দক্ষিণপন্থী পাঠকরা নিশ্চয়ই রেগেখেপে কাঁই হয়ে গেছেন এতক্ষণে। একটু আসছি বলে সেই যে নর্থের দিকে গেল লোকটা, ফেরবার নামটি নেই। তাই আর একটুও দেরি না করে বাস বা ট্যাক্সি যা হোক একটা কিছু ধরে সোজা এসে পৌঁছনো যাক ধর্মতলার মোড়ে। একদম মোড়ের মাথায় কে সি দাস। মনে আছে ‘খাইবার পাস’ প্রথম পর্বের প্রতিবেদনটা শুরু করেছিলাম এখান থেকেই। তাই এখান থেকেই শুরু হোক দ্বিতীয় পর্বের খাদ্য পরিযায়। কে সি দাসের গা ঘেঁষে সিধুকানু ডহর ধরে খানিকটা এগিয়েই হাতের ডানদিকে ডেকার্স লেন। চিত্তদার দোকান। বাটার টোস্ট আর ঘুগনি। ওপরে পিঁয়াজকুচি আর বিটনুনের হালকা ছিটে। না খুব পাতলা, না খুব ঘন। একদম ঠিকঠাক। স্বাদে ফাটাফাটি। এর পাশাপাশি এদের স্টু। তিন রকম চিকেন-মাটন-ভেজিটেবল। সঙ্গে আলু-পেঁপে-গাজরের টুকরো। ফ্রেশ ক্রিম, মাখন আর কারি পাউডারের মিশেলে সে এক রূপকথা কুইজিন। সঙ্গে চা। শেষপাতে। দুধ-লিকার-ফ্লেভার, একদম সঠিক পরিমাণে। যেদিনই যান না কেন সেই একই রকম স্বাদগন্ধ। প্রত্যেকদিন, প্রত্যেকবার কীভাবে এই একইরকম মান ধরে রাখা যায় সেটা আজও বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা এল-ডোরাডোর মতোই এক অপার রহস্য আমার কাছে।
চিত্তদার দোকানকে পিছনে ফেলে আবার ফিরে আসা যাক ধর্মতলার মোড়ে। জওহরলাল নেহরু রোড ধরে মেট্রো আর হোয়াইটওয়ে লেডল বিল্ডিং টপকেই এস এন ব্যানার্জি রোডের মোড়ে অনাদি কেবিন। কলকাতার আর এক কুইজিন ল্যান্ডমার্ক। বিখ্যাত মোগলাই পরোটার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এ দোকানেই। নামে মোগলাই হলেও মোগলাই রান্নার সঙ্গে সাতকুলেও কোনও সম্পর্ক নেই। মোলায়েম খাস্তা পরোটার মধ্যে দেশি হাঁসের ডিম আর মশলায় জারানো মাংসের কিমার পুর। সঙ্গে আলুর তরকারি আর ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ-বিট-গাজরের স্যালাড। ওপরে সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে নিন। কাঁটাচামচে কেটে স্যস মাখিয়ে এক টুকরো মুখে পুরুন। মুহূর্তে গোটা ব্যাপারটা জমে ক্ষীর একেবারে। তবে একটু বেশি গুরুপাক। একবারে একজনের পক্ষে একটার বেশি ট্রাই না করাই উচিত। প্রয়োজনে বাড়ি ফিরে রাতের মিলটা অফ করে দিলেও দিতে পারেন।
অনাদি থেকে বেরিয়ে এস এন ব্যানার্জি ধরে একটু এগোতেই রিগ্যাল সিনেমা। দেয়ালে ‘চামেলি কি জওয়ানি’ বা ‘হওয়াসি আত্মা’ টাইপের সিনেমার রগরগে পোস্টার। হলের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সস্তার দেহপসারিনি। মুখে সস্তা প্রসাধন। জ্যালজ্যালে চকমকি শাড়ি। ওসবে নজর না দিয়ে চোখ ঘোরান উলটোফুটে। জোড়া কচুরির দোকান। সামনের কাচের শোকেসে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। ওপরে বড় স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে গুলাবজামুন। তবে এদের আসল প্রসিদ্ধি বিখ্যাত হিংয়ের কচুরির জন্য। ফুলকো পেটের মাঝখানটা আঙুলে টিপে সামান্য ফাটিয়ে দিলেই নিভু নিভু ভলক্যানোর মতো বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার ভাপ। হিং, বিউলির ডাল আর ভাজা মৌরির মাতমাত গন্ধ। নাকে ঢুকলেই এক মাসের খিদে একেবারে পেয়ে যাবে। তবে সেরা আকর্ষণটি অবশ্য আলুর তরকারির পাশে দেওয়া একটুখানি কাঁচালঙ্কার আচার। অকল্পনীয় স্বাদ! কিন্তু কী কী মশলা মেশানো হয় আচারে, হাজার চেষ্টা করেও সেটা ধরা যাবে না কিছুতেই। জিজ্ঞেস করলেও উত্তর পাওয়া যাবে না, কারণ সেটাই এদের কারবারের টপ সিক্রেট। অনেকটা চেরোনোবিল বা ম্যানহাটান নিউক্লিয়ার প্রোজেক্টের মতো। এই অধম প্রতিবেদকের অর্ধাঙ্গিনী, যিনি কিনা অন্যের রেসিপি হাতিয়ে নেবার ব্যাপারে ইতিমধ্যেই পূর্বেকার সমস্ত ক্রাইম ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন, সেই তিনিও বহুবার চেষ্টা করেও এই সিক্রেট ফর্মুলাটি এদের কাছ থেকে হস্তগত করতে পারেননি। অবশেষে ‘উনিশটি বার ম্যাট্রিকে সে…’ মনোভাবাপন্ন হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এ হতাশা রাখার জায়গা কোথায়?
কচুরি পর্ব তো মিটল। কাউন্টারে বিল মিটিয়ে মৌরি চিবুতে চিবুতে ফুটপাতে নামুন। এলিট সিনেমা আর নিউ মার্কেট থানাটা পেরিয়ে সামান্য এগোলেই জানবাজারের মোড়টা যেখানে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে বাঁক নিয়েছে, সুপুরিপট্টি, সার সার মুদিখানা আর পাখির খাবারের দোকানের গা ঘেঁষে রানি রাসমণির বাড়ির ঠিক পিছনদিকে ছোট একফালি দরজার ওপর সাইনবোর্ডে লেখা—‘সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম।’ নাম পড়ে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই। নেহাতই ভাতের হোটেল। গলিতে ঢুকে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতেই সে এক এলাহি কাণ্ড। বিরাট এক যজ্ঞিবাড়ি যেন। সামনে টাঙানো লম্বা বোর্ডে চকের টুকরোয় লেখা— ‘আজকের মেনু’। অন্তত তিরিশ বত্রিশটা পদের নাম পরপর সাজানো। দু’পাশে তিন তিনখানা ঘর। সার সার লম্বা টেবিল আর চেয়ার অথবা বেঞ্চি। মাথার ওপর ঘুরন্ত ডিসি ফ্যান। প্রচুর মানুষ বসে খাচ্ছেন। ঢুকেই জায়গা পাওয়ার আশা না করাই ভাল। হয়তো একটু অপেক্ষা করতে হতে পারে। জায়গা খালি হওয়ামাত্র পরিবেশকরাই ডেকে আদর করে বসিয়ে দেবেন আপনাকে। ঝকঝকে পরিষ্কার থালার ওপর বেছানো কলাপাতা (চার্জ এক্সট্রা)। পাশে লেবুর টুকরো, এক চিমটে নুন। চারাপোনা, কাটাপোনা, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি, পাবদা, পমফ্রেট, পারসে, তোপসে, ইলিশ (সিজনে), খাসির মাংস (রেয়াজি এবং কচি) সহ নিরামিষের একাধিক সুপারলেটিভ পদের অসামান্য আয়োজন এখানে। অ্যালার্জি না থাকলে আপনি অর্ডার করুন গলদার মালাইকারি, কাতলার কালিয়া, ভাপা ইলিশ, সঙ্গে সোনামুগের ডাল, সুতোর মতো ঝুরিঝুরি আলুভাজা আর মুড়িঘণ্ট। শেষপাতে আদা আর জিরের ফোড়ন দেওয়া অলৌকিক টম্যাটোর চাটনি। গরমকাল হলে টম্যাটোর বদলে লম্বা ফালি করে কাটা কাটা কাঁচা আম। অলৌকিকত্ব আর এক অন্য মাত্রা পাবে। এক কথায় এদের প্রতিটি পদই যাকে ইংরেজিতে বলে— ‘এক্সক্লুসিভ, মাউথ ওয়াটারিং অ্যান্ড হেভেনলি!’ এসি নেই, গদি আঁটা চেয়ার টেবিল নেই। নেই ফিউশন বা এক্সপেরিমেন্টের লোকদেখানো কায়দাবাজি। সো-কলড কাম অ্যান্ড কুল অ্যাম্বিয়েন্সের প্রশ্নই ওঠে না। আর দাম? অবিশ্বাস্য রকম সস্তা! তবু স্রেফ জাদুমাখা রান্নার গুণেই ইদানীং ব্যাঙের ছাতার মতো শহরে গজিয়ে ওঠা সবকটা ‘বেঙ্গলি কুইজিন’-এর হোটেল রেস্তোরাঁকে গুনে গুনে দশ গোল দেবে সিদ্ধেশ্বরী। গরমকালে যদি যান তা হলে আপনার শেষপাতে পৌঁছে যাবে আম। পরিপাটি করে তিনফালি মেরে কাটা। পাকা ল্যাংড়া কিংবা হিমসাগর। বর্ষার গোড়ায় ফজলি। অবশ্যই আপনি যদি চান। খাওয়া শেষে উঠে হাতমুখ ধুয়ে ঘুরতেই সিঁড়ির গোড়ায় দুটো টেবিল। নাকের ডগায় চশমা, দুই ক্যাশিয়ারবাবু, বসে রয়েছেন গম্ভীরমুখে। টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র এসে হাজির পরিবেশনকারী। ব্রাহ্মী, হিব্রু, ল্যাটিন বা টোটো ভাষার চেয়েও দুর্বোধ্য কোনও ভাষায় ঝড়ের গতিতে বলে চলেছেন কিছু। ক্যাশিয়ারবাবু কিন্তু ঠিক বুঝে নিচ্ছেন আর খসখস করে লিখে চলেছেন ছোট ছোট কাগজে। কাস্টমার ঠিক যা যা খেয়েছেন হুবহু লিখে নিয়ে বিল ধরিয়ে দিচ্ছেন হাতে হাতে। জাদুবাস্তব এক দৃশ্যের অবতারণা চোখের সামনে। মোবাইলে তুলে নিয়ে ইউটিউব বা হোয়াটসআপে ছড়িয়ে দিন। ভাইরাল হয়ে যাবে বাজি রেখে বলতে পারি।
