পানকৌড়ি ছাড়াও ভিক্টোরিয়ার বাগানে আমার আকর্ষণের আরেকটি মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাদুড় (কমন ইন্ডিয়ান ফক্সব্যাট)। কমলা আর ধূসর বাদামি গায়ের রং। ছুঁচোলো মুখটা অনেকটা খ্যাঁকশেয়ালের মতো। শয়ে শয়ে ঝুলে থাকত বড় বড় গাছের ডালে। আদ্যম্ত নিশাচর। সন্ধে নামলেই ঝাঁক বেঁধে বেরিয়ে পড়ত ফলমূল, খাবারের সন্ধানে। পরবর্তীতে যাযাবর শ্রেণীর একধরনের মানুষের খাদ্য হিসেবে পালে পালে শিকার হয়ে পুরনো বাসা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে আলিপুর চিড়িয়াখানার বড় বড় গাছগুলোকে। পয়সা খরচ করে টিকিট কাটতে হবে না। তাজ বেঙ্গলের উল্টোদিকে আদি গঙ্গার ব্রিজটার ওপরে দাঁড়ালেই দেখতে পাবেন যে-কোনওদিন। শয়ে শয়ে ঝুলে রয়েছে গাছের ডালে। পড়ন্ত বিকেলে বাসা ছেড়ে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়া খাদ্যান্বেষণে। রোজ সে এক অনির্বচনীয় দৃশ্য। সারারাত উড়ে উড়ে ফলপাকুড়, পোকামাকড় খেয়ে কাল ভোর ভোর আবার ফিরে আসবে এই ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে…এখনও টিকে থাকা একটুকরো বাসায়। ভাবলেই মনে মনে অদ্ভুত আনন্দ আর স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে একটা।
নীরব উচ্ছেদ
বছর দুয়েক আগে, রবিবারের দুপুর। ঈষৎ ভালমন্দ খেয়ে চোখ বুলোচ্ছি গল্পের বইয়ে। এমন সময় আদ্যন্ত প্রকৃতিপ্রেমী, অনুজপ্রতিম বন্ধু বিমলের ফোন। “তাড়াতাড়ি এসো বাপিদা! পাড়ায় সাপ ধরা পড়েছে” কথার মাঝখানে যান্ত্রিক গোলযোগে কেটে গেল লাইনটা। আর দেরি না করে জামাটা গলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাস ধরব বলে।
এন্টালি তালতলা অঞ্চলের পুরনো পাড়ায় বিমলদের বাড়ি। গিয়ে দেখি ওদের বাসা থেকে সামান্য দুরে একটা ছোটখাটো জটলা। বিমল আমাকে দেখামাত্র বেরিয়ে এল ভিড়ের মধ্যে থেকে। উত্তেজিত চোখমুখের চেহারা। ওর কাছেই শুনলাম ঘটনাটা। এলাকার একটা পুরনো বনেদি বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল কদিন ধরেই। ফ্ল্যাট উঠবে। আজ সকালে ভাঙতে এসে প্রোমোটারের মিস্ত্রি-মজুররা ইটের পাঁজার আড়ালে সাপটাকে দেখতে পায়। ওরা তো তখনই মেরে ফেলতে যাচ্ছিল। নেহাতই ভাগ্যক্রমে বিমলের চোখে পড়ে যাওয়ায় সেরকম কিছু ঘটেনি। শুনতে শুনতেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম সামনে। পাশে ভাতের হোটেল থেকে চেয়ে আনা একটা গামলা উপুড় করে তার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে প্রাণীটাকে। গামলার ওপর চাপানো বড়সড় একটা থানইট। বসে পড়ে ছোট্ট একটা টোকা দিলাম গামলার গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে ভয়ংকর ক্রুদ্ধ ফোঁসফোঁসানি। গর্জন আর চেহারার বর্ণনা শুনে যা মনে হচ্ছিল সেটা আর ভাঙলাম না বিমলের কাছে। মুখে প্রশ্ন করলাম বনদপ্তরে খবর দিয়েছিস?” “প্রায় আধঘণ্টা হতে চলল…।” জবাব দিল উদ্বিগ্ন বিমল। অতঃপর অপেক্ষার পালা। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মিনিট কুড়ির মধ্যে বাড়ির সামনে হাজির দপ্তরের গাড়ি। নিজের বাড়িতে প্যাঁচা উদ্ধারের অভিজ্ঞতা থেকে ওদের কাজের ধরন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা ছিল। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই সামনের ভিড়টাকে হালকা করে দিতে বললেন পাড়ার ছেলেদের। প্রত্যেকের হাতে মোটা ধাতব দস্তানা। একজনের হাতে দুমুখো সাপধরা লাঠি। এগিয়ে গিয়ে ইট তুলে গামলাটা সরাতেই বুঝতে পারলাম আমার ধারণাটা একদম সঠিক। ফুট চারেকের মতো লম্বা। উজ্জ্বল হালকা বাদামি রঙের ওপর কালচে বাদামি রঙের মতো ছোপ সারা গা জুড়ে। গোখরো, কেউটে বা দাঁড়াশের তুলনায় মোটা, ভারীসারি চেহারা। চওড়া, থ্যাবড়াটে মাথা। চন্দ্রবোড়া। ইংরেজিতে রাসেল ভাইপার। ঝোপজঙ্গল, খড়ের গাদা ছাড়াও পুরনো বাড়ির ইটের ফাঁকফোকরে অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে জায়গাতেও থাকতে পছন্দ করে। পাড়ার লোক বিশেষ করে বাড়ির বাসিন্দাদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করলেন। অ্যাতোদিন ধরে রয়েছেন এবাড়িতে অথচ কাউকে কামড়ানোর কথা শোনা যায়নি কোনওদিন। অতএব এ নিশ্চয়ই বাস্তুসাপ। কথাবার্তা শুনে হাসছিলাম মনে মনে। আসলে ওসব কিছু নয়। সাপ এমনিতেই ঠান্ডা রক্তের নিরীহ প্রাণী। আগে থেকে মানুষের পায়ের আওয়াজ বা উপস্থিতি টের পেলে পত্রপাঠ সরে পড়ে সেখান থেকে। নেহাতই আক্রান্ত বোধ করলে বা গায়ে পা না পড়ে গেলে সাধারণত কামড়ায় না কাউকে। আর সেটাও সেই ভয়ের কারণেই। বনদপ্তরের কর্মীরা মোটা ঝোলায় ভরে সাপটাকে নিয়ে যাবার সময় একটাই প্রশ্ন জাগছিল মনে। একজন তো রক্ষা পেল। উচ্ছেদ হলেও পুনর্বাসনের একটা ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা হবে আশা করি। কিন্তু ওর আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগুষ্টি —তারা কি কেউ এখনও থেকে গেল ভাঙা বাড়িটার ইটের পাঁজায়? তাদের ভবিষ্যৎ কী? উচ্ছেদ তো হতে হবেই। কিন্তু হওয়ার পর যাবেটা কোথায়? আরেকটা পুরনো বাড়িতে? সেরকম আস্তানাই বা আর ক’টা টিকে রয়েছে শহরে? প্রায় সবই তো হাইরাইজের গর্ভে। যদি বা কোনওমতে এক-আধটাকে খুঁজে পাওয়া যায় আদৌ সেখানে গিয়ে পৌঁছোনো যাবে কি? পাকা রাস্তা, নিয়নের চোখ ধাঁধানো আলো, ধেয়ে আসা নির্দয় গাড়ির টায়ার, সভ্য এবং হিংস্র চোখের শ্যেন নজর আর শরীর লক্ষ্য করে নেমে আসা নির্মম উদ্যত লাঠি…এতসব এড়িয়ে বুকে হেঁটে আদৌ পৌঁছনো যাবে কি কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়? উত্তর অজানা।
জলে হাঁটা
শুনেছি হঠযোগী সিদ্ধপুরুষরা নাকি জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন। সচক্ষে দেখার ‘সৌভাগ্য’ হয়নি। বাস্তবে আদৌ সম্ভব কি? পরীক্ষা করে দেখার সুযোগও পাইনি কোনওদিন। মানুষ কেন কোনও প্রাণীই যে জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারে না এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। আর এই জানাটাই চরম বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছিল একবার। পার্ক সার্কাস কানেক্টর ধরে যাচ্ছি। হঠাৎই চোখ গেল সায়েন্স সিটির গায়ে বিশাল ঝিলটার পাড়ে। একটা পাখি। মুরগি আর বকের মাঝামাঝি চেহারা। আকারে বড়জোর একটা দেশি মুরগির মতো। চোখধাঁধানো উজ্জ্বল ময়ূরকণ্ঠী গায়ের রং। লাল টুকটুকে ঠোঁট। লম্বা লম্বা বকের মতো ঠ্যাঙ ফেলে হেঁটে বেড়াচ্ছে জলের ওপর। অবাক বিস্ময়টা কাটিয়ে একটু কাছে যেতেই ভুল ভাঙল। আসলে জল নয়, জলের ওপর ভেসে থাকা বনকলমি আর কচুরিপানার ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে পাখিটা। অথচ গাছগুলো একটুও ডুবে যাচ্ছে না। এতটাই নিঃশব্দ আর হালকা পদচারণা। পরে জেনেছিলাম পাখিটার নাম জলপিপি। ইংরেজিতে পার্পল মুরহেন। এ ছাড়াও কামপাখি, জলমুরগি, ডাহুক ইত্যাদি একাধিক নামেও পরিচিত বাংলার গ্রামাঞ্চলে। পরবর্তীতে এদের আরও দুই জ্ঞাতিভাইয়ের দেখা পেয়েছিলাম বাইপাসের ধারে ভেড়িগুলোয় আর সেই ইডেনের পুকুরে। ধূসর আর সাদা রঙের হোয়াইট ব্রেস্টেড ওয়াটার হেন। দ্বিতীয়টি ব্রোনজ উইঙ্গড জাকানা। উজ্জ্বল কালো মাথা, গলা আর বুক। পিঠ আর ডানার রং সবুজাভ ব্রোঞ্জের মতো। লালচে বাদামি লেজ। সব মিলিয়ে সে এক রাজকীয় রঙের সমাহার। ইডেনের পুকুর আর বাইপাসের ভেড়ি ছাড়াও পরে আরও বেশ কয়েকবার দেখার সুযোগ হয়েছে বন্ধু গৌতম কুমার দে-র নিউ গড়িয়ার বাড়ির পাশের ডোবায়। জলে হাঁটার মতো ডুব সাঁতার বা ভেসে বেড়ানোতেও সমান দক্ষ কিন্তু ওড়ার ব্যাপারে ততটা নয়। খুব প্রয়োজন ছাড়া উড়তেও চায় না তেমন একটা। খাদ্য বলতে জলজ ঘাসপাতা আর ছোটখাটো পোকামাকড়। বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এখনও নিয়মিত উড়ে আসছে কল্লোলিনী তিলোত্তমায়। এখানেও বিপদ তো সেই একটাই। পুকুর ক্রমাগত কমে আসছে শহরে। ফলে আর কতদিন দেখতে পাওয়া যাবে রূপসী (নাকি রূপবান?) জলপিপিদের তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশটা কিন্তু থেকেই গেল।
উত্তরসূরি
বছর কয়েক আগে সল্টলেক থেকে ফিরছিলাম এক বন্ধুর গাড়িতে চড়ে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে। মাঝরাস্তায় হঠাৎই বিগড়াল গাড়িটা। দাঁড়িয়ে পড়ল চিংড়িহাটা থেকে সামান্য দূরে বিশাল পুকুরটার পাড়ে। ড্রাইভার নেমে বনেট তুলে খুটখাট কীসব পরীক্ষা করতে শুরু করল। পাশে দাঁড়ানো উদ্বিগ্ন বন্ধু। যেহেতু যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে ন্যূনতম জ্ঞান নেই তাই পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম জলাশয়ের ধারে। আর ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। দূর থেকে ভেসে আসা হোর্ডিংয়ের হালকা আলোয় একটা প্রাণী। আকারে সাধারণ বেড়ালের প্রায় তিনগুণ। ধূসর গায়ে লম্বাটে গোল গোল ছোপ। পুকুরপাড়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল জলের ধারে। পাথরের মতো নিশ্চল, স্থির হয়ে ওত পেতে বসে রইল কিছুক্ষণ। মিনিট দুয়েক এভাবে কাটল। হঠাৎই বিদ্যুত্গতিতে জলে থাবা মারল একটা। মুহূর্তের মধ্যে একটা মাছ, থাবার ঝটকায় ছিটকে এসে পড়ল পুকুরপাড়ে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে তরিবত করে মাছটাকে খেল প্রাণীটা। তারপর ধীরে সুস্থে উঠে ফের মিলিয়ে গেল ঝোপঝাড়ের আড়ালে। আগে যেহেতু চিড়িয়াখানায় বেশ কয়েকবার দেখেছি তাই আলো আঁধারিতেও চিনতে অসুবিধে হয়নি। মেছো বিড়াল, ইংরেজিতে ফিশিং ক্যাট। বাঘঢাঁশ, বাঘঢাশা বা বাঘেলা নামেও পরিচিত। বন্দি অবস্থায় দেখে থাকলেও মুক্ত প্রকৃতিতে শিকার করতে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা এই প্রথম (সেটাই একমাত্র এবং শেষ) আর সেই ঘোরেই বুঁদ হয়ে রয়েছি। এমন সময় গোঁ গোঁ যান্ত্রিক আওয়াজ। সচল হয়েছে গাড়ি। ফিরতে ফিরতে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘দশ লক্ষ বছর আগে’ উপন্যাসটির কথা। প্রবাসী জেনেটিক বিজ্ঞানী পরিতোষ কুণ্ডুর স্কটিশ সহধর্মিণী এলসা টিচবোর্ন (নিজেও বিজ্ঞানী)। কলকাতায় সংহতি কলোনির স্বামীর বাড়িতে এসে মাঝরাতে বাড়ির পাশে প্রায় মজে যাওয়া পুকুরের গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিল এমনই একটি বাঘঢাশাকে। এ এমনই এক প্রাণী যা শেয়াল, খটাশ, বাঘরোল বা বনবেড়ালের মতোই মুছে গ্যাছে শহর আর শহরতলির মানচিত্র থেকে। এলসার মনে হয়েছিল এ যেন সেই কোটি কোটি বছর আগে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাইনোসরের কোনও উত্তরসূরি, আজও টিকে রয়েছে সংহতি কলোনির পুকুরপাড়ে… হু হু করে গাড়ি ছুটছে। গাড়ির মধ্যে আমি। এলসার ভাবনা রথের সহযাত্রী। পটভূমি—সংহতি কলোনির পুকুরের জায়গায় বাইপাসের জলাভূমি। তফাত শুধু এটুকুই।
উলট পুরাণ
ঠিক তাই। একদিকে যেমন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ না খাওয়াতে পেরে শহর থেকে একে একে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সেখানকার না-মানুষি বাসিন্দারা, আর ঠিক তখনই এর একদম উলটোটাও ঘটে চলেছে প্রকৃতিতে। জঙ্গলে পর্যাপ্ত খাবার নেই তাই জঙ্গল ছেড়ে লোকালয় চলে আসছে বন্যপ্রাণীরা। সুন্দরবনের বাঘ থেকে ডুয়ার্সের লেপার্ড হয়ে দলমার হাতি—কেউই এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের শহরেও কিন্তু এরকমটা ঘটে চলেছে মাঝে মধ্যেই। রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে অথবা বাড়ির পাশেই আপনাদেরও অনেকের নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে দৃশ্যটা। বাড়ির ছাদ, টালির চাল, জানালার আলসে, জনবহুল বাজার এলাকা…সর্বত্র এদের অবাধ উপস্থিতি। রাস্তা ধরে বাজার ভরতি থলে হাতে চলেছেন অসতর্ক সহনাগরিক। হঠাৎই একটা আওয়াজ—হুপ! সরু সরু নখর আঙুলের হ্যাঁচকা টানে বাজারের ব্যাগ ছিটকে মাটিতে। ছিনতাই হয়ে গেল কলাটা মুলোটা। ফলের ডালা সাজিয়ে বসে আছেন দোকানি। খদ্দেরের সঙ্গে কথাবার্তায় মজে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়েছেন এদিক ওদিক। টুকরি থেকে উধাও পুরুষ্টু আপেল। কে এই দুর্দমনীয় ছিনতাইবাজ? আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। হনুমান (কমন ইন্ডিয়ান লেঙ্গুর)। মাঝে মাঝেই দেখা যায় একা অথবা গুষ্টিসুদ্ধ আন্ডাবাচ্চা নিয়ে বসে আছে বাড়ির ছাদে, গাছের মগডালে অথবা খোলা রাস্তায়। গম্ভীর কালো মুখ, ইয়া লম্বা লেজ। মুখে একটা দার্শনিক ভাবভঙ্গি সবসময়। খাবার দাবার যা টুকটাক ছিনতাই করছে সেটা নেহাৎই পেটের জ্বালায়। কারণটা তো সেই একই। জঙ্গলে খাবার নেই। তার ওপর ব্যাপকভাবে চলছে বৃক্ষনিধন। কী করবে বেচারারা? কথায় বলে ‘পাপি পেট কা সওয়াল’। তাই বাধ্য হয়ে প্রকৃতির জঙ্গল ছেড়ে কংক্রিটের জঙ্গলে। ভয় নেই, ওরা আপনার টাকাকড়ি, গয়নাগাঁটি, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন কিছু চুরি করবে না। এটিএম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করারও মতলব নেই বিন্দুমাত্র। শুধু সামান্য খাবারদাবার। পেটি ক্রাইম কেস। তা ছাড়া আমাদেরই তো পূর্বপুরুষ। খেতে না পেলে আর যাবেটা কোথায়? শুধু এটুকু ভেবে এই সামান্য অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া যায় না কি?
খাদের কিনারে
বাবুঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, শোভাবাজার, বাগবাজার…কলকাতার যে-কোনও গঙ্গার ঘাটে দাঁড়ালেই হরবখত চোখে পড়ত দৃশ্যটা। পিঠে কুঁজমতো, সরু পাখনাওয়ালা কালোমতো কী একটা, ঘাই মেরেই গোৎ খেয়ে ফের ডুবে গেল জলে। ফেরি স্টিমারের নিত্যযাত্রীরা প্রায়ই দেখতে পেতেন খুব কাছ থেকে। অনেকদিন হল প্রায় অবলুপ্ত হয়ে গেছে কলকাতায় গঙ্গার বুক থেকে। শুশুক। সাধু বাংলায় শিশুমার। ইংরেজি নাম পরপয়েজ বা গ্যাঞ্জেটিক ডলফিন, সামুদ্রিক ডলফিনের মিঠেজলতুতো জ্ঞাতিভাই। ‘প্রায় অবলুপ্ত’ বাক্যটা ব্যবহার করলাম অত্যন্ত সচেতনভাবেই। কারণ প্রখ্যাত প্রাণী বিশেষজ্ঞ শ্রীঅজয় হোম মহাশয় উনিশশো চুরাশি সালে তাঁর প্রকাশিত বই ‘বিচিত্র জীবজন্তু’-তে শুশুক সম্পর্কে লিখেছিলেন— ‘এককালে কোলকাতার হুগলী নদীতেও দেখা যেতো, এখন আর চোখে পড়ে না গঙ্গার জল অতিরিক্ত দূষিত হবার ফলে’। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাই কথাটা বহুলাংশে সঠিক হলেও সর্বাংশে নয়। দু হাজার চোদ্দো সাল, হাওড়া থেকে ফেরিলঞ্চে ফিরছি বাবুঘাটে। প্রায় মাঝগঙ্গায় এসে পড়েছে নৌকা। দাঁড়িয়ে রয়েছি ডেকের ধারে। হঠাৎই মাত্র হাত বিশেক দূরে জলে আলোড়ন তুলে ডিগবাজি খেয়ে ডুবে গেল একটা শুশুক! চোখের পলক ফেলার আগেই ঘটে গেল পুরো ঘটনাটা। দক্ষ পেশাদার ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার নই। তাই লেন্সবন্দি করে রাখতে পারিনি দৃশ্যটা। তবে প্রচণ্ড উল্লসিত হয়েছিলাম মনে মনে। এটা ভেবে যে যাক! এখনও তা হলে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। তবে সেই উল্লাস মিলিয়ে যেতেও লাগেনি বেশিক্ষণ। কারণ ওই যে একটু আগেই লিখেছিলাম—‘কথাটা বহুলাংশে সঠিক।’ আগে আধঘণ্টা গঙ্গার পাড়ে দাঁড়ালেই অন্তত দু’-তিনবার শুশুকের দেখা পাওয়া যেত। আর এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকী পুরো একটা দিন অপেক্ষা করলেও অনেকসময় দেখা মেলে না। কলকারখানার বর্জ্য, মানুষের ফেলা আবর্জনা, থার্মাল পাওয়ার স্টেশনগুলোর টারবাইন জেনারেটর থেকে উৎপন্ন হওয়া উষ্ণ জল….এসবের অবশ্যম্ভাবী ফল গঙ্গাদূষণ অবলুপ্তির কিনারায় ঠেলে দিয়েছে বিশ্ব বন্যপ্রাণ সংস্থা থেকে ‘মোস্ট এনডেজারড স্পেসিস’-এর তকমা পাওয়া সম্পূর্ণভাবে মত্স্যভোজী নিরীহ এই প্রাণীটিকে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা কিছু ভাবছেন কি?
ওই যে আকাশের গায়…
…দূরের বলাকা ভেসে যায়। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কালজয়ী গান। বলাকা মানে যে বক সে কথা তো সবাই জানেন। সন্ধের আকাশে আজও দেখা যায় ঝাঁক বেঁধে উড়ে যেতে। কত কবিতা আর গানের উপজীব্য হয়ে চিরকাল বেঁচে রয়েছে এই পাখিটি আর তাদের উড়ে বা ভেসে যাওয়া। যাকে নিয়ে এত কবির কল্পনা, এত গান বাঁধা তাকে আপনারা অনেকেই দেখেছেন মাটিতে চরে বেড়াতে। গো-বক বা গাই বগলা, ইংরেজিতে ক্যাটেল ইগ্রেট। দুধবরণ পালকের রং আর লম্বা হলুদ ঠোঁট। আকারে মুরগির সমান। শহরের বিস্তীর্ণ ঘাসজমি, যার মধ্যে অন্যতম কলকাতা ময়দান, ফোর্ট উইলিয়াম আর টলি ক্লাবের গল্ফ কোর্সে একা, জোড়ায় জোড়ায় অথবা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পোকামাকড় খুঁটে খায়। লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে ঘুরে বেড়ায় গরুমোষের পিছু পিছু। উদ্দেশ্য সেই একই। গবাদি পশুর ক্ষুরের চাপে উঠে আসা মাটি থেকে কেঁচো, ছোটখাটো কীটপতঙ্গ ধরে খাওয়া। আগে গরুমোষের খাটাল-সংলগ্ন কাদাজমিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত প্রচুর পরিমাণে। ইদানীং কলকাতা থেকে খাটাল উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের সংখ্যাও দ্রুতহারে কমতে শুরু করেছে শহর থেকে। পরবর্তীতে দেখেছি ময়দানে ঘোড়ার পিছুপিছু ঘুরে বেড়াতে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে খুব দ্রুত পালটে নিয়েছে নিজেকে। সারাদিন খুঁটে খেয়ে উড়ে যাওয়া সন্ধের মুখে কোনও বড় জলাশয় (মূলত রবীন্দ্র সরোবর) বা ময়দানের কোনও ঝাঁকড়া গাছে যেখানে কাক বা অন্য শিকারি পাখির উত্পাত তুলনামূলকভাবে কম। এদেরই আরেক জাতভাই আকারে সামান্য ছোট তবে গো-বকের মতো পতঙ্গভোজী নয় মোটেই। ফিকে হলুদ বা বাদামি গায়ে লম্বা লম্বা ছিট। কোঁচ বক (পন্ড হেরন)। ধান পাখি নামেও ডাকা হয় গ্রামবাংলায়। পুকুরের ধারে ঘাড় গুঁজে বসে থাকে চুপটি করে। পাথরের মতো নিশ্চল। খুব ছোটখাটো মাছ নাগালের মধ্যে এলেই বিদ্যুত্গতিতে গেঁথে তোলে লম্বা সরু ঠোঁটের আগায়। মাছ ছাড়াও খাদ্যতালিকায় রয়েছে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হয় মাথা ও মূল শরীরের মধ্যে গলা নামক বস্তুটির কোনও অস্তিত্বই বোধহয় নেই। কিন্তু শিকার ধরা বা উড়ে যাওয়ার সময় বোঝা যায় ঈষৎ বাঁকা, অনেকটা ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো গলাটা বেশ লম্বা। এমনিতে সাদামাটা চেহারা। তবে প্রজননের সময় রূপ একেবারে ভুবনভোলানো। তখন পুরুষদের সারা পিঠ জুড়ে তামাটে লাল চুলের মতো লম্বা লম্বা পালক গজায় আর মাথা থেকে ঘাড় অবধি ঢেকে যায় দীর্ঘ দুধসাদা ঝুঁটিতে। আগে কলকাতা সহ শহরতলির সবকটা জলাশয়ে আকচার দেখা যেত। ইদানীং নগর সৌন্দর্যায়নের নামে পুকুর বাঁধানোর ধুম লেগে গেছে শহর ও শহরতলি জুড়ে। ফলে পাড়ে দাঁড়ানোর জমিটুকুও হারাচ্ছে কোঁচবক, শুধু কি ওরাই? সৌন্দর্যায়নের ঠেলায় পড়ে দ্রুত অবলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে শামুক, ঝিনুক, গেঁড়িগুগলি, কেঁচো, ব্যাঙ আর ঝাঁঝি পানা সহ একাধিক জলজ গাছগাছালি। পুকুরের ধারে মাটির পাড়কে ঘিরেই যাদের প্রজনন, বেড়ে ওঠা আর বিচরণক্ষেত্র। অন্যদিকে কংক্রিটে বাঁধানো পুকুর দ্রুততার সঙ্গে স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে ফেলে পরিণত হচ্ছে দূষিত কালো জলের বদ্ধ জলাশয়ে। মরে ভেসে উঠছে মাছ। কদিন আগেই বাঘাযতীনে এরকমই একটা পুকুরের ধারে মরে ভেসে থাকতে দেখলাম কেজি তিনেক ওজনের গোটা দুয়েক কাতলাকে। পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কুকুর বেড়াল টানাহ্যাঁচড়া করছে। পল্লীবাসী নির্বিকার, নীরব প্রশাসন চুপ! সৌন্দর্যায়ন চলছে।
দিনকাল ভাল নয় নৈর্ঋৎ
‘জোড়া শালিখ দেখলে দিন ভাল যায়।’—এহেন প্রবাদ বাক্যটি শুনে আসছি সেই ছেলেবেলা থেকে। শালিখ অথবা শালিক। ইংরেজি নাম স্টারনিডি। উজ্জ্বল আর কালচে বাদামি গায়ের রং। হলুদ কালো চোখ। অসামান্য সুন্দর দেখতে এই পাখিটি। একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে অথবা জোড়ায় জোড়ায় নেচে বেড়াত শহর জুড়ে। বাসা বাঁধত গেরস্থবাড়ির ঘুলঘুলি অথবা কড়িকাঠে। শালিখ দেখলে কারও দিন ভাল যায় কিনা জানা নেই তবে শালিখের দিনকাল যে ইদানীং মোটেই ভাল যাচ্ছে না সেটা বোঝা যায় শহরে উপস্থিতির হার দেখলে। ‘ড্রপ আউট’ হতে প্রায় বেপাত্তা একেবারে। ঝাঁকে বা জোড়ায় তো দূরের কথা, কালেভদ্রে এক-আধটার দেখা পাওয়া গেলেও দিন ভাল গেল বলতে হবে। উধাও হবার কারণটাও প্রায় সেই একই। অবাধ, অসুস্থ এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নগরায়ণ। এখনও মোটামুটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা যায় কলকাতা ময়দান, ফোর্ট উইলিয়াম, ভিক্টোরিয়ার বাগান, টালিগঞ্জ গল্ফ কোর্স আর শহরতলি অঞ্চলে যেখানে এখনও কিছুটা সবুজ টিকে রয়েছে।
আয় রে পাখি লেজঝোলা…
বাংলাভাষার নার্সারি রাইমস। মা-ঠাকুমার অবাধ্য ছেলেপুলেকে ভুলিয়েভালিয়ে খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানোর কলাকৌশল। সে সব পাট চুকেবুকে গেছে অনেকদিন। কবিতার সেই লেজঝোলা পাখিটা, ছিপছিপে চেহারা, কুচকুচে কালো গায়ের রং, ছটফটে আর প্রচণ্ড ঝগড়ুটে। শরীরের চেয়েও বড় চেরা লেজটা কাস্তের মতো দুদিকে বাঁকানো। আজ্ঞে হ্যাঁ, ফিঙের কথাই বলছি। সাহেবি নাম ব্ল্যাক ড্রংগো। আগে হাওড়া বা শেয়ালদা লাইনে লিলুয়া বা উলটোডাঙ্গা ছাড়ালেই দেখা যেত টেলিগ্রাফের তারে লম্বা লেজ ঝুলিয়ে কেতা নিয়ে বসে আছে। এখন নিদেনপক্ষে বৈদ্যবাটি বা ব্যারাকপুর না ছাড়ালে দেখা মেলে না। তবে ক’দিন আগে শহরেই দেখতে পেলাম কয়েকজনকে। সল্টলেক স্টেডিয়ামের চার নং গেটের উলটোদিকে। বসে আছে এ এম আর আই হসপিটালের সামনে ল্যাম্পপোস্টের তার আর গাছগুলোর ডালে। সন্ধের মুখে জ্বলে ওঠা ভেপার ল্যাম্পের আলোয় পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা এলাকা বাঁধা। একটু বেচাল, এক ইঞ্চি অনধিকার প্রবেশ… অমনি কর্কশ ‘ক্রি ই ই চ্’ শব্দে পালক ফুলিয়ে তেড়ে যাচ্ছে একে অন্যকে। দেখে ভাল লাগল—যাক! ঝগড়াঝাটি করেও এখনও তো টিকে আছে এ শহরে। এটাই কম প্রাপ্তি নাকি।
