ক্যাসেটে গান শোনার পাশাপাশি লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়তে লাগল অনুষ্ঠান দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। যার কাছে কোথায় লাগে সের্গেই বুবকা। অবশেষে সুযোগ এল। কানোরিয়ার সংগ্রামী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে শিল্পীর একক অনুষ্ঠান। নজরুল মঞ্চে। প্রথমদিনের অভিজ্ঞতা এইরকম— অন্তত আমার কাছে। চিড়িয়াখানার পিছনদিকের অন্ধকার ঘরটা থেকে কখনও কোনও বাঘকে হঠাৎ সামনের বড় জাল লাগানো খাঁচায় বেরিয়ে আসতে দেখেছেন? অথবা পুরী স্টেশন থেকে রিকশায় চড়ে স্বর্গদ্বারে বাঁক নেওয়ার মুখে প্রথম শোনা এবং দেখা বিশাল সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার ধড়াম শব্দ! আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হুবহু সেইরকম। দ্রুতপায়ে মঞ্চে প্রবেশ। কী-বোর্ডের সুইচটা অন করে দিয়ে দৃপ্ত পদচারণা। পরিধানে ব্লু-ডেনিম। হাতে অনায়াস গিটার। কণ্ঠে ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’। মুহূর্তে স্টেজ হাতের মুঠোয়! নির্বাক-মুগ্ধ-সম্মোহিত দর্শক। অনুষ্ঠান তো নয়। যেন এক আন্তর্জাতিক-মহাজাগতিক প্যাকেজ। গান চলছে। সেই সঙ্গে মেসমারাইজিং কথা। যেন এক অদ্ভুত ফাঁসে চেপে ধরছেন। আবার হালকা করে দিচ্ছেন। গানে কথায় উঠে আসছেন— সুকুমার রায়— প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়— আর্নেস্তো চে গেভারা— আখতারউজ্জামান ইলিয়াস— আচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ— ফ্রানত্জ বেকেনবাওয়ার— আমির খান— শ্যামল মিত্র— পীট সিগার— নোয়াম চাম্স্কি। উচ্চারিত হচ্ছে অপার প্রকৃতি প্রেম— প্যারিসের ছাত্র সংগ্রাম অথবা আণবিক বোমার বিরুদ্ধে জেহাদ। গান-কথা চলছে ঘুরছে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। প্রতিটি স্তরেই অনায়াস বিচরণ করছেন শিল্পী। ঘরে বসে নাক নেড়ে নেড়ে অনেক ‘সো-কলড্ সুশীল’ অনেক কথাই বলতে পারেন কিন্তু মনে মনে একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে এরকম ম্যাজিক-রিয়্যালিজম তাঁরা কস্মিনকালেও প্রত্যক্ষ করেননি। অন্তত মঞ্চে তো নয়ই। এ যেন জন লেননের Nowhere land। যেন এক অতিপ্রাকৃতিক ক্যালাইডোস্কোপ। শত সহস্র রঙিন নকশা প্রতি মুহূর্তে ভাঙছে, জুড়ছে, আবার পুনর্গঠিত হচ্ছে। এ যেন— ‘তার অন্ত নাই গো নাই।’ আসলে যে কথা বলছিলাম— শিল্পী মঞ্চে গাইছেন, বলছেন। শুধু গাইছেন বা বলছেনই না সেগুলো বিশ্বাস করছেন। আর বিশ্বাস করছেন বলেই দেখতে পাচ্ছি মানুষটা ছুটে যাচ্ছেন— দাঁড়াচ্ছেন কানোরিয়ার সংগ্রামী শ্রমিকদের পাশে, প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন জমি দখলের বিরুদ্ধে রাজারহাট-সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে। গানের দুনিয়ায় তিনিই প্রথম যিনি তাঁর কথায় বাংলা গানের সঙ্গে শুয়েছেন। এই তীব্র প্রেমই সম্ভবত (সম্ভবত শব্দটা ব্যবহার করলাম এই কারণেই যে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই) জন্ম দিয়েছে বিপুল সাংগীতিক জ্ঞানের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনায়াসে বলে যেতে পারেন— রবীন্দ্রনাথ থেকে সলিল চৌধুরী, গোপাল উড়ে থেকে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, বড়ে গোলাম থেকে অজয় চক্রবর্তী, পীট সিগার থেকে স্টিভি ওয়ান্ডার— বলে যেতে পারেন এঁদের গান এবং আরও বহুবিধ সংগীতের ধারা প্রসঙ্গে। একটা প্রশ্ন রাখাই যেতে পারে যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের এতবড় জীবন্ত আর্কাইভ আমার এই পোড়া দেশে আর দেখা গেছে কি? অন্তত আমার চোখে তো পড়েনি। এরপর যদি তাঁর নিজের গানের কথাই ধরি তা হলে এত বিপুল বৈচিত্র্যও তো আর কোথাও চোখে পড়েনি যেখানে প্রেম-প্রকৃতি-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-সমকাল-সমাজ সচেতনতা— রাজনীতি-ব্যঙ্গ-শ্লেষ-ক্রোধ-আশাবাদ এমনকী আমার পাশের বাড়ি-চিলছাদও মিলে মিশে একাকার। আবার অনায়াস দক্ষতায় তিনি নিজেই আলাদা করে দিতে পারেন একেকটি গানকে। নির্মাণ হয় ‘সন্ধে হলো’ বা ‘মোমবাতিটা কোথায় গেল’-র মতো নিখাদ অসাধারণ প্রেমের গান। ‘চাঁদের কাস্তে’ ‘বিভূতিভূষণে’ জড়াজড়ি করে আটকে থাকে প্রকৃতি। ‘হাল ছেড়ো না’ ‘কখনও সময় আসে’ জন্ম দেয় এক চিরন্তন আশাবাদের যেখানে ‘গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনস’ আর ‘ফুলমণি’ হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মূর্ত প্রতীক। আর উপরোক্ত সমস্ত বিশেষণগুলিই যেন কোন ম্যাজিক টাচে এক হয়ে মিলেমিশে যায় ‘তোমাকে চাই’ বা ‘জাতিস্মরে’।
শুধু কি গান, কুড়ি বছরের সুমন-যুগে আমরা জন্ম হতে দেখলাম এক নতুন ঘরানার— যা প্রথা ভাঙার, যা নিয়মানুবর্তিতার। আগে বাংলা গানের অনুষ্ঠান বলতেই আমরা বুঝতাম কোঁচানো ধুতি পাঞ্জাবি পরে গায়কের মঞ্চে প্রবেশ, বহুক্ষণ ধরে তবলার ঠুকঠাক, হারমোনিয়ামের প্যাঁ-পোঁ, অতঃপর গায়কের নীরস গম্ভীর বদনে একের পর এক গান গেয়ে চলা। এবার আমরা কী দেখলাম? সুমন স্টেজে ঢোকা মাত্রই নমস্কার অথবা আদাব এবং তত্ক্ষণাৎ অনুষ্ঠান শুরু। গান দিয়েই যে শুরু হবে তার কোনও মানে নেই। কখনও কথা, কখনও গান। আগে আমরা এ দৃশ্য প্রায়শই দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, গায়ক গান গেয়ে চলেছেন আর সামনের সিটে— ‘মণি মাসির ছেলের বিয়েতে মেয়ের বাড়ি থেকে গলার সেটটা কীরকম দিয়েছে’ অথবা ‘রিলায়েন্সের বাজার দরটা কি এ মাসে চড়বে?’ এ জাতীয় আলোচনা অনর্গল চলেছে। সুমনই প্রথম, যিনি বোঝালেন, শুধু বোঝালেন-ই না বিশ্বাস করতে শেখালেন গানকে শ্রদ্ধা করতে হবে। দিতে হবে তার প্রাপ্য মর্যাদা। দর্শকরাও শিখলেন অনুষ্ঠান চলাকালীন অপ্রয়োজনীয় কথা বলার অভ্যাসকে বর্জন করতে। একই সঙ্গে গায়কের সঙ্গেও তাদের একটা যোগাযোগ গড়ে উঠল। কথার পৃষ্ঠে কথা, সরল যুক্তিপূর্ণ মন্তব্যের ধারা গড়ে উঠল। উভয় তরফেই। শুরু হল গানের সঙ্গে কোরাসে গলা মেলানো, অদ্ভুতভাবে সাপোর্ট দিয়ে ধরতাইটা বেঁধে দিলেন ওই একা একটা মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়েই। যা অভিনব আন্তরিক সর্বোপরি সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয়বহনকারী। বন্ধ হল বিপন্ন বিড়ম্বিত সব ঘোষক আয়োজকদের ঘোষণা— ‘আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন, শিল্পী এখনও এসে না পৌঁছনোয় অনুষ্ঠান শুরুতে একটু দেরি হচ্ছে’। সুমনের অনুষ্ঠান সাড়ে ছ’টা মানে সাড়ে ছ’টা। এক ইঞ্চি নড়চড় নেই। এই অসাধারণ নিয়মানুবর্তিতার নাম সুমন। এটা আস্তে আস্তে শ্রোতাদের মধ্যেও চারিয়ে গেল। তৈরি হল একটা আদ্যন্ত সিরিয়াস এবং কমিটেড দর্শকমণ্ডলী। যাদের মধ্যে, খুব সমস্যায় না পড়লে কেউ সুমনের অনুষ্ঠানে দেরিতে প্রেক্ষাগৃহে ঢোকেন না। আর একটা বিষয় এখানে উল্লেখ না করলে অত্যন্ত ভুল হবে— তা হল নাগরিক কবিয়ালের অসামান্য রসবোধ। যারা তাঁর অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে দেখেন অথবা ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত উভয়েরই মানুষটির এই গুণটির সঙ্গে সবিশেষ পরিচয় আছে।
