আপনারা যারা বহুকাল যাবৎ ধরেই নিয়েছেন যে, ‘ওফ! ক্যালকাটা ইজ নট আ ওয়ার্থ লিভিং প্লেস ডিউরিং পূজা টাইম’। অথবা যারা সাধারণত এ সময়টায় এই পোড়া শহরেই থাকেন অথচ এবারই এই বিপুল ভিড়ভাট্টা-ক্যাঁওম্যাও থেকে কেটে পড়ার ধান্দা করছেন, তাদের তো প্রস্তুতি সারা হয়ে গিয়েছে। অনলাইন বুকিং ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে ডুয়েল, ভ্রমণ-সংক্রান্ত যাবতীয় পত্রপত্রিকা চেটে ফেলা, কয়লাঘাটে দীর্ঘ লাইন, বুকিং অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, শেয়ালচোখো দালাল, হোটেল, রিসর্ট, হলিডে হোমের তত্ত্বতালাশ পুরী না লোলেগাঁও, আন্দামান না পাটায়া, মানালি থেকে অমৃতসর হয়ে ফেরার টিকিটটা কনফার্মড হবে কি হবে না— এই অজস্র শোয়েব আখতার মার্কা টেনশন-বাউন্সার সামলে আপনার নিট লাভ কিন্তু একটাই—জিরোতে প্যাভিলিয়ন অথবা দাদার লর্ডস মার্কা সেঞ্চুরি। অর্থাৎ টিকিট পাওয়ার তুরীয় আনন্দ নইলে অ্যালজোলাম হতাশা!
উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলি থেকে এই অধম লেখক কি এটা পাঠককুলকে বোঝাতে পারল যে, আপনি সপরিবারে আনন্দ ভ্রমণে যেতে পারুন বা নাই পারুন, প্রাক-উদ্বেগ বা পরবর্তী হতাশার ব্যাপারটাকে কিছুতেই এড়াতে পারবেন না। ঠিক এইখানে গরিব সৎ ব্রাহ্মণের সুপরামর্শ যদি নেন তা হলে একখান কথা বলি। না, না, আগেই ঠ্যাঙাতে উঠবেন না। অধমের কথাটা মন দিয়ে শুনুন। একটু অন্য ধরনের ভ্রমণ-কথা। খোদ কলকাতাতেই। এই ভ্রমণের একমাত্র শর্তই হল, পাঠক অথবা পরিযায়ীকে হতে হবে ভোজনরসিক (পেটুক নয়)। দ্বিতীয় একটি শর্তও অবশ্য আছে তবে সেটি ততটা কঠোর নয়। এই পরিব্রাজন পদব্রজে হলেই ভাল হয়। কারণ, এতে পরিপাক যন্ত্রটি সক্রিয় থাকবে। একান্তই অপারগ হলে গাড়িই ভরসা। আর খরচ! রোটাং পাস বা জয়সলমির তো দূরের কথা, দীঘা বা বকখালির চারভাগের একভাগে এঁটে যাবে। প্রতিবেদকের গ্যারান্টি!
অতএব হে মহামহিম পরিব্রাজকগণ— সপ্তমীর পুণ্যলগ্নেই শুরু হোক আপনাদের এই ভোজন পরিযায়। ধর্মতলা থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে হাতের বাঁদিকে গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের গায়ে, নিরঞ্জন আগার। কাঠের টেবিল চেয়ার। কোণের দিকে আরেকটি ছোট টেবিলে ক্যাশবাক্স সমেত খোদ মালিক। পাশে খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে প্রায় পুরো রসুইঘরটাই দেখা যায়। কোনও রাখঢাক নেই। এদের সব পদই এক কথায় যাকে বলে মহাভারতের কথার মতো ‘অমৃতসমান’। তবে সেরার সেরা ভেজিটেবল চপ। হাতবোমার সাইজ। চামচে দিয়ে কেটে কাসুন্দি লাগিয়ে মুখে পুরলে মনে হবে এতদিন বিস্কুটের গুঁড়ো মাখানো আর ভিতরে লাল বিট-আলুর ঘ্যাঁটকে উপরোক্ত জিনিসটি ভেবে খেয়েছি বলে নিজের গালেই টেনে টেনে থাপ্পড় মারা দরকার। স্বাদগুণের বিশদ বিবরণে গেলাম না। স্ব-জিহ্বায় পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
নিরঞ্জন আগারকে আলবিদা জানিয়ে এগিয়ে চলুন উত্তরমুখী। সোনাগাছিকে পাশ কাটিয়ে এসে পড়বেন যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ আর গ্রে স্ট্রিটের মোড়ে। মিত্র কাফে। ইতিহাস এখানে ফ্রিজড্ হয়ে গিয়েছে। একসঙ্গে বড়জোর কুড়ি-পঁচিশ জন বসতে পারে। খেতেই হবে এদের বিখ্যাত ব্রেইন চপ আর পুডিং। কয়েকশো মিটার দূরে উলটো ফুটে আরেক কিংবদন্তি—অ্যালেন রেস্তোরাঁ এবং এদের চিংড়ির কাটলেট। ভিতরে চিংড়ির ফিলে আর মোলায়েম ক্রিম-ব্যাটারে মাখামাখি। খাঁটি ঘিয়ের অ্যারোমা। দেখলে ছ’মাসের খিদে একদিনে পেয়ে যাবে।
অ্যালেন-মিত্র কাফের মায়া কাটিয়ে এবার ঢুকে পড়ুন শ্যামবাজার এভি স্কুলের পাশ ঘেঁষে শ্যামপুকুর স্ট্রিটের গলিতে। ‘চিত্তরঞ্জন’ কোথায়, যদি রাস্তার নেড়ি কুকুরটাকেও জিজ্ঞেস করেন দেখিয়ে দেবে। মোহনবাগান না ইস্টবেঙ্গল, উত্তম না সৌমিত্রর মতো উত্তর কলকাতাতেও বিতর্ক রয়েছে— চিত্তরঞ্জন না কেসি দাশ, কে নবীনচন্দ্রের আসল এবং সার্থক উত্তরসূরি। চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লা খেতে কেমন? দূর! আর এক কথা বারবার ঘ্যান ঘ্যান করতে ইচ্ছে করছে না।
গলি থেকে উত্তরমুখী হয়ে বেরিয়ে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ ধরে সোজা চলে আসুন শ্যামবাজার মোড়। নেতাজির ঘোড়ার ল্যাজ ঘেঁষে ল্যান্ড করুন বাগবাজার মোড়। হাতের বাঁদিকে অধুনা কলকাতায় প্রায় লুপ্ত হয়ে যাওয়া গাড়িবারান্দার নীচে দ্বারিক ঘোষ অ্যান্ড গ্র্যান্ড সন্স। এই দো-আঁশলা ‘ফিট হায় বস’ ‘বিন্দাস’ ‘ঝক্কাস’ সময়ে বাঙালি তো কতই রাম-লক্ষ্মণের লাড্ডু খেল। বলি, দরবেশ খেয়েছেন কখনও? আজকের প্রজন্মের অধিকাংশই এই মহার্ঘ বস্তুটির নামই জানে না, চেখে দেখা তো দূরস্থান। হলুদ সোনালি বোঁদের গোল্লার উপর ছড়ানো খোওয়া ক্ষীরের গুঁড়ো। হ্যাঁ মহাশয়— ইহাকেই, এই রঙিন সুন্দরীকেই দরবেশ বলিয়া ডাকা হয়। এরপরই রয়েছে কেসি দাশ। চিত্তরঞ্জনেই তো একবার রসগোল্লায় মজেছেন। আমি বলি কী, এখানে আপনার ফোকাস হোক রসমালাই। ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদু-বাস্তব কথাটা তো অনেক ক্ষেত্রেই শুনেছেন। শিল্পে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে। এবার রসনায় উপলব্ধি করুন। এরই ফাঁকে বাগবাজারের মোড়ের প্রবাদ হয়ে ওঠা তেলেভাজার দোকানগুলোয় মোচার চপ আর ছান্তাবড়ার সন্ধানে একবর অন্তত ঢুঁ মারতে ভুলবেন না।
এবার যে একটু পিছিয়ে আসার পালা। ফিরে আসুন শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে। যেমনভাবে ছাঙ্গু আর বাবামন্দির ঘুরে আবার ফিরে আসেন গ্যাংটক। পাঁচমাথার মোড় আর গোলবাড়ির কষা মাংস সমার্থক। একটু কালচে রঙের ঘন গ্রেভি। পরোটা সহযোগে, কুচোনো পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে এককথায় স্বর্গাদপী গরিয়সী!
