এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি একসময় মোগলাই খানার আরও দু’টি উমদা ঠিকানা ছিল কলকাতায়। বছর দুয়েক হল পুরনো ঠিকানা বদলে উলটোফুটে যেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে সিরাজ, সত্তর দশকে ঠিক সেখানটাতেই ছিল সোসাইটি হোটেল। কার চাঁপ সেরা? সোসাইটি না রয়্যাল? এ নিয়ে বিপুল তর্ক ছিল স্পষ্টতই দু’ভাগে বিভক্ত মোগলাই খাদ্যপ্রেমীদের মধ্যে সে সময়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি কোনও অজ্ঞাত কারণে (অনেকের মতে শরিকি বিবাদে) বন্ধ হয়ে যায় মোগলাই খানার বেতাজ বাদশা এই সরাইখানা।
দ্বিতীয়টি আমজাদিয়া। পুরনো কলকাতায় মোগলাই খাদ্যবিলাসের আরেক অবশ্য গন্তব্য তীর্থস্থল। শিয়ালদা ফ্লাইওভার থেকে নেমেই ঠিক মির্জাপুর অধুনা সূর্য সেন স্ট্রিটের মোড়ে। সিরাজ, সোসাইটির এ শহরে পা রাখার অনেক আগে থেকে কাচ্চি এবং পাক্কি, লখনউ এবং হায়দ্রাবাদি দু’ ধরনের বিরিয়ানির আঁতুরঘর। ছেলেবেলায় বেশ কয়েকবার গেছি বাবার সঙ্গে। এখনও মনে আছে দোকানের বাইরে এবং ভিতরের দেয়ালজোড়া সাদা চিনেমাটির টুকরোর ম্যুরালে মুগল শিল্পকলার কারিকুরি। বড় বড় থাম। সার সার টেবিল, মার্বেলের স্ল্যাব বসানো। ঘি-জাফরান-চর্বিদার খাসিগোস্তের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। টেবিলে বসলেই পরিবেশক উসমান চাচা, বাবার পরিচিত, সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেন, “ক্যা দাদা, কাচ্চি না পাক্কি?” অর্থাৎ আমজাদিয়ায় যখন এসেছে তখন কাচ্চি বা পাক্কি, বিরিয়ানি খাবেই। এতটাই প্রত্যয় প্রশ্নের মধ্যে। সমগ্র কলকাতাবাসীর দুর্ভাগ্য ষাটের দশকের প্রায় গোড়ার দিকেই বন্ধ হয়ে যায় আমজাদিয়া। আজকের প্রজন্ম চাখতেই পারল না কাচ্চি আর পাক্কি বিরিয়ানির স্বাদ। আফশোস! কিন্তু শুধুমাত্র অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকলেই তো চলবে না। তাই চরৈবতি চরৈবতি। বলি কি গোমাংসে যদি আপত্তি না থাকে তা হলে আপনার জন্য এ শহরে অপেক্ষা করছে আরও কয়েকটি স্বর্গীয় রসনার ঠিকানা। তার মধ্যে অবশ্যই একনম্বরে আসবে নিজাম। আর তাদের এক্সক্লুসিভ অ্যান্ড প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড— ‘বিফ রোল।’ কলকাতা কর্পোরেশন বিল্ডিংয়ের ঠিক উলটোদিকে প্রায় নিউমার্কেটের গা ঘেঁষে এই অত্যাশ্চর্য রোল বিপণি। বিফ রোল। কাগজে গোল করে মোড়া মুচমুচে লাচ্ছা পরোটা, খাঁটি বনস্পতিতে ভাজা, মধ্যে নরম শিককাবাবের টুকরো। সঙ্গে ঝিরঝিরে করে কাটা পিঁয়াজের রিং। অল্প কাঁচালঙ্কা কুচি, গোলমরিচের গুঁড়ো আর সামান্য ভিনিগার অথবা পাতিলেবুর যোগ্য সংগত। ব্যস, আজকাল চারদিকে গজিয়ে ওঠা রোল সেন্টারগুলোর মতো হাবিজাবি চিলি বা টম্যাটো সস—নৈব নৈব চ। কামড় বসানোমাত্র মুখ দিয়ে একটি কথাই বেরিয়ে আসতে বাধ্য— ‘সাধু, সাধু!’ বাকিটা বর্ণনা করা আমার পক্ষে সাধ্যের অতীত। এই বিফ রোলেরও কিন্তু একটা বিচিত্র ইতিহাস আছে। চল্লিশের দশক। ব্রিটিশ আমল। কলকাতা ময়দান কাঁপাচ্ছে দুর্ধর্ষ মহামেডান স্পোর্টিং। কালে খাঁ, বাচ্চি খাঁ, জুম্মা খাঁ, নুর মহম্মদ, হাফেজ রশিদ… বিপক্ষের ত্রাস এক সে এক কিংবদন্তি ফুটবলার সব। গোরাদের হারিয়ে পর পর পাঁচবার কলকাতা ফুটবল লিগ বিজয়ী প্রথম স্বদেশি টিম। আনন্দে আত্মহারা কাজী নজরুল আস্ত একটা কবিতাই লিখে ফেলছেন— ‘এ যে লীগ বিজয় নয় রে ভাই, দিগ্বিজয়’। দলের প্রতিটা খেলা দেখতে সমর্থকদের ভিড় উপচে পড়ত ময়দানে। খেলা ভাঙার পর তারাই দলে দলে এসে ভিড় জমাতেন নিজামে। বিখ্যাত পরোটা আর কাবাবের লোভে। স্বাভাবিকভাবেই দোকানে একসঙ্গে অত লোকের জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হত না দোকান মালিকদের পক্ষে। কিন্তু খদ্দেরদের সকলেরই চাই কাবাব-পরোটা। ফলে সময়ও লাগত প্রচুর। সঙ্গে উপরি পাওনা অত্যুত্সাহী এবং উগ্র সমর্থকদের বিশৃঙ্খলা, হৈ হট্টগোল। অবস্থা সামাল দিতে এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করলেন কর্তৃপক্ষ। পরোটাকে গোল করে কাগজের মোড়কে মুড়ে ভেতরে পুরে দেওয়া কাবাব আর পেঁয়াজের টুকরো। ধরিয়ে দেওয়া কাস্টমারের হাতে হাতে। ব্যস! সমস্যার সমাধান এক মুহূর্তে। জন্ম নিল ভুবনবিখ্যাত বিফ রোল। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলে আসছে সমানে। তবে বেশ কয়েক বছর হল মালিকানা বদল হয়েছে নিজামের। নতুন কর্তৃপক্ষের হাতে পড়ে কেমন যেন একটা কর্পোরেট কর্পোরেট চেহারা নিয়েছে প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান। ঝকঝকে এসি রেস্তোরাঁ। কাচের দরজায় টাঙানো ‘নো-বিফ’ প্ল্যাকার্ড। পুরনো কৌলীন্য আর বনেদিয়ানার গৌরব অনেকটাই অতীত এখন। বিফের চেয়ে মাটন আর চিকেনের বিভিন্ন পদকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইদানীং। তবুও পিছনদিকে একফালি জায়গায় পুরনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে এখনও। এসি নেই। পুরনো কাঠের চেয়ার টেবিল। তবু ওখানেই যান। দেখেচেখে নিন প্রায় বিলুপ্ত এই ঐতিহাসিক রোল-সভ্যতাকে। পুরোটা ‘নো বিফ’ জোনে চলে যাওয়ার আগেই।
নিজামের ঠিক গায়েই আরেক আদি বিফ রোলের হোটেল। বিহার। কৌলীন্য বা নামডাকে নিজামের তুলনায় খানিকটা ফিকে পড়ে গেলেও খাবারের মান স্বাদে-গন্ধে কিছুমাত্র কম নয়। জানিয়ে রাখা দরকার শিককাবাব ছাড়াও সুতি-কাবাব, শাম্মী-কাবাব, রেশমি-কাবাব সহ একাধিক প্রাণহরা কাবাবের ঠিকানা এই নিজাম এবং বিহার। তবে সবার সেরা ক্ষিরি-কাবাব। গরম পরোটার মধ্যে গুঁজে দেওয়া ছোট ছোট নরম কচকচে দুঘবাঁটের টুকরো। কাগজের মোড়কটা ছিঁড়ে স্রেফ একটা কামড়। বাকিটা? মাশাআল্লা!
