গড়িয়াহাট এলাকায় দুটি মিষ্টির দোকানের কথাও এই প্রতিবেদনে না বললে বোধহয় অন্যায় হবে। ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের কাছে যাদব চন্দ্র দাস আর হিন্দুস্থান রোডের মোড়ে মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। যাদবের কড়াপাক আর মহাপ্রভুর আইসক্রিম সন্দেশ। বহুদিন হল ঢুঁ মারা হয়নি ওদিকটায়। তবে স্বাদ আজও জিভে লেগে রয়েছে।
ইদানীং গড়িয়াহাট, যাদবপুর, টালিগঞ্জ, গড়িয়া আর বেহালা অঞ্চলে বেশ কয়েকটা নতুন নামীদামি মিষ্টির দোকান হয়েছে। সুখ্যাতিও হচ্ছে প্রচুর। কারও নাম আলাদা করে করতে চাই না। তবে এদের প্রায় প্রত্যেকের মিষ্টিই চেখে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনবদ্য বা দুর্দান্ত কিছু মনে হয়নি। কিন্তু একটি দোকানের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হবে। স্রেফ তাদের দইয়ের জন্য। বেহালা ট্রামডিপোর উলটোদিকে ব্রাহ্মসমাজ রোডের মোড়ে পান্না সুইটস্। বহু নামীদামি দোকানের দই বাড়িতে এনে ফ্রিজে রেখে দেখেছি। দু’-তিন দিন বাদে কেটে নেওয়া জায়গাগুলোয় জল ছেড়ে যায়। স্বাদও যায় ফিকে হয়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম পান্না। এনে ফ্রিজে রেখে দিন। দু’-তিন দিন বাদেও জল কাটবে না এতটুকু। আর স্বাদেও অটুট। পান্নার দইয়ের বিশেষত্ব এখানেই।
দইয়ের কথা যখন উঠলই তখন ফের একবার মধ্য আর উত্তর কলকাতায় ফিরতেই হবে। কিছু করার নেই। মিঠাই। মধ্য আর দক্ষিণ কলকাতার একদম সীমান্ত ঘেঁষা এই মিষ্টান্ন বিপণি। পার্ক সার্কাস ট্রামডিপোর পরবর্তী স্টপেজ বেকবাগান মোড়ে। পাঁচ দশকের এই সুইট শপ আর তাদের তাক লাগিয়ে দেওয়া দই। যদিও একটু বেশি মিষ্টি তবুও স্বাদে গন্ধে অনন্য। দই ছাড়াও আরও অনেকরকম মিষ্টান্ন পদ বানিয়ে থাকেন এঁরা। তবে সিঙাড়া আর খাস্তা কচুরির কথাটা আলাদা করে বলতেই হবে। খাঁটি তেলে ভাজা, চুড়মুড়ে। সিঙাড়ার ভেতর আলুর পুরটা বোধহয় কলকাতার সেরা। এ রকমটা আর কোথাও খাইনি। বিশেষ করে শীতকালে পুরের মধ্যে ফুলকপি আর ভাজা চিনেবাদামের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় স্বাদটা যে সর্বোচ্চতায় ওঠে সেটা বলাই বাহুল্য। অতঃপর আসি মিহিদানার কথায়। আধভেজা রসে টইটুম্বুর তারামণ্ডল যেন। গায়ে জড়ানো খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের মসলিন। বর্ধমান, বর্ধমান তো অনেক করলেন। একদিন মিঠাইয়ের মিহিদানা টেস্ট করে দেখুন। কোনও অংশে খাটো পড়বে না, বাজি রেখে বলতে পারি।
শেয়ালদায় সত্যনারায়ণ সুইটস আর এদের দই। বহু বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে এদের কথা। অধিকাংশ বিখ্যাত মিষ্টির দোকানেই দইয়ের রঙটা লালচে ধরনের। ব্যতিক্রম সত্যনারায়ণ। এদের বৈশিষ্ট্য সাদা চিনিপাতা দই। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে পাওয়া যেত কলকাতার দোকানে দোকানে। সেই ঐতিহ্যকে আজও ধরে রেখেছে সত্যনারায়ণ। গাদাগুচ্ছের কিড়কিড়ে মিষ্টি নয়। বরং একটা অম্লমধুর ভাব। প্রিয় পাঠক, একবার হিমসাগরের সঙ্গে ল্যাংড়ার স্বাদের পার্থক্যটা কল্পনা করুন মনে মনে। ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে জলের মতো। টকমিষ্টি সাদা দই। জানি না আর কেউ এই বৈশিষ্ট্যটি বাঁচিয়ে রেখেছেন কি না আজও এ শহরে। জানতে পারলে অবশ্যই জানাবেন দয়া করে।
ফড়িয়াপুকুরে সেন মহাশয়ের গা ঘেঁষে অমৃত সুইটস। নলিন বা মাখনলালের মতো এর কথাও উল্লেখ করতে ভুলেই গিয়েছিলাম প্রথম পর্বে। নতুন করে এদের সম্পর্কে কিছু বলার নেই। শ্রবণ এবং জিহ্বার বিবাদভঞ্জন করতে একদিন পৌঁছে যান ফড়িয়াপুকুর। একটু বিকেল-বিকেলই যান। কারণ সন্ধের পর বেশিরভাগ সময়ই দোকানের একপাশে ছোট শেলেট ঝোলানো থাকে। তাতে চক দিয়ে লেখা— ‘দধি নাই।’ খাঁটি উত্কৃষ্ট দই আর অমৃত, দুটো নাম সমার্থক। অমৃতর দই অমৃতই। অন্য কোনও তুলনা বাতুলতা মাত্র।
এবার যে দোকানটির কথা বলে এই প্রতিবেদন পর্বে দাঁড়ি টানব তার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার সীমানাতেও দাঁড়িটা পড়ে যাবে অবশ্যম্ভাবীভাবেই। কারণ উলটোফুটে বহমান পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে। আর গঙ্গা টপকালেই হাওড়া। হ্যারিসন অধুনা মহাত্মা গাঁধী রোড ধরে সোজা এগিয়ে বড়বাজারের মোড়ে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। কলকাতায় একমাত্র নবকৃষ্ণ গুঁই আর গাঙ্গুরাম ছাড়া আর কোথাও এত ভাল রাধাবল্লভি পাওয়া যায় বলে আমার অন্তত জানা নেই। আপাদমস্তক খাঁটি ঘিয়ে ভাজা। দু’ আঙুলের চাপে তবকের চেয়েও পাতলা ওপরের আস্তরণটা ছিঁড়লেই কলাইয়ের ডাল আর ভাজা জিরে মৌরির মন পাগল করা সুবাস। মিষ্টি ছোলার ডাল (মাঝে মাঝে জিভে এসে আটকে যাওয়া ফুলোফুলো কিশমিশ) অথবা নিরামিষ আলুর তরকারি। দুটোর সঙ্গেই সমান যায়। তবে প্রতিবেদকের মতে ফটো-ফিনিশে ছোলার ডাল সামান্য হলেও এগিয়ে থাকবে। রাধাবল্লভির পাশাপাশি নিতেই হবে আট প্যাঁচের অমৃতি। আদরের নাম অমিত্তি (আহা!)। পাকা সোনার রং পিছলে যাচ্ছে শরীর জুড়ে। ওপরটা খাস্তা কুড়কুড়ে। ভেতরটা রসে টইটুম্বুর। শেষপাতে কাঁচা হলুদ রঙা কেশরভোগ। বলি রাজভোগ বা কমলাভোগ তো অনেক খেয়েছেন। একবার দেশবন্ধুর কেশরভোগটা খেয়ে দেখুন। তারপর এসে বলবেন।
আর কী? অনেক তো হল। এরপর আর এগোলে তো গঙ্গায় থুড়ি হাওড়ায় গিয়ে পড়তে হবে। শিবপুর, রামরাজাতলা… হাওড়ার পর হুগলি। রিষড়া, চন্দননগর, জনাই… বাঙালি মিষ্টির আদি জন্মভূমি… আর এক রূপকথার শুরু। সময় সুযোগ হলে শোনানো যাবে আরেকদিন। আজ এই পর্যন্তই।
