এবার আমরা বিচিত্র খাদ্য-সরণির প্রায় শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি আর চারটি ‘লেজেন্ডারি ফুড শপ’-এর কথা বলেই দাঁড়ি টানব। নবকৃষ্ণ গুঁই, ভীমনাগ, পুঁটিরাম আর কালিকা। শেষ থেকেই শুরু করি, প্যারামাউন্ট থেকে বেরিয়েই মির্জাপুর স্ট্রিটের উপর লম্বা একফালি দোকান। এককোণে বিশাল কড়াইয়ে ক্রমাগত ভাজা হয়ে চলেছে আলুর চপ, পেঁয়াজি, মোচার চপ, ধোঁকা, ডিমের ডেভিল, মাটন চপ মায় ফিশ ফ্রাই। তবে যে জিনিসটির জন্য এদের খ্যাতি কলকাতা থুড়ি জগত্জোড়া তা হল বেগুনি। প্রায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতের পাঞ্জার সাইজ! তেলালো শরীরে পোস্তর ছিটে। বিটনুন ছিটিয়ে একটা কামড় (অবশ্যই গরমটা সইয়ে নিয়ে)। ব্যস! স্বর্গের আগের স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। এরপর চলে আসি পুঁটিরামে। এদের সব প্রিপারেশনই অসামান্য তবে খাস্তা নিমকিটা একবার খেয়ে দেখা অবশ্য কর্তব্য। বাড়ির বাচ্চাদের প্র্যাকটিস করান। নামী কোম্পানির পোট্যাটো চিপ্স ফেলে খাবে। কেসি দাশের স্পঞ্জ রসগোল্লাকে অনেকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দেন। আমি এগিয়ে রাখব পুঁটিরামকে। বউবাজারের ভীম নাগকে নিয়ে এত কথা লেখালেখি হয়েছে যে, এদের জলভরা বা অন্যান্য মিষ্টি নিয়ে কথা বাড়ানো বেকার। শুধু দু’টি তথ্য দিয়ে রাখি যে, এদের দোকানের মিষ্টি বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখুজ্জের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে রোজ ভবানীপুরের বাড়িতে ফেরার পথে চ্যাঙাড়ি ভর্তি মিষ্টি কিনে জুড়িগাড়িতে বসে খেতে খেতে যেতেন। ওঁর নামে তো ভীম নাগ কর্তৃপক্ষ একটা মিষ্টির নামই রেখেছিলেন ‘আশুভোগ’। দু’নম্বর তথ্য— এদেরই আবিষ্কার লেডিকেনি। বড়লাট পত্নী ‘লেডি ক্যানিং’-এর নামে, পরবর্তীতে মানুষের মুখে মুখে পালটাতে পালটাতে অপভ্রংশ রূপ ধারণ করে লেডিকেনিতে পরিণত হয়েছে।
ভীমনাগের ঠিক পাশেই নবকৃষ্ণ গুঁই। তবে আদি দোকানটি উল্টোফুটে কয়েক পা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে হিদারাম ব্যানার্জি লেনে, গলির মধ্যে। নবকৃষ্ণের অতুলনীয় সৃষ্টি রাম বোঁদে। উপরটা শুকনো কুড়কুড়ে, ভিতরটা রসে টইটুম্বুর। একেকটার সাইজ মার্বেল গুলির মতো। একবার দাঁতে চাপলেই লাল-হলুদ ম্যাজিক। এর আরেকটি মহান সৃষ্টির কথা বলেই খাদ্যতীর্থ ভ্রমণ শেষ করব— ভিক্টোরিয়া সন্দেশ, সত্যিমিথ্যে জানি না, তবে লোকমুখে কথিত যে, মহারানি ভিক্টোরিয়া যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন, তাঁর সম্মানে এই মিষ্টির নামকরণ হয়। খেতে কেমন এটা বর্ণনা করার মতো কলমের জোর অথবা ধৃষ্টতা, কোনওটাই আমার নেই। শুধুমাত্র এটুকু বলতে পারি আজ অবধি যত ধরনের মিষ্টি খেয়েছি তার মধ্যে সেরার সেরা এটি।
তা হলে, খাদ্য পরিযায়ী থুড়ি রসনা পরিযায়ীদের পরিব্রাজন তো শেষ হল। এবার পথপ্রদর্শক-ছড়িদার-গাইডের তরফ থেকে কিছু টিপস যা আপনার এই পরিযায়কে আরও সুপরিকল্পিত, আনন্দময় এবং সহনীয় করে তুলবে।
টিপসগুলি এই প্রকার
• কখনওই একদিনে পুরো রুটটা কভার করার চেষ্টা করবেন না। পেট-পা গোটা শরীর কোনওটাই ধকল নিতে পারবে না। তার চেয়ে বরং সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিনে গড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টার একেকটা স্পেলে গোটা ট্যুরটাকে ভেঙে দিন।
• উত্তর না দক্ষিণ—আপনি কোনদিকে থাকেন তার উপর নির্ভর করবে রুট এবং টাইম প্ল্যান, কাকে অগ্রাধিকার দেবেন এই পর্বে।
• পুরো ট্যুরটাকে দিনে দিনে সেরে ফেলার চেষ্টা করুন। সেরা সময় দুপুর বারোটা থেকে বিকেল পাঁচটা।
• কোনটার পরে কোনটা খাবেন রুট-প্ল্যানের উপর চোখ বুলিয়ে আগে থেকে ঠিক করে নিন।
• প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার অর্ডার দিয়ে ফেললে ঘাবড়াবেন না। অতিরিক্ত খাবার প্যাক করে দিতে বলুন অথবা সঙ্গে রাখুন ক্যাসারোল। রাতে বন্ধুদের আড্ডায়, সুরাসঙ্গমে—অতিথি আপ্যায়নে জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। শুধু মাইক্রোয় গরম করে নেওয়ার ওয়াস্তা। দুঃখের ব্যাপার, শরবতের ক্ষেত্রে এই ছকটা কাজ করবে না।
• প্রতিটি দলে অন্তত দশ-বারোজন খাদ্য পরিযায়ী থাকলে ভাল হয়। প্রয়োজন এবং চাহিদা অনুযায়ী ভাগ যোগ করে খাওয়া যাবে।
• পুজোর সময় বলেই বলছি। প্রতিটি দোকানেই ভিড় হবে। অপেক্ষা করতে হতে পারে। বিশেষত সন্ধের পর থেকে। তাই আবারও বলছি এই ভোজন ভ্রমণ শেষ করার চেষ্টা করুন দুপুর থেকে শুরু করে সন্ধের আগে। অবশ্য এসব অমৃতভোগের আস্বাদ পেতে একটু-আধটু অপেক্ষা করা যেতেই পারে।
• রাতের আড্ডায় বন্ধুমহলে শেয়ার করুন ভোজন পরিযায়ের সুখস্মৃতি। দল ভারী হবেই। নেক্সট ডে অর নেক্সট পুজো।
• পুজোর আগেই কোনও ছুটিছাটার দিন একটা ট্রায়াল রান দিয়ে নিন না, পরিবার-বন্ধুবান্ধব মিলে। একটা প্র্যাকটিক্যাল এক্সপিরিয়েন্স কাম প্ল্যান আগে থেকেই ছকা হয়ে থাকবে।
• মা বেনট্যাকেশ্বরী আর বাবা জেলুসিলনাথে অগাধ ভক্তি ও ভরসা রাখতে ভুলবেন না।
• বছরের অন্য সময়ও এই পরিযায় চলতেই পারে, বিশেষত বর্ষা থেকে গোটা শীত। কারণ বাঙালি তো শুধুই পুজোয় বেড়াতে যায় না। তবে শরবত সুধাপানের সেরা সময় কিন্তু গ্রীষ্মকাল।
• টিপসের সঙ্গে সঙ্গে গাইডের মজুরির ব্যাপারটা দয়া করে মাথায় রাখলে ভাল হয়।
