উলটো ফুটেই হরিদাস মোদকের শতাব্দী প্রাচীন লুচি, কচুরির কুইজিন। খাবার ব্যবস্থা আছে কলাপাতায়। এখনও। সঙ্গে আলু, কুমড়োর ছক্কা বা ছোলার ডাল। অত্যুত্তম বললে কম বলা হয়। লুচি হোক বা কচুরি কোনটা কখন ভাজবে তার কোনও ঠিক নেই কিন্তু যেটাই ভাজবে সেটাই এক্সেলেন্সের চরম সীমা অতিক্রম করবে একথা বুক বাজিয়ে বলা যায়।
অতঃপর পরিযায়ীগণ, আমাদের যাত্রার পরবর্তী পর্যায় শুরু হোক বিধান সরণি ধরে গোলবাড়ির পাশ ঘেঁষে কলেজ স্ট্রিট অভিমুখে। পথিমধ্যে যে আরও মণি থুড়ি খাদ্যমাণিক্যের ভাণ্ডার সামনে পড়বে সে কথা বোধহয় এতক্ষণ বাদে আর না বললেও চলবে।
বিধান সরণি ধরে একটু এগোলেই বাঁদিকে ফড়িয়াপুকুর লেন। মিটার বিশেক ভিতরে ঢুকেই হাতের ডানদিকে সেন মহাশয়। এদের অলৌকিক সৃষ্টি কাঁঠাল সন্দেশ। কোনও কৃত্রিম গন্ধ নয়, আসল খাজা কাঁঠালের রস থেকেই তৈরি হয় ওই দেবভোগ্য মিষ্টি। ফলে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ বড়জোর আষাঢ়ের মাঝামাঝি অবধি পাওয়া যায়। পুজোর সময় পাওয়া না গেলেও হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। বিকল্প হিসেবে রয়েছেন ক্ষীরের চপ, গোলাপ সন্দেশগণ। রূপে, স্বাদে, গন্ধে এরাও কিছু কম যান না।
এবার যাত্রাপথ কিঞ্চিৎ দীর্ঘ, যা থামবে গিয়ে বিডন স্ট্রিট সিমলে অঞ্চলে একেবারে হেদুয়ার সামনে। বেথুন স্কুলের গায়ে চার্চটির পাশের গলি ধরে মিনিট খানেক এগিয়ে গেলেই হাতের বাঁদিকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, আমাজন বা হিমালয়ের মতোই নকুড়চন্দ্র নন্দী। বর্তমানে হিলারি ক্লিন্টনের জন্য মিষ্টি পাঠানো বা ক্যাডবেরির সঙ্গে জোট বেঁধে ফিউশন জাতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা এই দোকানকে খবরের শিরোনামে নিয়ে এলেও আমি সাজেস্ট করব একবার ট্রাই করে দেখুন এদের ‘পারিজাত’ অথবা ছানার মুড়কি। মুখে মাথায় ঘোর লেগে যাবে।
গলি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রামলাইন ধরে এগিয়ে বিবেকানন্দ রোডের মোড় আর চাচার হোটেল, সংক্ষেপে চাচা’স। বহু লোভনীয় সব আইটেম এদের মেনু কার্ডে। ‘অল টাইম প্রিমিয়াম’ কিন্তু ফাউল কাটলেট, যার ভক্ত ছিলেন বিবেকানন্দ থেকে উত্তমকুমার হয়ে শিব্রাম চক্রবর্তী। বর্তমানেও এই ভক্তসংখ্যা বেড়েই চলেছে বই কমেনি। তথাকথিত বিশ্বায়নের বাজারেও এরা প্রতিদিন রাত ন’টায় দোকান বন্ধ করেন নিয়ম করে। হিংস্র বাজারি প্রতিযোগিতার আঁচ এদের স্পর্শ করতে পারেনি।
পাঠককুল, এতক্ষণে আমরা এই ‘নাতিদীর্ঘ’ খাদ্যসরণির প্রায় মাঝপথে। এযাবৎ যা কিছু পেটে পড়েছে তার প্রায় সবটাই সলিড। এবার একটু জলবিহারে যাওয়া যাক। নোঙর ফেলা যাক কপিলাশ্রমের বন্দরে। নাম শুনে ঘাবড়ে যাবেন না। সত্যিই কোনও মা-বাবার আশ্রম নয়। শরবতের দোকান। বিধান সরণি-কৈলাস বোস স্ট্রিটের মোড়ে। দোকান না বলে উঁচুতে একচিলতে খুপরি জানালা বলাই ভাল। ভিতরটা প্রায়ান্ধকার। তার মধ্যে কোলকুঁজো হয়ে বসে অন্তত মাইনাস টেন পাওয়ারের চশমা পরিহিত একটি মানুষ সৃষ্টি করছেন আম, মালাই, আবার খাই নামের অসামান্য সব শরবত জাদু। অমৃত কখনও খাইনি। কিন্তু কপিলাশ্রমের শরবত খাওয়ার পর আধঘণ্টা মনে হতেই পারে চূড়ান্ত গরমেও সুইটজারল্যান্ড নিদেনপক্ষে লোনাভালা-খাণ্ডালায় পৌঁছে গিয়েছি। স্বাদ ও গন্ধের কথা তো বাদই দিলাম। খাওয়ার, থুড়ি পান করার ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে। গরমকালে যে-কোনও সময় কুড়ি-পঁচিশ জনের পিছনে লাইন দিতে হবে।
চরৈবতি, চরৈবতি গন্তব্যস্থল কলেজ স্ট্রিট মোড়। মোড়ের উপরই ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে দিলখুশা আর তাদের সৃষ্ট মটন কবিরাজি। এহেন ভয়ংকর সুস্বাদু এবং গুরুপাক খাবারের নাম কবিরাজি রাখা হয়েছিল কেন আমার জানা নেই (অমিতাভ মালাকার বা রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে খোঁজ নিতে পারলে ভাল হত)। পঞ্চাশ থেকে নব্বই দশক অবধি দাপিয়ে রাজত্ব করেছে দিলখুশা। বর্তমানে শোনা যায় আগের রমরমা আর নেই। তবু একবার ঢুকুন। অর্ডার করুন কবিরাজি, চিকেন অথবা মটন। যা হোক কিছু একটা। ইতিহাসকে তো ছুঁয়ে আসা যাবে। দিলখুশার পাশে বইপাড়ার মধ্যে দিয়ে ঢুকে সোজা কফি হাউস। জানি না পুজোর সময় খোলা থাকে কি না। কারণ, ওই সময় কোনওদিন যাইনি। খোলা পেলে সোজা উঠে যান দোতলায়। একটু নিরিবিলি চাইলে তিনতলায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে হৈ হট্টগোল আর সিগারেটের ধোঁয়াকে উপেক্ষা করুন বুদ্ধের ঔদার্যে। সবাই কফি হাউসের ‘ইনফিউসন’ আর ‘পাকোড়া, পাকোড়া’ করে হেদিয়ে মরেন। পরিযায়ীরা অর্ডার করুন চিকেন ওমলেট। ওপরটা মাখনে ভাজা হালকা ক্রিসপি, ভিতরে তুলতুলে, মোলায়েম, সুপক্ক কুসুমের মধ্যে আত্মগোপনকারী চিকেনের টুকরো। ধ্যাবড়া বড়ও না আবার একদম ছোটও না। সঠিক মাপে কাটা। স্যস মাখিয়ে, গোলমরিচ ছিটিয়ে কাঁটার ডগায় গেঁথে মুখে তোলার পর উপেক্ষা নয় বুদ্ধের ঔদার্যে হৈ হট্টগোলকে ক্ষমা করে দেবেন। আরেকটা কথা। কফি নেবেন না। তেষ্টা বাঁচিয়ে রাখুন ‘প্যারামাউন্টের’ জন্য।
প্যারামাউন্ট। আরেক শরবত বিপণি এবং কলকাতার পানপিপাসুদের (মদ নয়) কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। এখানে অবশ্য খাওয়ার ব্যবস্থা বসে। শ্বেতপাথরের টেবিল। একেকটায় তিনজন-তিনজন করে ছ’জন বসতে পারেন। তাতেও গরমকালে লোকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খায়। আর শরবতই বা কতরকম— গ্রিন ম্যাঙ্গো, লিচি, অরেঞ্জ, ডাব (উপরে শাঁস ভাসানো), গ্রেপস ‘কিন্তু সবার চাইতে সেরা’ (কৃতজ্ঞতা সুকুমার রায়)— কোকো মালাই! কাজি নজরুল থেকে শুরু করে বড়ে গোলাম আলি সবাই এর দিওয়ানা ছিলেন। ক্যাশ কাউন্টারের ঠিক পাশে একটা বাঁধানো ফ্রেমে প্যারামাউন্টের শরবত গুণগ্রাহী সেলিব্রিটিদের নামের একটা লিস্ট টাঙানো আছে। চোখ বোলালে কপালে উঠে যাবে। পুজোর মধ্যে যদি খেয়ে নেওয়ার সুযোগ পান তা হলে বলতেই হবে আপনি সবিশেষ ভাগ্যবান। কারণ, নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি কলকাতার বুকে স্বর্গসুধা সঞ্চারকারী এই বিপণিটি বন্ধ হয়ে যায় প্রায় চার মাসের জন্য। খুলতে খুলতে মার্চ। এখানে একটা কথা বলা জরুরি। প্যারামাউন্টের পানীয় তৈরির মূল উপকরণ ডাবের জল।
