সুমন এলেন। বাংলা গানের মরা গাঙে জোয়ার এল। ইতিহাস সৃষ্টি হল— এসব এখন বহুচর্চিত, বহুব্যবহৃত বিশেষণ। অনেকেই বলে থাকেন। টিভি-র অ্যাঙ্কর থেকে বোদ্ধা। যেটা প্রায় কখনওই চর্চিত হয় না গানটা তিনি কতটা ভালবেসে গান। কতটা শারীরিকভাবে। তিন ঘণ্টা, গিটার, সিন্থেসাইজার, অর্গ্যান হারমোনিকা বাজিয়ে পাথর ভাঙা মজদুরের মতো পরিশ্রম করে। একা হাতে এবং সম্পূর্ণ একা। এ উপমহাদেশে তো বটেই সারা বিশ্বে এর নজির ক’টা আছে? একটা মানুষ গান এবং কী উদ্দেশ্যে গান করছেন সে ব্যাপারে এতটা কমিটেড হতে পারেন?
হ্যাঁ সুমন পারেন। আর পারেন বলেই কানোরিয়া থেকে অর্চনা গুহনিয়োগীর মামলা— জীবনে নিজের করা অনুষ্ঠানের একটা বৃহদংশই বিনা পারিশ্রমিকে করেছেন। ক’জন বলেন একথা? যাঁর অনুষ্ঠানের ইঞ্চি দুয়েক সাইজের একটা বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে ভিতরের পাতায় বেরুলে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হয়ে যায় নিমেষে, এখনও— তাঁকেই দেখেছি নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মেট্রো চ্যানেলের সামনে ঘ্যাড়ঘেড়ে আওয়াজের মাইকে কোনওরকম যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়াই খালি গলায় গান গাইছেন। রাস্তায় অথবা ভাড়ার ম্যাটাডোরের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই সুমনের ‘তোমাকে চাই’-এর বয়স হল মাত্র কুড়ি। এটা আর যে কেউ বিশ্বাস করুন আমি অন্তত করি না। আসলে এ গান তো ছিলই। আমাদের মধ্যে। বহু বহু যুগ ধরে। ছিল আমাদের শহর কলকাতায় পাড়ায়-প্রেমে-প্রতিবাদে। ছিল স্যাঁতস্যাঁতে গলির নোনাধরা দেওয়ালে। বাজারের ব্যাগে। গলির মোড়ে হাবুর রোল সেন্টারে। এলাকার এজমালি পাহারাদার ভুলির একগাদা ছানাপোনাকে দুধ খাওয়ানোর পরম আনন্দে। ছিল রোজ রোজ হারতে হারতে অন্তত একদিন জেতার নাছোড় মানসিকতায়। ছিল গুপ্তযুগের কোনও প্রাচীন ঢিপি অথবা অতিকায় টিরেনোসোরাস-রেক্সের ফসিলের মতো মাটি চাপা পড়া আমাদের মনের অন্দরে। আমরা তাকে আবিষ্কার করতে পারিনি। পারেননি বাংলা গানের স্বর্ণযুগ-রৌপ্যযুগের সেইসব প্রত্নতাত্ত্বিক খলিফারাও। সুমন পেরেছেন। তাই তিনি মায়েস্ত্রো, অনন্য, ইতিহাস। সব শেষে জয় কবির ভাষায় বলি— “আগুন ছেলেমেয়ে আমাদের/আকাশ আমাদের দখলে/যে যার বঁধুয়াকে ডেকে নাও/সুমনে দেখা করো সকলে।” দেখা করো কলকাতা।
* সুমনের গানের কুড়ি বছর পূর্তি উপলক্ষে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল আলতামিরা পত্রিকায়।
০৭. না-মানুষী কলকাতা
কলকাতায় কি বসন্ত আর আসে? নমো নমো করে কোনওমতে লক্ষ্মীপুজোর পুরুতের যজমান বাড়িতে হাজিরা দেওয়ার মতো কয়েকদিনের জন্য ঢুঁ মেরেই উধাও শীত। তারপরই কাঠফাটা গরম নয়তো প্যাচপ্যাচে বর্ষা। গত কয়েক বছর ধরে শহরের আবহাওয়ার হাল হকিকত অনেকটা এই রকম। মাঝখানে সন্ধেবেলা ফুরফুরে মিঠে হাওয়া বয়ে যাওয়া বসন্তকালটাই বিলকুল বেপাত্তা কলকাতা থেকে। তবে বসন্ত না এলেও হলুদ বসন্ত কিন্তু আসে। পার্ক সার্কাসের ঘিঞ্জি সংখ্যালঘু মহল্লা। ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল। গাছ গাছালি নিশ্চিহ্ন প্রায়। তবু হলুদ বসন্ত আসে। আমার পুরনো ফ্ল্যাটের সামনে ছোট্ট একফালি বাগানে। বিশেষ করে শীতকালে। হলুদ বসন্ত মানে হলুদ বসন্ত পাখি (ব্ল্যাক হেডেড ওরিঅল/ গোল্ডেন ওরিঅল)। বাংলায় বসন্ত বউরি, বেনেবউ নামেও ডাকা হয়। উজ্জ্বল হলুদ শরীরে কালো ডানা আর মাথা। থেকে থেকে ‘চিয়াক চিয়াক’ জাতীয় ডাক ছাড়ে। মাঝে মাঝে— ‘পি ও ও’ ধরনের সুরেলা শিস। বহুবার চেষ্টা করেছি ক্যামেরাবন্দি করার। পারিনি। চোখাচোখি হওয়ামাত্র পালিয়েছে। লক্ষ করে দেখেছি বাগানের সামনে শিমুল গাছটার মধু খুব প্রিয় পাখিটার। ফুলের একেবারে গোড়ায় বসে মাথা ঝুঁকিয়ে খাওয়ার সে কী তরিবত। ইদানীং বুড়ো হয়েছে গাছটা। ক্রমশ হেলে পড়ছে একদিকে, শীতের শেষে আর তুলো ওড়ে না তেমন। ভয় লাগে কোনওদিন যদি পড়ে যায়… আর আসবে তো হলুদ বসন্ত? বাড়ির সামনে এই একফালি বাগানে?
শুধু কি হলুদ বসন্ত? আরও কত রকমের পাখি যে আসে বাগানটায়। তার মধ্যে অন্যতম খঞ্জন (লার্জ পাইড ওয়াগটেইল)। এই এতটুকু ইঞ্চিতিনেক লম্বা চেহারা। কালচে ধূসর গায়ের রং। পেটের কাছটা দুধসাদা। শরীরের চেয়ে বড় লেজ। সবসময় খাড়া আকাশের দিকে। মাঝে মাঝেই দেখি নেচে নেচে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাদে। ইতি-উতি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কী সব। মানুষ দেখে তেমন একটা ভয়টয় পায় বলে মনে হয় না। তবে খুব কাছে গেলে ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে বাগানে শিউলি গাছটার ডালে বসে। খঞ্জন ছাড়াও মাঝেমধ্যেই কলকে ফুলের গাছটায় এসে বসে মৌটুসি (পার্পল সানবার্ড)। আকারে চড়াইয়ের চেয়েও ছোট। মধুকুয়া বা মধুচুয়া নামেও ডাকা হয় বাঁকুড়া, বীরভূম অঞ্চলে। চোখ ঝলসে দেওয়া ময়ূরকণ্ঠী নীল রং। হেলিকপ্টারের প্রপেলারের চেয়েও বিদ্যুত্গতিতে ডানা নাড়িয়ে এক জায়গায় স্থির হয়ে উড়ন্ত অবস্থায় কলকে ফুলের মধু খায় বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে। অবিকল দক্ষিণ আমেরিকান জ্ঞাতিভাই হামিংবার্ডের কায়দায়। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
এদেরই আরেক জ্ঞাতিগুষ্টির দেখা পেয়েছিলাম বাগানে। বছর কয়েক আগে। মাঝে মাঝেই বাগানে গাছগাছালির আড়াল থেকে তীক্ষ্ন ‘চিক চিক’ শব্দ শুনতে পেতাম। প্রথমে ভাবতাম বোধ হয় কাঠবেড়ালী (কমন ইন্ডিয়ান চিমপাক)। তারাও দু’-চারজন রয়েছেন যে বাগানে। রোঁয়া ফোলানো লেজ আর পিঠে তিনটে কালো ডোরা। সর্বদা ব্যস্ত ঘোরাফেরা। ভাতের দানা থেকে ছোলাভাজা, সবই রয়েছে খাদ্যতালিকায়। ওদের ডাকও অনেকটা ওই একইরকম। ক’দিন কান খাড়া রেখে ভাল করে শোনার পর মনে হল তীক্ষ্ন হলেও কাঠবেড়ালীর তুলনায় স্বরটা অনেক মৃদু এবং মিহি। ভাল করে নজর চালাতেই রহস্যের পরদা ফাঁস। চড়াই এমনকী মৌটুসির চেয়েও সাইজে ছোট একরত্তি একজোড়া পাখি। লালচে মেটে গায়ের রং। ফুড়ুক ফুড়ুক নেচে বেড়াচ্ছে ডালপালার আড়ালে। টুনটুনি। ইংরেজিতে ‘টেলার বার্ড’ ‘দর্জি পাখি’ নামে অমর হয়ে আছে রুইয়ার্ড কিপলিঙের লেখায়, উপেন্দ্রকিশোরের বইয়ে। সবসময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে। গাছের আঁশ, পাতার টুকরো ইত্যাদি ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে অসাধারণ ঘর বানায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ছোটখাটো পোকামাকড় আর ফুলের মধু। ঘর বানাতে দেখিনি কখনও তবে মধু আর পোকামাকড় খেতে দেখেছি হামেশাই। মৌটুসির মতোই প্রচণ্ড ভীরু, লাজুক এবং সতর্ক। কাছাকাছি উপস্থিতির আঁচটুকু পেলেই ফুড়ুৎ একনিমেষে। হলুদ বসন্ত, খঞ্জন, মৌটুসি, টুনটুনি ছাড়াও আসে শা-বুলবুলি (রেড ভেন্টেড বুলবুল)। পালিশ কালো নতুন জুতোর মতো পালকের রং। পেটের কাছটা টকটকে লাল। চারপাশে সাদা বর্ডার। টুনটুনির মতো এরাও থাকে জোড়ায়। পুরুষ পাখির মাথায় তেকোনা ঝুঁটি। চালের দানা, ভাঙা বিস্কুট বেশ তরিবত করে খেলেও মূল খাদ্য পোকামাকড়। স্বভাব চঞ্চল। মানুষকে তেমন একটা ভয় পায় না, মাঝে মাঝে তো উড়ে এসে জানলায় বসে পড়ে। সামনে মুড়ি বা ভাঙা বিস্কুট ছড়িয়ে দিলে প্রাথমিক সন্দেহের বশে উড়ে পালালেও পরমুহূর্তেই এসে খুঁটে খেয়ে যায়। ছোট থেকে পোষ মানালে খুব ভাল পোষ মানে। উত্তর কলকাতার গড়পাড়ে আমার জন্ম। ছেলেবেলায় দেখতাম অনেকেই একে পোষ মানিয়ে আঙুলে বসিয়ে ঘুরে বেড়াত। শুনেছি একসময় পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে বুলবুলির লড়াই হত। সেসব দেখার সৌভাগ্য হয়নি তবে কৈলাস বোস স্ট্রিটে কালোয়ার পট্টির ছোট মাঠে বুলবুলির লড়াইয়ের আসর বসত। বন্ধুবান্ধব মিলে দল বেঁধে দেখতে যেতাম। লড়াইয়ের কুশীলব সবসময় নর অর্থাৎ পুরুষ বুলবুলি। লড়াইয়ের আগে পাখিটিকে উত্তেজিত করার জন্য খাওয়ানো হত মাংসের কিমা আর ব্র্যান্ডি মেশানো ছাতুর মণ্ড। কালোয়ার মানে লোহার ব্যবসায়ীদের অনেকেরই প্রচণ্ড শখ ছিল এই খেলায়। প্রাইজ মানি ছাড়াও বিজেতা পেতেন সুদৃশ্য ট্রফি। ব্যবসায়ীদের অনেকের গদির সামনেই রাজকীয় ভঙ্গিমায় দাঁড়ে বসে রয়েছে শা-বুলবুল, আমহার্স্ট স্ট্রিট, কৈলাস বোস স্ট্রিট, চালতাবাগান, এ সব অঞ্চল ধরে হেঁটে গেলে এটি বড় পরিচিত দৃশ্য ছিল সেসময়। পাখিগুলোকে বাগানে ওড়াউড়ি করতে দেখলে আজও সেই ছেলেবেলায় ফিরে যাই মাঝে মাঝেই।
