এবার মিশন মধ্য কলকাতা। এন্টালি অঞ্চল। মৌলালি মোড় থেকে সি আই টি রোড ধরে বিরশুলহাট বা ফুলবাগান বাসস্টপ। পুরো ফুটপাত আর গলি জুড়ে বিশাল চামড়ার হাট। জুতো, চপ্পল, ব্যাগ, বেল্ট… আরও কত কিছু। উলটোফুটে মেহদিবাগানের গলি। সংখ্যালঘু মহল্লা। অপরিষ্কার, ঘিঞ্জি, ভিড়ভাট্টা, হই হট্টগোল… ব্যাপারগুলোকে মাথা থেকে ঘণ্টাখানেকের জন্য হাটিয়ে দিতে পারলে ঢুকে পরুন এলাকায়। যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন কায়ুম বা জম্জম্ কোথায়। অত্যন্ত সহৃদয়, আন্তরিক মানুষজন সব। যে কেউ বাতলে দেবেন বিশদভাবে। গলি তস্য গলির মধ্যে প্রথমে কায়ুম। শ’দুয়েক মিটার বাদে ইসমাইল স্ট্রিটের গলিতে জম্জম্। বিফ নির্ভর মোগলাই খানার কলকাতা সেরা দুই হোটেল। এদের বিরিয়ানি থেকে শুরু করে চাঁপ, ভুনা, কোফতা, প্রতিটি আইটেমই এককথায় দুরন্ত। তবে র্যাঙ্কিং নাম্বার ওয়ান অবশ্যই জমজমের বিফ-স্টু। স্টু বলতে আমরা সাধারণত ট্যালটেলে ঘোলাটে সাদা রঙের একটা কিছু বুঝি। এদের বিফ-স্টু কিন্তু মোটেই সেরকম নয়। লালচে সুগন্ধী মশলাদার ঘন ঝোল। সঙ্গে নান, তন্দুরি বা রুমালি রুটির যে-কোনও একটা। ঝোলে ডুবিয়ে… জাস্ট কোনও কথা হবে না কাকা।
এছাড়াও কায়ুম বা জমজমের আরেকটা পদের কথা উল্লেখ না করলে এদের রন্ধনশৈলীর প্রতি অবিচার হবে বোধহয়। আরবি হালিম। পাঁচমিশেলি ডাল, ঘি, কাবাবচিনি, এক নম্বর পাঞ্জাবি গম, দালিয়া, অজস্র ধরনের এক্সক্লুসিভ মশলার মিশ্রণে তৈরি হয়ে এই অমৃত পদ। পাওয়া যায় একমাত্র রমজানের মাসে। সারাদিনের উপবাসব্রত বা রোজা ভাঙার পর ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ডেলিকেসি। ক্লান্তি অপহরণকারীও বটে। চিনেমাটির পিরিচভর্তি, গরম গরম, ওপরে ভাসমান লালচে ভাজা পিঁয়াজ, ধনেপাতার কুচি আর রোগনের ছিটে। তবে অতুলনীয় এই খাদ্যবস্তুটি একমাত্র রমজানের মাসেই পাওয়া যায়। তাও আবার সন্ধেবেলায়। চাহিদা প্রচুর। তাই ইচ্ছে থাকলে বিকেল বিকেল পৌঁছে যান মেহদিবাগানে। দেরি করলে চেখে দেখার সুযোগ ফসকে যেতে পারে। এখানে জানিয়ে রাখি আরসালান, সিরাজ, রয়্যাল, জিসান সহ কলকাতার অন্যান্য নামী মোগলাই রেস্তোরাঁগুলোও বছরের এ সময়টা মাটন হালিম বানিয়ে থাকে। সেসবও তাদের নিজস্ব স্বকীয়তায় অনবদ্য। তবে ওই যে বললাম মাংস হিসেবে হালিমের সেরা উপকরণ বিফ। তবে একান্তই আপত্তি থাকলে মাটনে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন। কী আর করা যাবে।
বছর চল্লিশ আগেকার কথা। কলকাতা শহরে ধুন্ধুমার শীত পড়ত তখন। গ্রিন হাউজ এফেক্ট বা এল-নিনোর নামও শোনেনি কেউ। মনে আছে এইরকম এক শীতের ভোরবেলায় সূর্য ওঠার অনেক আগে অভিন্নহৃদয় বন্ধু হায়দর আলি নস্কর ওরফে কোচনের আধভাঙা স্কুটারের পেছনে চেপে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছে গেছিলাম জাকারিয়া স্ট্রিট। নাখোদা মসজিদের পাশের গলিতে। সার সার হোটেল। আধো কুয়াশামাখা অন্ধকার। প্রতিটা হোটেলের সামনে লাইন দিয়ে রাখা ছোট বড় স্টেইনলেস স্টিল আর অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান। তীব্র কৌতূহল হল। “ব্যাপারটা কী?” প্রশ্ন করলাম কোচনকে। “সে কথা পরে হবে। আগে এগোই চল।” বলেই হনহন করে হাঁটা লাগাল কোচন। খানিকটা এগিয়েই একটা হোটেলের সামনে পুরনো সাইনবোর্ডে লেখা—‘সুফিয়া’। “এলাকার মধ্যে এটাই বেস্ট। চল সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। এরপর ভিড় বেড়ে যাবে।” কোচনের কথাই সত্যি। ইতিমধ্যেই আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে লোকজন ভিড় জমাতে শুরু করেছে দোকানের সামনে। ক্যানের মালিকরাও এসে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করেছেন লাইনে। ভোরের আজান পড়ামাত্র ভেতর থেকে ঘড়ঘড় শব্দে খুলে গেল রোলার গেটটা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই মুহূর্তের মধ্যে চোঁ চাঁ টেনে দৌড় লাগাল দোকানের মধ্যে। হাতে কোচনের হ্যাঁচকা টান। পড়ি কি মরি করে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়া গেল একটা কাঠের বেঞ্চিতে। “এক নাহারি, এক পায়া, আট ডালপুরি।” বেয়ারা এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এক নিশ্বাসে অর্ডার করল কোচন। অর্ডার নিয়ে চলে গেল বেয়ারা। আমি মুখ ঘোরালাম দরজার দিকে। ততক্ষণে গেটের সামনে ঢিমে আঁচের উনুনে এনে বসানো হয়েছে পেল্লায় সাইজের দুটো হাঁড়ি। দু’-দুজন কর্মচারী গোল হাতায় করে লাইনে খদ্দেরদের ক্যানে ঢেলে দিচ্ছে তরল মতো একটা কিছু। ওপরে পাতিলেবু চিপে ছড়িয়ে দিচ্ছে কাঁচালঙ্কা আর ধনেপাতার কুচি। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমাদের টেবিলেও বড় বড় দুটো পিরিচে সাজিয়ে এসে পড়ল। ওই একই তরল খাদ্যবস্তু। টকটকে লালচে সুপের মতো চেহারা। ওপরে ভাসমান ধনেপাতা আর কাঁচালঙ্কার কুচি। পাশে একটুকরো পাতিলেবু। আরেকটা প্লেটে ফুলকো ফুলকো আটখানা ডালপুরি। পাতিলেবু চিপে, ধোঁয়াওঠা ঝোলে চুবিয়ে একটুকরো দাঁতে কেটেই বাকরহিত হয়ে গেছিলাম কিছুক্ষণ। সে কি সুতার। জাস্ট হেভেনলি! আর স্বাদ? নোনতা স্বাদের কোনও খাবারকে কি মধুর বলা চলে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই এতগুলো বছর বাদেও ‘মধুর’, এই শব্দটা ছাড়া আর কোনও উপমা মাথায় আসছে না। কোচনের কাছেই জেনেছিলাম দুটো পিরিচে একটার নাম নাহারি, অন্যটা পায়া। সারারাত ঢিমে আঁচে ফুটিয়ে বানানো হয় এই বিস্ময় পদযুগল। রান্নার পদ্ধতি আর মশলাপাতি প্রায় একইরকম। ফারাকের মধ্যে পায়ার উপকরণ গোরু অথবা খাসির ঠ্যাং আর নাহারিতে লাগে বাত্তি (পেটের দিক) অথবা করেলির (হ্যামস্ট্রিং) নরম মাংস। ডালপুরির স্বাদও একেবারে অন্যরকম। সাধারণত ময়রার দোকানে আমরা যে ডালপুরি খেয়ে থাকি তার সঙ্গে মেলে না একদম। ভেতরে ডালের বদলে ছাতুর পুরের সঙ্গে মেশানো পিঁয়াজ, রসুন, ধনেপাতা আর কাঁচালঙ্কার ছোট ছোট কুচি। ঘি বা ডালডার বদলে ব্যবহার করা হয় সাদা তেল। ফুলকো, কুড়মুড়ে, হাতেগরম। খেতে অন্যরকম কিন্তু স্বাদে অনবদ্য। তবে মোগলাই খানার বারোমাস্যায় হালিমের মতো পায়াও এ শহরে ক্ষণিকের অতিথি। অনেকটা সাইবেরিয়ার পরিযায়ী হাঁসের মতো। শীতকালে মাত্র মাসতিনেকের জন্য দেখা দিয়েই উধাও শহর থেকে। তা হলে আর কী? একপেট খিদে আর এক জিভ জল নিয়ে ‘বদর, বদর’ বলে বেরিয়ে পড়ুন একদিন ভোরে পরিযায়ী পায়া সন্ধানে।
