‘আপনজন’। আপামর চপ কাটলেট প্রিয় বাঙালির জন্য একটা দোকানের নাম, এর চেয়ে উপযুক্ত আর কিছুই হতে পারে না। কালীঘাট ট্রামডিপোর উলটোদিকে যে রাস্তাটা সোজা কালীঘাট মন্দিরের দিকে চলে গেছে সেটা ধরে সামান্য এগুলেই হাতের বাঁদিকে সদানন্দ রোড। দ্বিধা না করে ঢুকে পড়ুন। মিনিট তিনেকের রাস্তা। বাঁ ফুটে আপনজন। চপ কাটলেটের স্বর্গদ্বার! দুটো মানুষ পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে না এতটাই সরু এক ফালি দোকান। ফুটে দাঁড়িয়ে অথবা টুলে বসে খেতে হবে ফিশ ফ্রাই থেকে শুরু করে ডিমের ডেভিল, ফিশ ওরলে হয়ে চিকেন কাটলেট… আজকের ভাষায়—‘মাইন্ডব্লোইং’! মনে আছে প্রথম পর্বে কলেজ স্ট্রিটে দিলখুশা কেবিনের বিখ্যাত কবিরাজি কাটলেটের মান পড়ে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করেছিলাম। আপনজনে এলে আপনার সে আক্ষেপ মিটে যাবে। ওপরে ফুরফুরে ডিমের পরত। মধ্যে চাপ চাপ মাংস অথবা মাছের পুর। পিঁয়াজ-আদা-রসুনকুচি আর ঝিরঝিরে কাটা ধনেপাতার অ্যারোমা… লিখতে গিয়ে কলম থেমে যাচ্ছে। বিশ্বাস করুন। ফিশ, চিকেন অথবা মাটন কবিরাজী-আর একমুহূর্তও দেরি না করে অর্ডার করে ফেলুন এর মধ্যে যে-কোনও একটা। সস বা কাসুন্দিতে (কাসুন্দিই বেটার) চুবিয়ে পরপর দু’-তিনটে কামড়। দিলখুশার পুরনো সেই স্বাদ হুবহু পুনরুদ্ধার হবে, জোর দিয়ে বলতে পারি।
হালফিলে আপনজন তাদের আরেকটি শাখা খুলেছে ওই একই রাস্তার ওপর, তপন থিয়েটারের উলটোদিকে। ভিড় এড়াতে সেখানেও যেতে পারেন। খাবারের স্বাদ এবং মান একইরকম থাকবে এটা নিশ্চিত।
এই রে! কথায় কথায় ‘ক্যাফে’-র কথাটাই তো ভুলে মেরে দিয়েছি একেবারে। প্রতিবেদকের এই সামান্য অপরাধটুকু ক্ষমাঘেন্না করে দিয়ে পিছিয়েই না হয় গেলেন একটু। হাজরা মোড়ে যতীন দাস পার্কের উলটোদিকে ‘ক্যাফে’। মেট্রো স্টেশনের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকা ভেজ চপ, ফিশ কাটলেটের ‘গেরিলা জোন’। সঙ্গে একটু কড়া লিকারের দুধ-চা। আগে না হোক রসাস্বাদন করে বেরিয়ে আসার পর সাত খুন মাফ হয়ে যাবে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।
অতঃপর আমাদের ডেস্টিনেশন হোক তরুণ নিকেতন। রাসবিহারী মোড় থেকে গড়িয়াহাটের দিকে ঘুরে গিয়ে পুরো একটা স্টপেজও যেতে হবে না। হাতের বাঁদিকে পুরনো ভাতের হোটেল। প্রিমিয়াম আইটেম তেল-চিতল, চিতল মুইঠ্যা, কাতলার ঝোল আর জিরে ফোড়নের সামান্য পাতলা মুসুরির ডাল। চাইলে এবং থাকলে পেয়ে যাওয়া যেতে পারে সুগন্ধি কাগজি লেবুর ছোট একটা টুকরো (অন্যথায় পাতিলেবুতেই কাজ চালাতে হবে)। সঙ্গে ঝুরো ঝুরো আলুভাজা নইলে থকথকে পোস্তয় ডুবুডুবু আলুপোস্ত। ওপরে ছড়িয়ে যাওয়া কাঁচা সরষের তেলের হালকা ভাপ… নাঃ, বাকিটা আর বলা যাচ্ছে না। জিভ জুড়ে স্যালাইভার নিঃসরণ বলাকওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। অতএব নিজ জিহ্বায় পরীক্ষা প্রার্থনীয়। তবে একটা কথা এখানে জোর দিয়ে বলাই যেতে পারে যে সিদ্ধেশ্বরী, ইয়ং বেঙ্গল (খিদিরপুরের মোড়ে আরেক অসামান্য পাইস হোটেল) আর তরুণ নিকেতনের হাত ধরে অন্তত এই একটা ব্যাপারে উত্তরকে অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে মধ্য আর দক্ষিণ কলকাতা। আজ থেকে দশক তিনেক আগেও উত্তর কলকাতায় এরকম বেশ কয়েকটা পাইস হোটেল ছিল শোভাবাজার, গড়পার আর শেয়ালদা অঞ্চলে। যার মধ্যে অন্যতম শ্রীমানি বাজারে চণ্ডীর হোটেল বা শেয়ালদা স্টেশনের গায়ে হোটেল ব্যারন। ইদানীং এদের মধ্যে অনেকগুলিই উঠে গিয়েছে আর বাকিগুলোর মান এতটাই পড়ে গিয়েছে যে তাদের নিয়ে আর কিছু লেখার কোনও মানেই হয় না।
তরুণ নিকেতনের থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে লেক মার্কেট। দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম আদি বাজার। ইদানীং তার মাথার ওপর ধাঁ করে ঝাঁ চকচকে একটা মল চাপিয়ে দেওয়ার ফলে হাতিমি বা বকচ্ছপের মতো একটা বিটকেল কদর্য চেহারা নিয়েছে। কী আর করা। অগত্যা গতস্য শোচনা নাস্তি বলে ঢুকে পড়া যাক লেক মার্কেটের গায়ে লাগা রাস্তাটায়। জনক রোড। নামে রোড হলেও চওড়া একটা গলি ছাড়া আর কিছুই নয়। গলি ধরে হাত বিশেক এগিয়েই ডানফুটে রাধুবাবুর (মতান্তরে রাদুবাবু) দোকান। আপনজনের মতো না হলেও আকারে বেশ ছোটই। তবে সুবিধে একটাই। উলটোদিকের ফুটপাতটা বেশ চওড়া। দোকানের এক কোণে দাঁড়ান চুপটি করে। মনোযোগ সহকারে চোখ বুলিয়ে নিন দোকানের একপাশে টাঙানো মেনুবোর্ডে। হরেকরকম চপ কাটলেট আই ফ্রাইয়ের নাম লেখা রয়েছে। ফের একবার প্রতিবেদকের অ্যাডভাইস মানলে অর্ডার করুন চিকেন কাটলেট আর ঠিকঠাক লিকার-ফ্লেভারের চা। এদের বৈশিষ্ট্য। হাতে পাওয়া-মাত্র নিয়ে সেঁটে যান ওপারের ফুটপাতে। চা-টা অবশ্য পরেও অর্ডার করতে পারেন, কারণ প্রথম কাটলেটটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে প্রচণ্ড টানাপোড়েন শুরু হবে। দ্বিতীয়টা অর্ডার করবেন কি না। এতটাই অমোঘ এই কাটলেটের আকর্ষণ। সঙ্গে কাসুন্দিটা চেয়ে নিতে ভুলবেন না যেন। কলকাতার সব ক’টা চপ কাটলেটের দোকানের মধ্যে রাধুবাবুর কাসুন্দিটাই সেরা। কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা থেকেই কথাটা বলছি। বিশ্বাস করলে ঠকবেন না।
লেক মার্কেটের পরের স্টপেজ দেশপ্রিয় পার্ক। তাই বাসে-ট্রামে না চড়াই ভাল। পার্কের ঠিক উলটোদিকে সুতৃপ্তি। চোখে পড়ামাত্র বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস! বেশ কিছুদিন হল বন্ধ হয়ে গেছে। সুতৃপ্তি মানেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চাটুজ্জে, ঋত্বিক ঘটকদের ধুন্ধুমার আড্ডা… চা আর ফিশফ্রাই। ডিমের ব্যাটারে মাখামাখি, ওপরে ব্রেডক্রাম্বের মিহি মুচমুচে আস্তরণ। মাছখানে শুয়ে থাকা পিওর ভেটকির পুর। ধনেপাতা, জায়ফল, জয়িত্রি আর আদা-রসুন-পেঁয়াজ কুচির সেই নিওলিথ সুবাস… সব চলে গেল! চেখে দেখতে পারলেন না। তবু হেরে যাওয়া ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করুন এক মিনিট। বাঙালি হিসেবে লজ্জিত হন। আত্মগ্লানিতে ফালাফালা করুন নিজেকে। যে শহরে ভুজিয়াওয়ালা, ফিউশন ফুড সংস্কৃতি দাপিয়ে বেড়ায় আর সুতৃপ্তি বন্ধ হয়ে যায়। এ লজ্জা রাখার জায়গা কোথায়? দেশপ্রিয় পার্কের অদূরে গড়িয়াহাট অঞ্চলে এবং ধর্মতলায় সুতৃপ্তির মতোই আরও তিনটি রেস্তোরাঁ আছে অথবা ছিল। কাফে-ডি-মনিকো, স্যাঙ্গুভ্যালি এবং সাউথ পোল। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের আড্ডা, বাটার টোস্ট, ভেজিটেবল চপ আর চায়ের জন্য বিখ্যাত। ছিল বলছি কারণ এখনও আছে না কি জেট স্পিড সময়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে পাততাড়ি গুটিয়েছে খোঁজ নিয়ে দেখা হয়নি অনেকদিন। আপনারা চেষ্টা করলেও করতে পারেন।
