মাছরাঙা ছাড়াও পুকুরের জলে রয়েছে অজস্র ঢোঁড়া সাপ (চেকারড কিলব্যাক স্নেক)। গায়ে কাঁচা হলুদ রঙের ওপর কালো কালো ডোরা। অসম্ভব সুন্দর দেখতে, নির্বিষ এই প্রাণীটির উপস্থিতি গোটা পুকুর জুড়ে। ডাঙায় প্রায় ওঠে না বললেই চলে। আবার জলের গভীরেও যায় না তেমন একটা। ছোটখাটো মাছ বা ব্যাঙ ধরবার জন্য পাড়ের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে বেশিরভাগ সময়। পাড়ের ধারে দাঁড়ালে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। একটু বাদেই দেখা মিলবে এদের। নিঃশব্দে জল কেটে কেটে কী রাজকীয় ভঙ্গিমায় বিচরণ করছে। অকারণে বিরক্ত না করলে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণেও কোনও বিপদ নেই। প্রয়োজন শুধু সামান্য ধৈর্য আর সহমর্মিতার। আগে গ্র্যান্ড হোটেলের উলটোদিকে মনোহরদাস তরাগ সহ কলকাতার বহু পুকুরেই দেখা মিলত। আজকাল আর দেখা যায় না তেমন একটা। ব্যাপক হারে পুকুর বোজানো আর সিমেন্টে বাঁধিয়ে ফেলা পাড় প্রায় অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে এই অসামান্য সুন্দর এবং নিরীহ সরীসৃপটিকে শহরের বুক থেকে।
বাগানের দেয়ালটা যেখানে গিয়ে স্টেডিয়ামের গায়ে ধাক্কা খেয়েছে, ঘন ঝোপঝাড় আর আগাছার জঙ্গলে ঘেরা টুকরো টুকরো ঘাসজমিতে প্রায়ই দেখেছি বেজি-মা (কমন ইন্ডিয়ান মংগুজ), তার একগাদা ছানাপোনাকে নিয়ে ঘুরঘুর করছে এদিক ওদিক, চোখে সদা সতর্ক দৃষ্টি। খুদে খুদে ছানাগুলো। একরত্তি তুলোর বলের মতো। মায়ের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে বাধ্য ছাত্রের মতো। শিখে নিচ্ছে বেয়াড়া রকম নির্দয় এ শহরে টিকে থাকার কলাকৌশল। আর বেশিদিন পারবে কি? ভরসা হয় না তেমন একটা। কারণ বাগানের রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ওই তালগাছগুলো ছিল শকুনদের আস্তানা। ছিল মানে আজ আর নেই। শকুন (বেঙ্গল ভালচার)। একদা এ শহরে বিনেমাইনের মুদ্দোফরাস। পচামড়া পশুর শবদেহ, আবর্জনা খেয়ে পরিষ্কার রাখত কল্লোলিনী তিলোত্তমাকে। ইডেনের তালগাছ ছাড়াও কুৎসিত দর্শন অথচ অসম্ভব নিরীহ এই পাখিটির দেখা মিলত ধাপার মাঠে, শহরের এখানে ওখানে আবর্জনার স্তূপে। মৃত গবাদি পশুর শরীরে মৃত্যুর পরও মিশে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে যকৃৎ অকেজো হয়ে বছর পনেরো হল চলে গেছে বেবাক খরচার খাতায়। এখনও মনে আছে বিশাল দুই ডানা মেলে গ্লাইডারের ভঙ্গিমায় শহরের আকাশে রাজকীয় সেই ভেসে বেড়ানো। এখন চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখতে হয়, নয়তো ডুয়ার্সের সংরক্ষণ কেন্দ্রে। এর চেয়ে মর্মান্তিক এবং দুর্ভাগ্যজনক কিছু হতে পারে কি?
বাগানের সীমানা ছেড়ে ফের প্যাগোডার দিকটায় পিছিয়ে এলে চোখে পড়বে বিশাল বিশাল সব মেহগনি, পাকুড়, অশত্থ গাছগুলোর গুঁড়ির গায়ে একাধিক ছোট বড় গর্ত। ওগুলো আসলে টিয়াপাখির (রোজ রিঙ্গড প্যারাকিট) বাসা। কলাগাছের পুরনো পাতার মতো গাঢ় সবুজ গায়ের রঙ। গলায় লাল-গোলাপি গোল রিঙের গায়ে কালো বর্ডার। টুকটুকে লাল ঠোঁট, নিশ্চিত দেখা পাওয়ার সময় শীতের শেষ। ডিম পাড়ার মরশুমে। একেকটা গর্তে একজোড়া করে থাকে। বাসার দখল নিয়ে প্রচণ্ড মারামারিও হতে দেখেছি নিজেদের মধ্যে। আগে কলকাতার আকাশে, বিশেষত সন্ধের মুখে ‘টি টি’ আওয়াজ তুলে উড়ে যেতে দেখা যেত ঝাঁকে ঝাঁকে। দিনে দিনে কমে আসছে সংখ্যাটা। উঁচু উঁচু বহুতলের বাধা, কেটে ফেলা গাছের পর গাছ আর চোরাশিকারির আঠা সুতোর ফাঁদ… ধরা পড়ে সোজা চালান রথের মেলা আর গালিফ স্ট্রিটের পাখির হাটে, অতঃপর ঠিকানা গেরস্ত বাড়ির দেড়-দু ফুটের গোল খাঁচা। একটু একটু করে হারিয়ে ফেলা ডানা মেলে আকাশে ওড়ার শক্তি। করুণ, দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা। খাঁচার বাইরে প্রিপারেটরি স্কুলে পড়া বাচ্চার পাশে গর্বিত মা। “সি হানি, দিস ইজ পি ফর প্যারট…।”
মনে আছে আজ থেকে প্রায় বছর বিশেক আগে ইডেনে নৈশালোকে কোনও একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে মাঠে ঢুকে পড়েছিল একটি অদ্ভুত দর্শন প্রাণী। মুখটা ছুঁচোলো। অনেকটা শেয়ালের মতো। ধূসর পাটকিলে গায়ের রং। অথচ পাগুলো ছোট ছোট। গুলির মতো গোল গোল চোখ। রোঁয়াফোলানো মোটা লেজের গায়ে কালো কালো ডোরা। ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠের মধ্যে। মাঠভর্তি দর্শক, খেলোয়াড় আর ফ্লাডলাইটের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে খানিকটা বিভ্রান্তও বুঝিবা। আম্পায়ার, কর্মকর্তা, খেলোয়াড়, মায় হাজার আশি দর্শক, তারাও সবাই ধন্ধে পড়ে গিয়েছিলেন কিছুটা। তবে এই হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবটা স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। মিনিট পাঁচেক ইতিউতি ঘোরাঘুরি করে ময়দান থেকে বিদায় নিয়েছিল অবাঞ্ছিত আগন্তুক। স্বস্তির হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন মাঠসুদ্ধ সবাই। পরদিন খবরের কাগজ আর টিভিতে এ নিয়ে বেশ খানিকটা হৈ চৈ-ও হয়েছিল মনে আছে। রহস্যভেদ করেছিলেন প্রাণী বিজ্ঞানীরা। ময়দানে অনুপ্রবেশকারী আগন্তুকের নাম-ভাম। ইংরেজিতে কমন পাম সিভেট। বাংলার অনেক অঞ্চলে একে সরেল বা গন্ধগোকুল নামেও ডাকা হয়। আমেরিকান রেকুনের জ্ঞাতিভাই, ফলমূল থেকে শুরু করে মাছ, পাখি, ব্যাঙ, গিরগিটি, ছোটখাটো সাপ এমনকী রান্না করা খাবার অরুচি নেই কিছুতেই। গ্রামাঞ্চল তো বটেই, পূর্বতন শহরতলি, অধুনা শহরের আওতায় এসে পড়া কসবা, যাদবপুর, টালিগঞ্জ সহ একাধিক অঞ্চলে মাঝেমধ্যেই হানা দেয় গৃহস্থের রান্নাঘরে, পাখি আর মুরগির খাঁচায়। বাড়ির আশেপাশে এলে গা থেকে পাকা মহুয়া বা আতপ চালের গন্ধ পাওয়া যায়। ধূর্ত, জাতশিকারি নিশাচর এই প্রাণীটি এমনিতে নিরীহ এবং লাজুক হলেও বিপদে পড়লে কিন্তু ভয়ংকর হিংস্র। সরু করাতের মতো দুপাটি দাঁত আর ক্ষুরের চেয়েও ধারালো নখ। বেশি সাহস দেখাতে গেলে সাংঘাতিক রকম আহত হবার সম্ভাবনা। যথেচ্ছ নগরায়ণ দিনে দিনে শহরের বুক থেকে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর সুন্দর, ছোটখাটো এই শিকারি প্রাণীটিকে। বছর পাঁচ ছয়েক আগে এদেরই একজনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল খোলা পরিবেশে। ইডেন গার্ডেন আর বিধানসভার মাঝখানে রাস্তার ওপরে। তবে জীবিত নয়, মৃত অবস্থায়। কোনও কারণে রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়ে মরেছে বেচারা। ওরকম একটা প্রাণী, কী অপূর্বদর্শন! দ্রুততম স্তন্যপায়ীদের মধ্যে অন্যতম। হেরে গেল যান্ত্রিক গতির কাছে। মর্মান্তিক! বেশিক্ষণ সহ্য করা সম্ভব হয়নি দৃশ্যটা। দ্রুত পা চালিয়ে চলে এসেছিলাম সামনে থেকে।
ছিল রুমাল…
প্রথম দেখেছিলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঝখানে বাঁধানো পুকুরটায়। প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল সাপ বোধহয়। ঠিক যেন ফণা উঁচিয়ে রয়েছে জলের মধ্যে থেকে। হঠাৎই গোৎ খেয়ে জলের মধ্যে ডুব মারল প্রাণীটা। ভেসে উঠল মিনিট দুয়েক বাদে, ঠোঁটে গাঁথা একটা ছোট মাছ। ছটফট করছে ঠোঁটের আগায়। এরকম বার তিনেক চলার পরই চরম বিস্ময়! অনেকটা সেই সুকুমার রায়ের হযবরল-র ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল-এর মতো। আপাতদৃষ্টিতে যাকে সাপ ভেবেছিলাম সে-ই হঠাৎ পাখি হয়ে জল থেকে উড়ে গিয়ে বসল পুকুরের পাড়ে একটা গাছের ডালে। রোদ পোয়াতে লাগল দু ডানা মেলে। আগ্রহ বাড়ল। সন্তর্পণে পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম গাছের নীচে। একটা পাখি। কুচকুচে কালো পালিশ করা পালকের রং। ঈষৎ বাঁকা আর ছুঁচোলো ঠোঁট। বড়জোর একটা দাঁড়কাকের সাইজের হবে। ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো বাঁকানো গলাটা অনেকটা ফণাতোলা সাপের মতো। বোধহয় গাছের তলায় আমার উপস্থিতি টের পেয়ে একটু বাদেই উড়ে গেল পাখিটা। বাড়িতে ফিরে এসে প্রথমেই গেলাম বুক সেল্ফের কাছে। কালবিলম্ব না করে শরণাপন্ন হলাম তাবৎ যত পক্ষীকুলের সিধুজ্যাঠা ড. সেলিম আলি আর অজয় হোম মহাশয়ের। দুজনেই বলছেন পাখিটার নাম পানকৌড়ি। ইংরেজিতে লেসার কমোর্যান্ট। বিহার উত্তরপ্রদেশে পানকৌয়া নামেও ডাকা হয়। এরপর থেকে যতবার গেছি ততবারই এদের দেখা পেয়েছি ভিক্টোরিয়ার পুকুরে। নিরাশ হতে হয়নি একটিবারের জন্যও।
