সংযোজন: এই দেখুন! এত লেখার ভিড়ে গড়পারে সুকিয়া স্ট্রিটের গায়ে শ্রীমানি বাজারের ভেতর এ ডি কেবিনের নামটাই করতে ভুলে গেছি বেমালুম। কলকাতা রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির আরেক উজ্জ্বল নাম। ততোধিক উজ্জ্বল এদের ফাউল কাটলেট আর মাটন স্টু। যারা খাননি, চেখে দেখার সুযোগ আর নেই! মাত্র বছর দুয়েক আগে এই অমৃত পদ বিপণি বন্ধ করে দিয়েছেন বৃদ্ধ কর্ণধার। পরবর্তী প্রজন্ম ব্যাবসা চালাতে রাজি না হওয়ায়। ভাবা যায়!
১০. মোগলাই কলকাতা
‘যব ছোড় চলে লক্ষ্নৌ নগরী…।’ ১৮৫৬ সাল। ব্রিটিশ সরকার বাহাদুর অন্যায়ভাবে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করলেন লখনউয়ের শেষ স্বাধীন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহকে। সাধের লখনউ ছেড়ে কলকাতায় চলে এলেন ভগ্নমনোরথ নবাব। শহরের দক্ষিণপ্রান্তে মেটিয়াবুরুজের ভূতঘাট, আজকের গার্ডেনরিচ অঞ্চলে, গঙ্গার ধারে হাজারখানেক একরের ওপর জমিতে গড়ে তুললেন বিশাল সুরম্য প্রাসাদ। সে এক মিনি লখনউ। আক্ষরিক অর্থেই। উপমাটা ব্যবহার করলাম কারণ নবাব তাঁর সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর বিশাল পরিবার, হাতিঘোড়া, অগুনতি বেগম-বাঁদী-হারেমসুন্দরী-তওয়াইফ (বাঈজী)—গাইয়ে-বাজিয়ে-লোকলস্কর-পাত্রমিত্র-অমাত্য-পরিষদ-মোসাহেব-কবি-নোকর-খানসামা-বাবুর্চি মায় একটা আস্ত চিড়িয়াখানা পর্যন্ত। নবাবের সঙ্গে সঙ্গে লখনউ ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন বহু আমির ব্যবসায়ী আর রহিস, জ্ঞানীগুণী মানুষজন। অচিরেই মেটিয়াবুরুজের বিস্তীর্ণ অঞ্চল-জুড়ে গজিয়ে উঠল আরেকটা ছোটখাটো লখনউ। কলকাতার নব্য বাবুসমাজের গণ্যমান্যদেরও নিয়মিত আনাগোনার পীঠস্থান হয়ে উঠল মেটিয়াবুরুজে নবাবের প্রাসাদ। নৃত্যগীত-শিল্পকলা-কবিতা-শেরশায়েরি, খানাপিনা, তহেজিব… সব মিলিয়ে নতুন এক মিশ্র সংস্কৃতির তত্কালীন ভরকেন্দ্রের নাম মেটিয়াবুরুজ।
আসলে নবাবের মেটিয়াবুরুজ তথা কলকাতায় আগমনের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে বড়লাটবাহাদুরের কাছে দরবার করা। প্রয়োজনে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিল অবধি যাওয়া। সেই উদ্দেশে নিজের মা, ভাই ও ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লন্ডনে। কিন্তু লাভের লাভ বলতে প্রায় কিছুই হল না। রাজমাতা আর ভাই প্রবাসেই দেহত্যাগ করলেন। হতাশ শাহজাদা। একা। নিঃসঙ্গ। ফিরে এলেন মেটিয়াবুরুজে, নবাবের কাছে।
‘খোয়াব থা যো কুছ ভি দেখা/যো শুনা আফসানা থা…’ (যা দেখেছি সবই স্বপ্ন/শুনেছি যা কিছু সবই গল্পকথা…)। ১৮৮৭। জীবনের শেষ শায়েরিটি লিখে বরাবরের মতো দুনিয়াদারি ছেড়ে চলে গেলেন ভগ্নমনোরথ মেটিয়াবুরুজের নবাব। অন্য কোনও শেরশায়েরির দেশে। নাচগানের আসর, শিল্প-কবিতা-সংস্কৃতি, জাঁকজমক, কোলাহলমুখর হর্ম্যপ্রাসাদ… সময়ের কালগ্রাসে অতীত হয়ে গেল। কেবল একটি জিনিস ছাড়া। নবাবি খানা। লখনউ ছেড়ে চলে আসার সময় নবাব তার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন শতাধিক পাচক বা বাবুর্চিকে। তাদের হাতের রান্না, এককথায় অমৃতসমান। কতরকম যে পদ তার ইয়ত্তা নেই। বিরিয়ানি, চাঁপ, কাবাব, কোফতা, কোর্মা, খুশকা পিলাও, জর্দা পিলাও, দালগোস্ত, ফিরনি… এক সে বাঢ় কর এক উমদা রন্ধনশিল্প সব। নবাব চলে গেলেন। রয়ে গেল নবাবি খানা। নবাবি রসুইখানা থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ল শহরের কোনায় কোনায়। ঢুকে পড়ল সাধারণের হেঁশেলে। তার মধ্যে জনপ্রিয়তায় একনম্বরে অবশ্যই বিরিয়ানি। ঘি-জাফরানস্নাত সুগন্ধী বাসমতী চাল আর মাংসের স্বর্গীয় দমপোক্ত কুইজিন। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল একমাত্র কলকাতাতেই বিরিয়ানিতে আলু এবং কোথাও কোথাও ডিম দেবার রেওয়াজ রয়েছে। সারা দেশে আর কোথাও এই নজির নেই। এরও একটা নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। আগেই বলেছি মেটিয়াবুরুজে নবাববাড়ির রান্না, মূলত বিরিয়ানি দ্রুত সাধারণের মধ্যে বিশেষভাবে মুসলমান এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্রশ্রেণির মানুষ। মাংস জোগাড় করে ওঠা সবসময় সম্ভব হত না সবার পক্ষে। ফলে মাংসের বিকল্প হিসেবে আলু এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডিম দেওয়ার প্রচলন হয়। পরবর্তীতে মাংস থাকলেও সঙ্গে আলু এবং ডিম দেওয়ার রেওয়াজটা কিন্তু রয়েই গিয়েছে কলকাতার বিরিয়ানি রন্ধনপ্রণালীতে।
এই মোগলাই রসনা সংস্কৃতির হাত ধরেই পরবর্তীতে কলকাতার বুকে গজিয়ে উঠতে থাকে একের পর এক মোগলাই খানার হোটেল। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং বনেদিয়ানায় সেরা চিৎপুর রোডের ‘রয়্যাল’। নাখোদা মসজিদের কাছে। মোগলাই কুইজিনের সেরা ঠিকানা। এদের রান্নার প্রতিটি পদই যাকে বলে সত্যিই রাজকীয়। নামের সঙ্গে সাজুয্য রেখেই। তবে সুকুমার রায়ের ভাষায় ‘কিন্তু সবার চাইতে সেরা’ অবশ্যই—চাঁপ। দোকানের মুখেই কাচাধারের আড়ালে বিশাল তাওয়ায় ভাজা হয়ে চলেছে সবসময়। তাওয়ার চারধারে চুপচুপে তেল-ঘি-মশলায় স্নানরত মাংসখণ্ড। থেকে থেকে রোগনের ছিটে। সঙ্গে সঙ্গে গর্বিত অভিমানে ফ্যাঁস করে উঠছে তাওয়ায়। রেয়াজি খাসির পাঁজরা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার করা হয় না আক্ষরিক অর্থেই ‘রয়্যাল’ এই চাঁপে। ধীরেসুস্থে প্রবেশ করুন দোকানে। গুছিয়ে বসুন টেবিলে। ‘ফরমাইয়ে সাহাব’। সামনে এসে দাঁড়াবেন পরিবেশনকারী। শ্বেতশুভ্র পোশাকের কাঁধে ততোধিক সাদা তোয়ালে। চিকেন আর মাটন—দু’ধরনের চাঁপই পাওয়া যায় এখানে। কোলস্টরেলের আতঙ্ক না থাকলে আপনি অর্ডার করুন মাটন চাঁপ। অনেকেই চাঁপের জুড়িদার হিসেবে বিরিয়ানি অথবা পরোটার কথা বলেন। প্রতিবেদকের পরামর্শ মানলে আপনার পছন্দ হোক নান। মানে নানরুটি। বাটার অথবা প্লেন। যে-কোনও একটা। একপাশটা ছিঁড়ে নিয়ে এক টুকরো ধোঁয়াওঠা চাঁপের সঙ্গে… মুখে পোরা মাত্র সমস্ত ইন্দ্রিয় জুড়ে রিনরিন করে ওঠা সুমনের গানের সেই লাইন—‘তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনও, বহু ব্যবহার করা কোনও উপমায়…।’
