রয়্যাল ঘোর কাটিয়ে এবার এগোনো যাক। চিৎপুর রোড ধরে সোজা এগিয়ে লালবাজার টপকে প্যারাডাইস সিনেমার সামান্য আগে ‘আলিয়া।’ মোগলাই খানার আরেক সাধনস্থল। রয়্যালের মতোই এদেরও সবকটি পদই অনবদ্য এদের নিজস্ব গবেষণাগারে। তবে এদের বিশেষত্ব এমন একটি পদে যা বোধহয় কলকাতার আর কোনও মোগল বিপণিতেই পাওয়া যায় না। ‘থাল্’ অর্থাৎ মুর্গ মুসল্লম। আস্ত জাফরান রঙা ভাজা একটা মুরগির পেটের মধ্যে সুগন্ধী মশলা আর ডিমের পুর। এককথায় লাজিজ্! জনশ্রুতি (সত্যিমিথ্যে যাচাই করবার সুযোগ নেই), দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সবিশেষ প্রিয় ছিল এই পদটি। ডিমের বদলে মুসল্লমের মধ্যে নাকি পুরে দেওয়া হত একটি মুরগিছানা। আলিয়ায় অবশ্য সেরকম কিছু হয় না। পাঠকদের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখি অসামান্য এই পদটিতে খাদ্যদ্রব্যের পরিমাণটি কিন্তু বিপুল। বেশিরভাগ মোগলাই আইটেমের মতো বেশ খানিকটা গুরুপাকও বটে। নেহাৎই ভীম, খালি, গামা বা বকরাক্ষসের ভাইভাতিজা না হলে অথবা দলে নিদেনপক্ষে তিন-চারজন না থাকলে একা আস্ত একটা মুর্গ মুসল্লম ট্রাই না করাই ভাল। এরপর পাঠকের ইচ্ছে।
আলিয়া থেকে বেরিয়ে উলটো ফুটে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ। রাস্তা টপকে ঢুকে পরুন চাঁদনি চকে। চাঁদনি অঞ্চলের একদম পিছনদিকে সাবির। যাকে জিজ্ঞেস করবেন দেখিয়ে দেবে। এতক্ষণ ধরে মোগলাই রান্নার গুরুপাকের কথাই বলছিলাম। আসুন এবার একটি সুপাচ্য কুইজিনের সন্ধান দিই। সাবিরের রেজালা। গুরুপাক খানা খেতে খেতে একঘেয়েমিতে ভোগা এবং যারপরনাই বিরক্ত বাদশা জাহাঙ্গির তার খাস বাবুর্চিকে একবার একটি সহজপাচ্য পদ বানাতে আদেশ দেন। যার নিটফল রেজালা। সামান্য ঘি, একচিলতে জাফরান, বাকি মশলা বলতে গোলমরিচ, এলাচ, দারচিনি, কাঁচালঙ্কা, শুকনো লঙ্কা (অল্প), শা-মরিচ, চারমগজ, তালমাকনা, পোস্ত, পেঁয়াজ, রসুন… কোটা, বাটা এবং গোটা। ঘিয়ে সাদা রঙের দইয়ের সুপের মধ্যে ভাসমান গোটা একটা শুকনো লঙ্কা আর মাথা উঁচিয়ে ভেসে থাকা গোল পেঁয়াজ। মাঝখানে তুলতুলে সোনালি মাংসখণ্ড। একটা নলির টুকরো ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলে তো কথাই নেই। বাকিটা জাদুবাস্তব! দু’রকম রেজালাই পাওয়া যায় সাবিরে। চিকেন এবং মাটন। তবে খেলতে হলে মাটনের ময়দানেই খেলা ভাল। মাটনের পাশে চিকেন রেজালা, যেন হিমালয়ের পাশে অযোধ্যা পাহাড়। অধিক মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। তবে কিছুদিন আগে আমার দুই খাদ্যরসিক লেখকবন্ধু শ্রীসত্যবান মিত্র ও উল্লাস মল্লিক, সাবিরে খেতে গিয়ে এবং ফিরে এসে বিস্তর অভিযোগ জানিয়েছিলেন। খাবারের মান নাকি ভীষণভাবে পড়তির দিকে। বহুদিন হল যাওয়া হয়নি ওদিকটায়। তবু নিজের চোখে অথবা চেখে না দেখে চূড়ান্ত মন্তব্য করা উচিত নয় কখনওই। কিন্তু বন্ধুদ্বয়ের কথায় ন্যূনতম সত্যতা বা সারবত্তা থাকলেও ব্যাপারটা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। একই সঙ্গে মর্মান্তিক।
চাঁদনি মার্কেট থেকে একটু দূরেই এলিট সিনেমার উলটোফুটে রাস্তার ওপর আমিনিয়া। আমিনিয়া মানে একটুকরো শৈশব। অনেক অনেক স্মৃতি। বাবা-মা’র সঙ্গে নিউমার্কেটে পুজোর বাজার সেরেই নেক্সট স্টেশন আমিনিয়া। পরতে পরতে খুলে যাওয়া লাচ্ছা পরটা আর ভুনা গোস্ত! দুধসাদা চিনেমাটির প্লেটে চারধারে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে থাকা সোনালি লালচে তেলের সীমারেখা। মাঝখানে চাপধরা জমাট মাংস। সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে লেবুর রসে জারিয়ে রাখা শশা-পেঁয়াজ-গাজর আর টম্যাটোর সালাদ। ভাবামাত্র এই এত বছর বাদেও নাকে সেই স্বর্গীয় সুবাসের ঝাপটা। জিহ্বায় তরল বন্যা। অহো!
সেই চিৎপুর থেকে ধর্মতলা। বলি অনেক তো হল এদিকটায়। চলুন এবার এ চত্বরের মায়া কাটিয়ে এগনো যাক। পকেট বুঝে ধরে ফেলুন ট্যাক্সি অথবা কর্পোরেশনের উলটোদিকে গ্র্যান্ট স্ট্রিট থেকে শেয়ারের অটো। নেমে পড়ুন পার্কস্ট্রিট-মল্লিকবাজারের মোড়ে। দু’পা এগিয়েই নিউ পার্কস্ট্রিটের ওপর সিরাজ। রসিকজনের মতে অওধি বিরিয়ানির সেরা ঠিকানা। জাফরান, গোলাপজল, ক্যাওড়া, জায়ফল-জয়িত্রি আর ঘিয়ের পাঁচমিশেলি বেহস্তের খুশবু। জুঁইফুলের মতো সাদা আর কাঁচাসোনা রঙের আধ আঙুল লম্বা সুগন্ধি বাসমতী চাল। পেল্লায় এক টুকরো নরম মাংস। সঙ্গে বড় একটা জাফরান রঙা আলুর টুকরো আর সেদ্ধ গোটা ডিম। চামচের বদলে হাতই ভাল। মুখে পড়ামাত্র—‘ইরশাদ, ইরশাদ!’
ইদানীং পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্টসের ওপর আরসালান বা ট্রামডিপোর গায়ে জিশান, সিরাজের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাগ বসালেও সিরাজ সিরাজই। বনেদিয়ানার ঠাটবাট নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে মল্লিকবাজারের মোড়ে, ঠিক সেই কবিতার মতো। ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে…।’
তবে রসিকজনেরা যতই সিরাজকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিন না কেন, এই অধমের মতে অওধি অর্থাৎ লখনওভি বিরিয়ানির সেরা ঠিকানা রহমানিয়া। কোনও চ্যালেঞ্জে যাব না। সিরাজ, জিশান, আরসালানের মতো নামীদামি রেস্তোরাঁর দাপটে অনেকটাই ব্রাত্য হয়ে গেছে প্রাচীন এই খাদ্যপ্রতিষ্ঠানটি। এ জে সি বোস রোডের ওপর সিরাজের লাগোয়া এই হোটেল। ‘ওমুক হোটেল তমুক রেস্তোরাঁয় খেয়ে এলুম’—ব্র্যান্ড কনশাসনেসের এই হ্যাঙওভারটা যদি কাটিয়ে উঠতে পারেন, তা হলে সাহস করে একদিন ঢুকেই পড়ুন রহমানিয়ায়। দুধারের দেয়ালে টাঙানো সচিত্র অওধি বিরিয়ানির ইতিহাস। দেখতে দেখতে বিরিয়ানির সঙ্গে অর্ডার করুন এদের বিখ্যাত মাটন কোর্মা। মুখে দিলেই প্রতিবেদকের দাবির সারবত্তা প্রমাণিত হবে। আর হ্যাঁ, শেষপাতে চেয়ে নিন ফিরনি। বাঙালি পায়েসের মোগলাইতুতো বোন। গুঁড়ো আধভাঙা চাল আর জমাট ক্ষীরের তৈরি গোলাপ জলের সুগন্ধ ডেজার্ট। প্রথমবার কাশ্মীর দর্শনের অভিজ্ঞতায় বিস্ময়স্তব্ধ সম্রাট জাহাঙ্গিরের ভাষায় বলে উঠতেই হবে ‘আগর ফিরদওস ওয়া রহি জমিনস্ত্/হামিনস্তু হামিনস্তু হামিনস্ত্’। স্বর্গ যদি কোথাও থাকে তা এখানেই, তা এখানেই!
