এবার বলি, এই পরিযায়ের শেষে উপরি পাওনা বা ফাউ হিসেবে কী কী পাবেন। দেখে নিতে পারবেন বাগবাজার, কুমোরটুলি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, বিবেকানন্দ স্পোর্টিং, চালতাবাগান (লোহাপট্টি), শোভাবাজার রাজবাড়ির অসাধারণ সব পুজো। দিনের বেলাতেই। কারণ নাম কামানোর জন্য এদের আলোকসজ্জা বা থিমের প্রয়োজন হয় না। আর একটু বেশি উত্সাহী হলে মেন রোড ছেড়ে ঢুকে পড়তে পারেন গলিঘুঁজিগুলোতে, যেখানে ঊনবিংশ শতাব্দী এখনও থম মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাবু সভ্যতার আমলের বিশালাকৃতি ভগ্নপ্রায় প্রাসাদে, বিলুপ্তপ্রায় গাড়িবারান্দা—পায়রার ব্যোম-রকের আড্ডায়। বেঁচে রয়েছে নোনাধরা ইটের দেয়ালে, গঙ্গার জল আর কুচো চিংড়ি বয়ে নিয়ে আসা চৌবাচ্চার কলে, ছোট ছোট অজস্র তেলেভাজা-ফুলুরি-মালপোয়া-গুঁজিয়ার দোকানে, সন্ধেবেলা শাঁখের আওয়াজ আর বেলফুলওয়ালার ডাকে। বানিয়া আগ্রাসন, মল, মাল্টিপ্লেক্স, স্কাইস্ক্র্যাপার, সুপার মার্কেট, হাইরাইজের যৌথ অভিযান এদের ঘাড়ে ক্রমাগত দাঁত বসালেও একেবারে নিকেশ করে ফেলতে পারেনি। এখনও। তাই দেখে নিন, চেখে নিন এইসব প্রায় ডাইনোসর হয়ে যাওয়া উৎকর্ষতাকে। এই পুজোতেই। সময় থাকতে থাকতে। পরে পরে করলে দেরি হয়ে যেতে পারে।
এই লেখা যখন শেষ হল তখনই খবর পেলাম বাগবাজারে কে সি দাশের দোকানটা উঠে গেছে। হৃদয়বিদারক সন্দেহ নেই। কী আর করা যাবে। ধর্মতলার মোড়ের দোকানটি থেকে শুরু হোক আপনাদের মুসাফির-খানা। দ্বিতীয় তথ্য: প্যারামাউন্ট আজকাল বারোমাসই খোলা থাকে।
০৯. কলিকাতা খাইবার পাস-২
‘কলিকাতা খাইবার পাস’—আমার এই প্রতিবেদনটি পড়ে পাঠকদের অনেকেই আমার কাছে অভিযোগ করেছিলেন—“এ তো আপনার ভয়ংকর একচোখোমি মশাই। গোটা লেখায় আপনি নর্থের খাবারকে প্রশংসায় প্রশংসায় একেবারে ভরিয়ে দিলেন অথচ সাউথের ধারপাশও মারালেন না। দক্ষিণ কলকাতা কি এতটাই এলেবেলে? নাকি সেখানে কোনও খাবারের দোকানই নেই। সেইসব পাঠকদের অভিযোগ কাম ভর্ৎসনার কথা মাথায় রেখেই ফের একবার কলম ধরা। তবে দক্ষিণে পা বাড়ানোর আগে আমাকে একবার ফিরতেই হবে উত্তরে। প্রায়শ্চিত্তের জন্য। প্রায়শ্চিত্তই বলব কারণ আগের প্রতিবেদনে উত্তরের কিংবদন্তী কয়েকটি খাদ্য বিপণির কথা উল্লেখ করতে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। ফলত সেই প্রায়শ্চিত্তের টানেই উত্তরে ফেরা। হে দক্ষিণী পাঠকবৃন্দ, কুপিত হবেন না। একটা ছোট্ট ঢুঁ মেরেই ফিরে আসব। দেরি করব না মোটে। কথা দিচ্ছি।
লালবাজার থেকে চিৎপুর রোড অধুনা রবীন্দ্র সরণি ধরে উত্তরমুখো এগোলে নতুন বাজারে গায়ে লাগা দুটো মিষ্টির দোকান। নলিনচন্দ্র দাস আর মাখনলাল দাস। প্রথমে নলিনচন্দ্রকে দিয়েই শুরু করি। সারাজীবন তো নকুড়ের মনোহরার কথাই শুনে এসছেন। বলি নলিনের মনোহরা চেখে দেখেছেন কখনও? ওপরে চিনি অথবা নলেন গুড়ের ফুরফুরে পলকা বর্ম। হালকা কামড় বসালেই মুখের মধ্যে ভেঙে চৌচির। ভেতরে মিহি ঝুরঝুরে পেটাছানার পুর। এককথায় স্বর্গীয়! নকুড় না নলিন? পেলে না মারাদোনার মতো একটা চিরন্তন তর্কে পড়ে যাবেন নিজের মধ্যেই। তাই আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। নলিনের একমাত্র পরিচয় তার মিষ্টি। বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাওয়া এই গ্লোবালাইজড সময়েও নিজেদের জন্য একটি লাইনও খরচ করবার প্রয়োজন নেই শতক পেরোনো এই প্রতিষ্ঠানটির।
নলিনের পাশেই মাখনলাল দাস। আরেক মিষ্টান্ন মহীরুহ। সুইট উইজার্ড! পুরনো ঘরানার কাঠের শোকেস। কাঠের আঁচের উনুনে বানানো হচ্ছে মিষ্টি। খোলা ভিয়েন। ক্রেতার চোখের সামনেই। নকুড় বা নলিনের মতো এদেরও কোনও লুকোছাপা, রাখঢাক নেই। এদের বিশেষত্ব হল ক্রেতার চাহিদা বা পছন্দ অনুযায়ী টাটকা মিষ্টি বানিয়ে হাতে হাতে তুলে দেওয়া। কীরকম খেতে? সেটা যে না চেখেছে তাকে বেকার বুঝিয়ে কোনও লাভ নেই। পুরীর সমুদ্র, মাউন্ট এভারেস্ট বা অ্যামাজোন রেইন ফরেস্টের মতো গিয়ে দেখতে থুড়ি চাখতে হবে। তবেই মালুম হবে ব্যাপারটা। তবে বেশি রাত করে না যাওয়াই ভাল। এই দুটো দোকানেই বেশিরভাগ পদ সন্ধের পরে নিঃশেষ হয়ে যায় প্রায়ই। বিলম্বে হতাশ হতে হবে। তাই শুভস্য শীঘ্রম!
নলিন-মাখন পালা শেষ করে সামান্য এগিয়ে কোম্পানি বাগানের (রবীন্দ্রকানন) মুখ থেকে অটো ধরে হেদোর মোড়। এক স্টপেজ হেঁটে হাতিবাগান বাজার। বাজারের গায়েই গদার কচুরি। নামটিই যথেষ্ট। অধিক পরিচিতি নিষ্প্রয়োজন। হিংয়ের কচুরি। সঙ্গে আলুকুমড়োর ঘ্যাঁট। হালকা পাঁচফোড়নের গন্ধটা মনের (নাকি জিভের) মণিকোঠায় গেড়ে বসে যাবে আজীবন। হলফ করে বলতে পারি। গদার গদাঘাতে আক্রান্ত হবার পর কালক্ষেপ না করে সোজা বাগবাজার বাটার মোড়। এতটুকু তো পথ। হেঁটেই মেরে দিন। হজমে সাহায্য হবে। বাটার ঠিক উলটোফুট থেকে বাগবাজার স্ট্রিট ধরে হেঁটে সেই গিরিশ মঞ্চ অবধি রাস্তার দু’ধারে সব মিলিয়ে কমপক্ষে গোটা দশ বারো তেলেভাজার দোকান। জিভে জল আনা স্বাদেগন্ধে এরা সবাই যাকে সেই হিন্দিতে বলে—‘এক সে বঢ় কর এক’। কারও নাম আলাদা করে বলা যাবে না। আলুর চপ, মোচার চপ, ফুলুরি, কাশ্মীরি চপ, বেগুনি, ক্যাপসিকামের চপ, ধোঁকা, ছান্তাবড়া, পলতাবড়া, ভেজিটেবল চপ, ন্যাজ উঁচিয়ে থাকা চিংড়ির চপ, লঙ্কাবড়া, ডালবড়া… কতরকম তেলেভাজা যে ভাজা হয় এসব দোকানে তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিবেদকের পরামর্শ একটু বিকেলের দিকে যান। পারলে বসন্তকালে। প্রায় সবক’টা দোকানেই মুড়ি পাওয়া যায়। বেশি নেবেন না। জনপ্রতি মাত্র দু’ টাকা। আর তেলেভাজা? একজন হলে গোটা চারেক। দোকা থাকলে আটটা। কোনটা নেবেন অথবা খাবেন? রাইট অফ চয়েস সম্পূর্ণভাবে আপনার। মুড়ি, তেলেভাজা আলাদা আলাদা ঠোঙায় নেবেন। ওপরে সামান্য বিটনুন আর গোটা মশলার ছিটে, ঝালে আপত্তি না থাকলে সঙ্গে একটা কাঁচা লঙ্কা। কিনেই হড়বড় করে খেতে শুরু করবেন না। প্রতিবেদকের গাইডলাইন মেনে চলুন। দু’-দশ কদম এগিয়েই সামনে গঙ্গার ঘাট। দুলকি চালে গিয়ে বসুন ঘাটলার সিঁড়িতে। ফুরফুরে গঙ্গার হাওয়া। সিঁড়িতে ধাক্কা মারা ছোট ছোট ঢেউয়ের ছলাত্ছল। মাঝ গঙ্গায় দুলতে থাকা মেছো নৌকো। পাশে রেললাইন ধরে ভোঁ বাজিয়ে চলে যাওয়া চক্ররেল। অন্ধকার নেমে আসা ঘাটে সন্ধ্যারতি… মুখে ফেলে দেওয়া একমুঠো মুড়ি। কামড় বসানো ধোঁয়া ওঠা পাইপিং হট তেলেভাজায়… পুরনো গঙ্গা আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হবে ঘোর লেগে যাওয়া চোখে। গ্যারান্টি।
