এবার সিদ্ধেশ্বরীর চরণ ছেড়ে ফের একবার ফিরে আসা যাক জওহরলাল নেহরু রোডের মোড়ে। হাতের বাঁদিকে দুটো বাড়ি পরেই বড় রাস্তার ওপর ঐতিহাসিক র্যালি সিং অ্যান্ড কোং। সংক্ষেপে ‘র্যালিজ’, ‘র্যালিজ’ মানেই এক ঝটকায় এক টুকরো ছেলেবেলা। অনেকখানি মধুর স্মৃতি। বাবার হাত ধরে মেট্রোয় সকাল সাড়ে ন’টার শো। জনি ওয়েসমুলারের ‘টারজান দ্য এপম্যান’, জুলি এন্ড্রুজের ‘মেরি পপিন্স’, ওয়াল্ট ডিজনির ‘ম্যাজিক বয়’…। শো ভাঙার পর অবশ্য গন্তব্য র্যালিজ। শরবত সম্রাট। রোজ, পাইন অ্যাপল, অরেঞ্জ, ম্যাঙ্গো কতরকম শরবত যে পাওয়া যায় শতাব্দীপ্রাচীন এই সুধারস বিপণিতে। সেই ছেলেবেলা থেকে আজও আমার পছন্দ রোজ। গোলাপের গন্ধ আপনার পছন্দ না হলে অর্ডার করুন অরেঞ্জ, পাইনাপল, যা হোক একটা কিছু। ওপরে ভাসমান বরফের ছোট ছোট চৌকো টুকরো। ছোট্ট একটা চুমুক। ঠোঁট হয়ে গলা বেয়ে নেমে যাওয়া সুগন্ধী তরল-রাশি। কলকাতার একচল্লিশ ডিগ্রি গরমেও গোটা শরীর জুড়ে মুসৌরি, কালিম্পং, দার্জিলিং। বাকিটা অবর্ণনীয়! কথাপ্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল, দোকান ছাড়াও ওদের শরবতের সবক’টা কনসেনট্রেট সিরাপও বিক্রি করে থাকে র্যালিজ। কিনে নিয়ে গিয়ে বরফঠান্ডা জলে বোতলের গায়ে লেখা পরিমাণমতো মিশিয়ে খেতে পারলেই শরবতের ম্যাজিক বাড়িতেও। শরবত ছাড়াও আরও একটি ব্যাপারে বিখ্যাত এরা। সেটা এদের চাট। আলু-পাপড়ি চাট, রাজকচুরি চাট, দহিবড়া চাট, মিক্সড চাট… গোটা একটা চাট সাম্রাজ্য যেন। সঙ্গে কুলচা-নান বা ছোলে-ভাটুরে। অতঃপর সেই অবধারিত প্রশ্ন। খেতে কীরকম? আর কত তুলনা টানব মশাই? উপমার ভাণ্ডার তো বাড়ন্ত প্রায়। অতএব নিজেই না হয় গিয়ে দেখে চেখে নেবেন একদিন। মাঝখানে সমগ্র র্যালিজপ্রেমীদের শোকসাগরে নিমজ্জিত করে বেশ কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল এই শতাব্দীপ্রাচীন সুধাবিপণি। আশার কথা আপামর প্রেমিকদের বিরহ ভেঙে সুকুমার রায়ের সেই পাগলা দাশুর মতোই ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া’। আমাদের এ শহরে। স্থান-কাল-পাত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই আর একটুও দেরি নয়। শুরু হয়ে যাক ‘অপারেশন র্যালিজ!’
এইবার। দক্ষিণীদের চূড়ান্ত বিরক্তি আর অধীর আগ্রহের অবসান ঘটিয়ে সত্যিসত্যিই পা রাখা খোদ দক্ষিণে। ভবানীপুর জগুবাজারের গা ঘেঁষা গলিটা ধরে হাত পঞ্চাশেক এগিয়ে খালসা স্কুলের ঠিক উলটোফুটে বলরাম মল্লিক অ্যান্ড রাধারমণ মল্লিক। সন্দেশ উইজার্ড! এদের অজস্র ধরনের সন্দেশ আর মিষ্টি নিয়ে কিছু বলার নেই মানে বলার থাকতে পারে না। এতটাই দেবভোগ্য। তবে আমার ফোকাস অন্য ধরনের দুটো ডেলিকেসির দিকে। এদের আমদই আর আতার পায়েস। জমাট লালচে দইয়ের ক্যামুফ্লেজে লুকিয়ে থাকা ঘন পাকা আমের রস। বাকিটা আর জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না। আমদইয়ের সুযোগ্য দোসর আতার পায়েস। ক্ষীরজমাট দুধের মধ্যে চোবানো তুলতুলে নরম আতার শাঁস। একবারটি জিভে ছোঁয়ালেই নন্টে ফন্টের সেই কেল্টুদার ভাষায় বলে উঠতেই হবে—‘উলস!’
মিষ্টি ছাড়াও আর একটি কারণে অনন্য এই মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। বছরে একবার দোকানপত্তর গুটিয়ে হপ্তাখানেকের জন্য তল্পিতল্পা বেঁধে সমস্ত কর্মচারীদের নিয়ে বেড়াতে যান দোকান মালিকরা। জানি না এই প্রথা আজও তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন কিনা। না হলে ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক।
জগুবাজারের পরের বাসস্টপ। আশুতোষ মুখার্জি রোডের ওপর পূর্ণ সিনেমা। মাল্টিপ্লেক্সের দাপটে বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন। ভাঙা জংধরা কোলাপসিপল গেট। ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলে অন্ধকার হল। ধুলোভর্তি মেঝে। ছেঁড়া কালচে পর্দা। ঘুণ লেগে পচে যাওয়া কাঠের দর্শকাসন। প্রজেক্টর হোলে পুরু মাকড়সার জাল। এখানেই মেজমামার হাত ধরে ‘টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’, ‘বর্ন ফ্রি…’ জায়গায় জায়গায় ইটের দাঁত বেরিয়ে পড়া দেয়াল ফুঁড়ে মাথা তুলেছে বট-অশত্থের চারা। জরাজীর্ণ অবস্থা। কোথায় গেলেন কর্মচারীরা? ভাবলেই বুকের মধ্যে কীরকম একটা করতে থাকে। অদূরেই বনফুল। পুরনো কলকাতার রেস্তোরাঁ কালচারের অন্যতম প্রতিনিধি। বনফুল মানেই অদৃশ্য কোনও টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যাওয়া অনেকটা সময়। বনফুল মানে উত্তমকুমারের প্রিয় ব্রেস্ট কাটলেট। বনফুল মানেই পাশে রূপচাঁদ মুখার্জি লেন। মামাবাড়ির পুরনো পাড়া। দিদিমার আমূল কৌটোর ব্যাঙ্ক খুঁচিয়ে বের করে আনা পাঁচ নয়া, দশ নয়া, সিকি… এক ছুটে রাস্তায়। তারপর বনফুল। স্বপ্নের ব্রেস্ট কাটলেট! আর এখন। করুণ অবস্থা। পুরনো রঙ চটে যাওয়া টেবিল চেয়ার। ধুলোপড়া টিউব লাইট। অযত্ন আর অসচ্ছলতার ছাপ চারদিকে। সময়ের কাছে হেরে গিয়ে সস্তার রোল আর চাউমিন বেচে টিকে আছে টিমটিম করে। বড় মন খারাপ করা সময়। এক ঢোঁকে দুঃখটাকে গিলে ফেলে চলুন আরেকটু সামনে এগোনো যাক। বিজলী সিনেমার উলটোফুটে শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সংক্ষেপে শ্রীহরি। ঘিয়ে ভাজা লুচি, হিংয়ের কচুরি, সঙ্গে ছোলার মিষ্টি ডাল আর আলুকুমড়োর তরকারি। এই দুই পদের জন্য নাম কলকাতাজোড়া। আর অবশ্যই ল্যাংচা। বিঘতখানেক লম্বা। লালচে বাদামি খোসার নীচে মধুর মোলায়েম ছানার আবাসভূমি। সারা গায়ে ভুরভুরে ঘিয়ের গন্ধ। চুপচুপে রসের আধার। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে পরবর্তী রসনার ঠিকানা সন্ধানে বেরোনোর আগে ধ্যানস্থ হয়ে দোকানের বেঞ্চিতেই বসে থাকুন দু’-চার মিনিট। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করুন অসম্ভব এই ভালোলাগাটুকুকে।
