাই কলকাতার বদলে এই প্রতিবেদনের শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল ‘অওধ-ই-কলকাতা’ অথবা ‘লখনওভি কলকাতা’। কারণ কলকাতায় নবাবি খানার জনপ্রিয়তার পিছনে মোগল সভ্যতার অবদান অতি সামান্য। কিন্তু মোগলাই শব্দটার বিপুল পরিচিতির কথা মাথায় রেখেই প্রতিবেদনের উপরোক্ত শিরোনামটিই বহাল রাখলাম।
১১. অন্য খাবার: কেয়ার অফ কলকাতা
অন্য খাবার। সত্যিই অন্যরকম। সবসময় নামী পরিচিত দোকান বা হোটেল রেস্তোরাঁ নয়, এরকম কত যে চেনা অচেনা খাবারের ঠিকানা মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে এ শহরের ফুটপাতে, ছোট ছোট হোটেলে, দোকানে, রাস্তার ধারে স্টলগুলোয়, তার ইয়ত্তা নেই। তাদের সবাইকে যে হাতের মুঠোয় ধরতে পেরেছি এরকম অসম্ভব দাবি করব না কখনওই। তবু যেটুকু পেরেছি তাই বা কম কী? সেইসব জানা অজানা রত্নভাণ্ডারগুলো থেকে খানিকটা নয় আজ আপনাদের সঙ্গে ভাগই করে নিলাম। ক্ষতি কী?
‘ঝাল চানাচুর টাটকা হলে মুখের কথা বলা বন্ধ হয়…।’ সেই নব্বইয়ের দশকে লেখা অমোঘ এই গানের লাইনটা। একশো শতাংশ সত্যি। আজও। মুখের কথা বন্ধ করে দেবার মতো কয়েকটা চানাচুরের ঠিকানা আজও রয়েছে এই তিনশো টপকানো শহরে। মানিকতলার মোড়ে ছায়া সিনেমার গায়ে মোহন সাউয়ের দোকান। ঝাল, মাঝারি ঝাল, কম ঝাল, টকমিষ্টি …অজস্র ধরনের চানাচুর, চিপস, কচুভাজা, গাঁঠিয়া, ঝুরিভাজা আর ভুজিয়া পাওয়া যায় এ দোকানে। তবে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ডালমুট। চিপস, গাঁঠিয়া, বাদামের অনধিকার প্রবেশ নেই। স্রেফ ঝালঝাল মশলায় চান করা, ছাঁকা তেলে ভাজা, সোনার বরন মুচমুচে কুড়মুড়ে ছোলার ডাল। অপেক্ষা করে রয়েছে আপনার জন্য কাচের বয়ামে। ওপরে সামান্য পাতিলেবুর রস দু’-চার ফোঁটা, একচিমটে বিটনুন, ঠোঙাটা একবার ঝাঁকিয়ে নেওয়া ভাল করে… ব্যস! শুরু হয়ে গেল ঠাকুমার ঝুলি কিংবা অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড! স্ন্যাকস আর টিটবিটস্ সর্বস্ব শহরে মোহন সাউ অ্যান্ড সন্স আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা এই ডালমুট নামক সভ্যতা ও তার দলিল-দস্তাবেজকে। কতদিন পারবেন জানা নেই। তাই আজ যাচ্ছি, কাল যাব করলে শেষমেশ হয়তো হতাশ হতে পারেন। সুতরাং চটজলদি পৌঁছে যান মানিকতলার মোড়ে। এক ঠোঙা রূপকথা কিনে আবেশে আধবোজা চোখে চিবোতে চিবোতে হাঁটা লাগান শেয়ালদামুখো। পরের স্টপেজ শ্রীমানি বাজার। শ-দেড়েক বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়া এই বাজারের নীচে, সুকিয়া স্ট্রিটের ওপর তেলেভাজার দোকান। আলুর চপের মধ্যে পুরটা যদি ঠিকঠাক না হয় তা হলে চপের মজাটাই মাটি। কলকাতার বহু দোকানেই এই পুরটা ঠিকঠাক বানাতে জানে না। শ্রীমানি মার্কেটের আলুর চপ খেলে বুঝতে পারবেন আলুর সঙ্গে সঠিক মশলার মিশেল এই স্বাদকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। আলুর চপের পাশাপাশি একই আসনে বসার যোগ্য এদের ধোঁকা আর বেগুনি। ওপরে পোস্ত ছেটানো মুচমুচে বেসনের আস্তরণ। ভেতরে ঢাকাই মসলিনের চাইতেও পাতলা করে কাটা লম্বা বেগুনের ফালি, যে শিল্পকর্ম অনেক নামী পাঁচতারা হোটেলের শেফদেরও লজ্জায় ফেলে দেবে। একমুঠো মুড়ির সঙ্গে বর্ষাকালে… নাঃ থাক। লেখা গুলিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর বাকি রইল ধোঁকা। আধবাটা আর ফেটিয়ে ফেটিয়ে পেঁজা তুলোর মতো করে ফেলা ছোলার ডালে তৈরি হবে এই অসামান্য পদটি। ভাজা মৌরির মনোরম সুগন্ধ। ওপরটা অমসৃণ। দাঁতের চাপে ভেঙে কুচিকুচি মুড়মুড়ে ডালের কণা… বাকিটা পল সাইমনের ‘সঙ অফ সাইলেন্স!’ সন্ধের মুখে গেলে দেখবেন রামমোহন রায় রোড, দিনেন্দ্র স্ট্রিট, গলি গড়পার, হরিনাথ দে রোড, পীতাম্বর ভটচাজ লেন, বাদুড়বাগান, যুগিপাড়া, বৃন্দাবন মল্লিক লেন, ওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন স্ট্রিট, কালু ঘোষ লেন, বলদেপাড়া… পাড়ার গিন্নিরা এসে ঠোঙায় করে ধোঁকা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। রাতে ডালনা হবে। ঘি, গরম মশলা আর সামান্য হিং দিয়ে। বেটার হাফের যদি রান্নার তাগবাগ থাকে তা হলে একঠোঙা কিনে নিয়ে সোজা পৌঁছে যান বাড়ি। ছুটিছাটার দিনে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়-স্বজনদের নেমন্তন্ন করে সত্যি সত্যিই ধোঁকা খাইয়ে দেওয়া যাবে।
তেলেভাজার দোকানের ঠিক উলটোফুটেই নন্দলাল ঘোষ অ্যান্ড গ্র্যান্ড সন্স। নামজাদা সব মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পাশে নামটা একটু মলিন হয়ে গেছে ঠিকই তবে উত্কৃষ্টতা আর গুণমানে কখনওই নয়। সেটা একবার পরীক্ষা করে দেখলেই বুঝতে পারবেন। এখানে আপনার পছন্দের আইটেম হোক হিংয়ের কচুরি, সঙ্গে পাঁচফোড়নের সুগন্ধি মেশা নিরামিষ আলু কুমড়োর লাবড়া। শেষ পাতে রাজভোগ অথবা কমলাভোগ। ভেতরে ছোট্ট এতটুকু একটা তুলতুলে নরম ক্ষীরের পুর। আর কোনও বিশেষণের প্রয়োজন নেই। তবে সেরা মিষ্টির দোকানগুলোর তালিকায় মুহূর্তের মধ্যে আর একটা নাম যে যোগ হয়ে যাবে সেটা নিশ্চিত। হান্ড্রেড পার্সেন্ট।
এই দেখুন চানাচুর দিয়ে শুরু করে এ কোথায় চলে এলাম। তবে এরকম বারবারই হবে। প্রতিবেদনের শিরোনাম যেহেতু ‘অন্য খাবার’, তাই অন্যরকম একটা ছকভাঙা কায়দাই চলবে। ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাবে, চেনা রুট বদলে যাবে বারবার। কিচ্ছু করার নেই। সুকিয়া স্ট্রিট থেকে ফের শেয়ালদামুখো এগোলে শ্রীমানি বাজারটা যেখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তার গা ঘেঁষে বাদুড়বাগান লেন। এখানেই একদম গলির মুখেই ছিল তিনকড়ি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ছিল মানে এখন আর নেই। তিনকড়ি মানে শুধুই কড়াপাকের সন্দেশ। আর কিচ্ছু না। বেশি নয় মাত্র আট দশ রকমের মিষ্টান্ন পদ। সব কড়াপাক। তার মধ্যে গোল মন্ডা, বরফি, গুঁজিয়া, আতা আর আম সন্দেশের স্বাদ আজও মুখে লেগে রয়েছে। বিজয়া দশমী, লক্ষ্মী পুজো আর ভাইফোঁটার দিন তৈরি হত চন্দ্রপুলি আর রাতাবি সন্দেশ। তিনকড়ি স্পেশাল। প্রতিদিন সন্ধে ছ’টা-সাড়ে ছটার মধ্যে শোকেস খালি। এলাকায় এতটাই চাহিদা ছিল তিনকড়ির মিষ্টির। শুধুমাত্র কড়াপাক সন্দেশের দোকান। শুধু কলকাতা নয় গোটা রাজ্যে আর কোথাও আছে অথবা ছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই। ষাটের দশকের শেষভাগে বন্ধ হয়ে যায় তিনকড়ি। এখানেও কারণ বাঙালির সেই চিরন্তন ব্যাধি: শরিকি বিবাদ।আজও যদি ওই এলাকায় প্রবীণ মানুষদের এ ব্যাপারে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করেন তা হলেই তিনকড়ি উঠে যাওয়ার হা-হুতাশটা ভালরকম অনুভব করবেন। নিশ্চিত এ ব্যাপারে।
