স্টেডিয়ামের ওপারেই বেলেঘাটা সুভাষ সরোবর। শীতের সময় গেলে দেখতে পাবেন জলাশয়ের মাঝখানে গোল দ্বীপের মতো জঙ্গুলে জমিটায় পানকৌড়ি আর বকেদের পাশে গাছের ডালে ভাঙা কাঠকুটো দিয়ে থালার আকারে বাসা বেঁধেছে শামুকখোল সারস (ওপেন বিলড স্টর্ক)। আকারে অন্যান্য প্রজাতির বড় সারসের সমান। ধূসর সাদা গায়ের রং। ডানার শেষপ্রান্তে কালো রঙের শেড। মাছ, ব্যাঙ, ঢোঁড়া সাপ, গেঁড়িগুগলি… অরুচি নেই কিছুতেই। প্রায় সর্বভুক বলা চলে। লম্বা মজবুত ঠোঁটে শামুকের খোলা ভেঙে খাওয়ার দক্ষতার জন্যেই বোধ হয় শামুকখোর বা শামুকখোল নামটির উৎপত্তি। আগে রবীন্দ্র সরোবরের দ্বীপটিতেও দেখতে পাওয়া যেত। ইদানীং আর দেখা মেলে না তেমন একটা। বর্তমানে সুভাষ সরোবর ছাড়া শহরে মুক্ত প্রকৃতিতে দেখতে পাওয়ার একমাত্র ঠিকানা আলিপুর চিড়িয়াখানার ঝিল।
স্বর্গোদ্যান
গার্ডেনরিচে বি এন আর অধুনা সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ের সদর দপ্তর। অফিসের চারপাশ ঘিরে বিশাল খোলা মাঠ আর বাগান। অফিস চত্বরের পিছনেই বহমান গঙ্গা। পাড় ভর্তি গাছগাছালি। এককথায় সবুজের সমারোহ। আমার নিজের ভাষায় স্বর্গোদ্যান। প্রকৃতি আর বন্যপ্রাণকে এত কাছাকাছি আর এত ভালভাবে দেখার জায়গা এই শহরে আর কোথাও নেই। অন্তত এই অধম প্রতিবেদকের ধারণা তাই। কত রকমের পাখি যে দেখেছি এখানে। টুনটুনি, বক, পানকৌড়ি, টিয়া, ছাতারে, কাঠঠোকরা, বুলবুলি, কোকিল… এসব তো আছেই, এ ছাড়াও এমন দুটি পাখি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল এখানে যা মুক্ত প্রকৃতিতে আর কোথাও দেখতে পাইনি, অন্তত এই শহরবৃত্তে। ময়দান, লেক, চিড়িয়াখানা, ফোর্ট উইলিয়াম আর টলিগঞ্জ গল্ফ ক্লাবের কথা মাথায় রেখেই একথা বলছি। এবার প্রথম পাখিটিকে দর্শনের অভিজ্ঞতা বলি। হাসপাতালের পিছনে গঙ্গার পাড় ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা পাখি। আকারে দাঁড়কাকের চেয়েও বড়। লেজটা শরীরের চেয়েও লম্বা। পালিশ কালো গায়ের রং। উজ্জ্বল বাদামি ডানাজোড়া, ঘুরে ঘুরে কী সব খুঁটে খাচ্ছে গাছের ছায়ায়। আমাকে দেখেও তেমন একটা ভয় পেল বলে মনে হল না। খুব কাছে এগিয়ে যেতে ‘কুব্’ জাতীয় একটা শব্দ করে উড়ে গিয়ে বসল গাছের ডালে। বাড়িতে ফিরে বইপত্তর ঘেঁটে পাখিটার নাম জেনেছিলাম। কুকো। কুকা বা কুবোপাখি নামেও ডাকা হয় বাংলার অনেক অঞ্চলে।
দ্বিতীয় পাখিটিকেও দেখেছিলাম মাটিতেই তবে গাছের ছায়ায় নয়। খোলা ঘাসজমিতে। রেল হাসপাতাল লাগোয়া ফুটবল গ্রাউন্ডের ঘাসজমিতে ঘুরে ঘুরে পোকামাকড় খুঁজছে একমনে। প্রথমে মনে হয়েছিল কাঠঠোকরা বুঝি। একটু বাদেই ভুল ভাঙল। কাঠঠোকরারা এতক্ষণ জমিতে থাকে না। চেহারাটা চোখে পড়ার মতো। গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল খয়েরি। কাঠঠোকরার চেয়েও সরু ছুঁচলো ঠোঁট। ডানার ওপর ত্রিভুজাকৃতি সাদা-কালো নকশা। লম্বা বাঁকানো ঝুঁটির ওপর গোটা পাঁচেক কালো ফুটকি। এককথায় অপূর্ব। আকারে কাঠঠোকরার চেয়ে সামান্য বড় আর স্বভাবে বেশ ভিতু। কাছাকাছি কেউ নজর রাখছে টের পেতেই উড়ে গেল ফুড়ুৎ করে। এর পরিচয় জানতেও শরণাপন্ন হতে হয়েছিল ড. সালিম আলির ‘কমন বার্ডস’-এর। মোহনচূড়া। ইংরেজিতে উপুপা।এখনও বহুল পরিমাণে দেখা যায় বাংলার গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবন ঘেঁষা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়।
উপরোক্ত দুটি পাখিকেই পরবর্তীতে গ্রামের দিকে বেশ কয়েকবার দেখার সুযোগ ঘটলেও শহরবৃত্তে প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা ওই একবারই। সেই বি এন আর-এর বাগানে। এখানেই দেখেছি ধূসর ছিট ছিট আর পাকা পাতিলেবু রঙা ডানাওয়ালা দু’ধরনের প্রজাপতি। পুজোর আগে থেকে শুরু করে পুরো শীতকালটা জুড়ে উড়ে বেড়াত গোটা কলকাতায়। বহুদিন হল ‘নিরুদ্দেশ’ শহর থেকে। ‘হারানো-প্রাপ্তি’-টা ঘটতে পারে একমাত্র এই বি এন আর-এর বাগানে এলে।
বন্যপ্রাণ নিয়ে টুকটাক শহুরে অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার সাক্ষীও এই বাগান। একটা মাদি হনুমান। কোত্থেকে যেন পোয়াতি অবস্থায় এসে ডেরা গেড়েছিল এই রেলের বাগানে। কিছুদিন বাদে একটা মৃত বাচ্চা প্রসব করে। বেশ কয়েকদিন বসে ছিল মরা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের সামনে। এরপর হঠাৎই একদিন উধাও বাগান থেকে। দু’-চারদিন বাদে ফিরে এসেছিল খালি হাতে। ফাঁকা হয়ে যাওয়া কোলে তুলে নিয়েছিল মা-মরা দুটো কুকুরছানাকে। সারাদিন কত না যত্নআত্তি। সরু লম্বা লম্বা আঙুল দিয়ে পোকা বেছে দেওয়া, পেশেন্টপার্টিদের ছুড়ে দেওয়া ভাঙা বিস্কুট, কেক-পাউরুটির টুকরো, আগে ছানাদের মুখে দিয়ে তারপর দু-চার টুকরো দাঁতে কাটত। কিন্তু সমস্যা একটাই। সামান্য বিপদের আঁচ পেলেই ছানা কোলে সোজা মগডালে। অনভ্যস্ত পরিবেশে ছানাদের প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ, কুঁইকুঁই, কেঁউকেঁউ… অমনি লম্বা লম্বা হাতে ঠাস ঠাস চড় গালে বা পিঠে। এই অসম, বিধর্মী অপত্য স্নেহের পরিণাম শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল দেখার জন্য ফিরে যাওয়া হয়নি রেলের বাগানে।
ফিরবে না আর কোনওদিন
‘ওরে ভোঁদড় ফিরে চা/খোকার নাচন দেখে যা।’ বাংলার আরেক ছেলেভোলানো ছড়া। খোকার নাচন দেখে ভোঁদড় আদৌ ফিরে চায় কি না জানা নেই, তবে ভোঁদড় ত্রিসীমানায় রয়েছে জানতে পারলে লালবাড়ির বুড়ি জেঠিমা যে ধেই ধেই করে নাচতেন সেটা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি বহুবার। বেহালা সরশুনায় মামাবাড়ির পাশে লালবাড়ি। বনেদি এদেশীয় পরিবার। বিশাল পুরনো বাড়িটা লাল ইটের বলেই এলাকায় পরিচিত ছিল লালবাড়ি নামে। বাড়ির গায়েই ঘাটবাঁধানো পুকুর। দুপুরবেলা শুয়ে আছি। হঠাৎই ‘ঝপ্পাৎ’ শব্দ পুকুরের জলে। সঙ্গে সঙ্গে লালবাড়ির বড় বউ, বুড়ি জেঠিমার তীব্র চিলচিৎকার—“ওরে বিজে! পুকুরে উদ পড়েচে! শিগ্গির শিগ্গির যা…” শোনামাত্র বিজয়দা, বুড়ি জেঠিমার বড় ছেলে। শক্তসমর্থ চেহারা। খালি গা। মালকোঁচা মারা গামছা। নাকের নীচে ক্লার্ক গেবলের মতো সরু গোঁফ… তেড়ে ছুটে যেতেন পুকুরপাড়ে। হাতের মুঠোয় ধরা একটা খেটো বাঁশের লাঠি। দমাদম পিটতে শুরু করতেন পুকুরের জলে আর আশপাশের ঝোপঝাড়ে। সঙ্গে প্রবল হেঁড়ে গলার গর্জন—“অ্যাই শালা উদের বাচ্চা!…” বাকিটা অশ্রাব্য। আমরাও গোলমাল শুনে ছুটে যেতাম পুকুরপাড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা প্রাণী। না কুকুর, না বেড়াল, না শেয়াল… সাইজে হাত দেড়েক। লম্বাটে গোলপানা কালো তেল পিছলোনো চেহারা। চ্যাপটা মোটা লেজ। হাঁসের পায়ের মতো চ্যাপটা বেঁটে বেঁটে পা। থ্যাবড়া মুখ। নাকের দু’ধারে খাড়া খাড়া ঝাঁটা গোঁফ। মুখে কামড়ে ধরা একটা ল্যাটা, চারাপোনা বা এদেশে সদ্য উপনিবেশ স্থাপনকারী ত্যালপিয়া। বিদ্যুত্গতিতে জল ছেড়ে উঠে মিলিয়ে যেত ঝোপঝাড়ের জঙ্গলে। আসলে ওটা ভোঁদড় (কমন ইন্ডিয়ান অটার)। উদ, উদবিড়াল, বা উদবিলাই নামে পরিচিত সারা বাংলা জুড়ে। ‘পানি কা কুত্তা’ নামেও ডাকা হয় হিন্দি ভাষাভাষী রাজ্যগুলোয়।
