আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগেকার কথা। লালবাড়ির সেই বড় পুকুরটা মজে এখন এতটুকু একটা ডোবা। আর ভোঁদড়? লালবাড়ির পুকুর তো বটেই, ক্রমাগত পিছু হঠতে হঠতে মিলিয়েই গেছে গোটা গ্রাম বাংলা থেকে। চলে গেছে বিশ্ব বন্যপ্রাণ সংস্থার ‘চরম বিপদাপন্ন প্রজাতি’-র তালিকায়। সুন্দরবন আর ডুয়ার্সের জঙ্গলঘেরা নদীগুলোয় এখনও নাকি দেখা যায় মাঝেমধ্যে। সেও শুনেছি কালেভদ্রে। এখন দেখতে পাওয়ার একমাত্র ঠিকানা আলিপুর চিড়িয়াখানা। সিমেন্ট বাঁধানো জলাধার। নোংরা জল। জলে পড়ে থাকা দু’-চারটে পচাফাটা মাছ। একধারে উঁচু বেদিমতন জায়গাটায় চুপ করে বসে রয়েছে বিষণ্ণ বিমর্ষ মুখে। নিঃসঙ্গ একা! যদি মনের কোনও অবচেতন কোণে এখনও এতটুকু প্রকৃতিপ্রেম অবশিষ্ট থাকে, যদি একটিবারের জন্যও মনে হয় যে এই পৃথিবীটা শুধু মানুষের নয়, অন্যদেরও সেখানে বাস করার অধিকার আছে, তা হলে এই বিমর্ষ একাকীত্ব, ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা আপনাকেও ছুঁয়ে যাবে, যাবেই। যেতে বাধ্য।
ডাইনোসরের নাতিপুতি…
গড়িয়াহাট থেকে রুবিমোড়ের দিকে যাবার যে রাস্তাটায় এখন সারি সারি হাইরাইজ, ফ্ল্যাট, মল আর রেস্তোরাঁর ছড়াছড়ি, আজ থেকে বছর পঁয়তিরিশ—ছত্রিশ আগেও জায়গাটা ছিল ধানিজমি আর অজ পাড়াগাঁ। মনে আছে আটাত্তর সালে ভয়াবহ বন্যার কিছুদিন পরে বন্ধু বাপ্পার সাইকেলের কেরিয়ারে সওয়ার হয়ে ঘুরতে গেছিলাম ওদিকটায়। এখন যেখানটায় গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম, চারপাশ তখনও জলে থই থই, হঠাৎই চোখে পড়ল ধানখেতের পাশে আলের ধারে মাটিতে কী একটা শুয়ে রয়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিল মরা গাছের ডাল বুঝি। একটু এগোতেই ভুল ভাঙল। কালো খড়খড়ে গা। ধারালো নখওয়ালা চার পা। বিশাল লম্বা লেজ। দৈর্ঘ্যে নিদেনপক্ষে ফুট পাঁচেক। কুমির না কি? তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চমকে উঠে (আসলে ভয় পেয়ে) ধড়মড় করে দৌড়ে পিছিয়ে এসেছিলাম বেশ খানিকটা। আমাদের পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে আল ছেড়ে খেতের জলে লাফ দিল প্রাণীটা। তিরবেগে সাঁতার কেটে মিলিয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। বেশ খানিকটা আতঙ্ক আর কলকাতার বুকে কুমির আবিষ্কারের উত্তেজনায় দুই বন্ধু যখন থরথর করে কাঁপছি তখন সাইকেল আরোহী এক বৃদ্ধ চাচা, থুতনিতে একটুখানি সাদা দাড়ি, মালকোঁচা মেরে পড়া লুঙ্গি, এগিয়ে এলেন সামনে। আমাদের আতঙ্কের কারণটা শুনে তো হেসেই কুটিপাটি— “আরে ধুৎ খোকাবাবু… কুমুর (কুমির) টুমুর কিছু নয় কো। ও ব্যাটা গোঁয়ারগেল। সাপ, মাছ ধরে খায়।” প্যাডেলে চাপ দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলেন চাচা, চলে যাওয়া মাত্র আমার হাত চেপে ধরল বাপ্পা। —“খবরদার ওসব গোঁয়ারগেল-ফেল নয়। পাড়ায় ফিরে বলতে হবে কুমিরই দেখেছি, বুঝেছিস?”
সে যাই হোক গোঁয়ারগেল নিয়ে আগ্রহটা কিন্তু থেকেই গেল। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার দেখেছি ওই বাইপাস এলাকাতেই, চিড়িয়াখানায় সাপের ঘরে কাচাধারে আর দীপক মিত্রের বাদুর সর্পোদ্যানে। তাঁর কাছেই প্রথম জেনেছিলাম প্রাণীটার নাম। ওয়াটার মনিটর লিজার্ড। সাদা বাংলায় গোসাপ। গোঁয়ারগেল, গুঁইসাপ বা গুইসাপ নামেও পরিচিত। মূলত জলচর সরীসৃপ তবে ডাঙাতেও সমান দ্রুতগামী। দক্ষ মাছশিকারি, প্রয়োজনে বড় বড় সাপ মেরে খেতেও দ্বিধা করে না। এমনিতে নিরীহ কিন্তু বিপদে পড়লে আক্রমণ করতে পিছপা হয় না এতটুকু। মজবুত, ধারালো লেজ আর করাতের মতো দাঁত— এই দুয়ের আঘাতই মারাত্মক। সময়মতো চিকিত্সা না করলে বিষাক্ত সংক্রমণ হতে পারে। বহুদিন হল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শহরের বুক থেকে। বছরখানেক আগে দেখেছিলাম বারুইপুর স্টেশনের গায়ে লম্বা পুকুরটায়। একটা নয়, দুটো। বিশাল লম্বা লেজটা নাড়িয়ে প্রপেলারের মতো জল কেটে কেটে সাঁতার কাটছে জোড় বেঁধে। রাজকীয় ভঙ্গিমায়। তবে বারুইপুরও তো এখন প্রায় কলকাতা। চারদিকে ধড়াদ্ধড় গজিয়ে ওঠা ফেলাটবাড়ি, দোকানপাট… হয়তো যে-কোনও দিন ঢুকে পড়বে কলকাতার পিনকোডে। তখন এসব পুকুরটুকুর থাকবে তো? কোথায় সাঁতার কাটবে এইসব ডাইনোসোরাসের নাতিপুতিরা?
মিনিমাগনার মুদ্দোফরাশ
‘একদম হাড়গিলের মতো দেখতে।’ কোনও শীর্ণকায় কাঠখোট্টা চেহারার কারও উদ্দেশে আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি উপমাটা। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই জানি না কার সঙ্গে তুলনা করে এই উপমাটা দেওয়া হয়। হাড়গিলে। অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক। মদনটাক নামেও ডাকা হয় গ্রাম বাংলায়। সারস প্রজাতির পাখিদের মধ্যে আকারে বৃহত্তম গোষ্ঠীদের অন্যতম। কদাকার দর্শন আক্ষরিক অর্থেই। ধূসর সাদা গায়ের রং। মাথা থেকে নিয়ে গলার শেষপ্রান্ত অবধি পালকের লেশমাত্র নেই। গলার নীচে বিশাল গলকম্বল। মৃত পশুর শবদেহ ভক্ষণ করে সাফসুতরো রাখত পুরনো কলকাতাকে। বিশাল লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে ঘুরে বেড়াত শহরময় আবর্জনার স্তূপে। এ ব্যাপারে এদের খ্যাতি এতই সুবিদিত ছিল যে তত্কালীন মিউনিসিপাল কর্পোরেশন তাদের লোগোয় এদের ছবি ব্যবহার করত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ সহ পুরনো কলকাতা-সংক্রান্ত একাধিক বইয়ে পাখিটির উল্লেখ রয়েছে। শকুনের মতোই হাড়গিলেও অবলুপ্ত হয়ে গেছে শহরের বুক থেকে। শকুনের অনেক আগেই। সেই বিশের দশকে। কলকাতার আরেক বিনে মাইনের মুদ্দোফরাশ।
নগর পুড়িলে কি…
বছর পঞ্চাশ আগে চিড়িয়াখানার চেহারাটা মনে আছে? শীতকালের দুপুর। চিড়িয়াখানার বিশাল ঝিল। এক ইঞ্চি জল দেখা যাচ্ছে না। পরিযায়ী পাখির ভিড়ে থিকথিক করছে জলাশয়। গ্রেটার হুইসলিং টিল, লেসার হুইসলিং টিল, স্পটবিল হাঁসের দল, মানস সরোবর, সাইবেরিয়া… হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উড়ে এসেছে শহরে। সুদূর শীতের রাজ্য থেকে। কিচমিচ কলরবে মুখরিত চারপাশ। শীত দুপুরের মিঠে রোদে গা ভাসিয়ে ম্যাগনোলিয়া আর জলি চ্যাপ আইসক্রিম খেতে খেতে ঝিলের ঝোলানো ব্যালকনিতে বসে বসে পাখি দেখা। ওফ! সে এক রূপকথা ছেলেবেলা। মোটামুটি আশির দশকের গোড়া থেকেই এই অলৌকিক দৃশ্যপটের পর্দায় চিড় ধরতে শুরু করে একটু একটু করে। আকাশ ফুঁড়ে ওঠা কুৎসিত দাম্ভিক বহুতল আর চোরাশিকারির লঙ্গর সুতোর বড়শি-ফাঁদে পড়ে ক্রমাগত পথ হারাতে থাকে পরিযায়ী পাখিরা। আর আজ? খাঁ খাঁ চিড়িয়াখানার পুকুর। ইতিউতি কয়েকটা গো-বক, পানকৌড়ি, কোঁচবক আর শামুকখোল… বিলুপ্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও রয়ে গেছে চিড়িয়াখানার ঝিলে। কী বুঝছেন পাঠক? একবারও মনে হচ্ছে না আমি বা আপনি, আমরাই এর জন্য দায়ী? কারণ আমরা তো প্রতিবাদ করিনি কখনও। চিৎকার করে উঠিনি একটিবারের জন্যও— “যা হচ্ছে, অন্যায় হচ্ছে!” তার বদলে আরও, আরও বেশি করে লুকিয়ে পড়ছি সাড়ে সাতশো, হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, ই এম আইয়ে কেনা গাড়ি আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আড়ালে। কিন্তু এভাবে কি বাঁচা যাবে? সার্ধশতবর্ষ অতিক্রান্ত মহীরুহ এক জ্ঞানবৃদ্ধ সেই কবে লিখেছিলেন— ‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় বাঁচে?’ চিন্তা নেই, এরকম চলতে থাকলে আমরা বাঁচব না, গাছপালা, নদনদী, খালবিল-পুকুর, পাহাড় ঝরনা, কীটপতঙ্গ পশুপাখি… আমাদের অনেক, অনেক আগে থেকে পৃথিবী নামক এই অনন্য আর অসামান্য গ্রহটার বাসিন্দা ওরা। তাই ওরা না থাকলে আমরাও থাকব না— এই সহজ সরল সত্যটা উপলব্ধি করা দরকার সবার আগে। বুঝতে পারলে ভাল। আর না পারলে?—‘শেষের সে দিন (কিন্তু সত্যিই) ভয়ংকর!’
০৮. কলিকাতা খাইবার পাস-১
পুজো তো এসে গেল। হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকদিন। মাসকয়েক আগে থেকেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে দণ্ডায়মান হোর্ডিং-ব্যানারে বড় বড় ক্লাবগুলোর থিম শোভিত জগজ্জননীর মুখ। এই ভ্যাপসা গরমেও ব্লেজার পরা সুদর্শনা ঘোষিকার মিষ্টি ঘোষণা, টিভিতে— আর মাত্র তেইশ দিন। মাঝে মাঝে জুম অথবা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে ইনকমপ্লিট মা দুর্গা, ঘর্মাক্ত কুমোর, কুমোরটুলি। আপনি চান বা না চান উপরোক্ত সব ঘটনাক্রম বা দৃশ্যাবলি আপনার ঘাড়ের নড়া ধরে মনে করিয়ে দেবেই, ‘আজি মেগাপূজা জাগ্রত দ্বারে।’
