শিপ্রা বিশ্বাস। অফিসে আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী। অসমসাহসিনী এবং বুদ্ধিমতী। আরও দুয়েকদিনের চেষ্টায় টুকটাক কথাবার্তা চালাতে চালাতে বিশ্বাস অর্জন করে ফেলল উত্তরদাতাদের। কথাবার্তার ফাঁকে উঠে আসা টুকরো টুকরো তথ্যগুলোকে একত্রিত করে সাজানোর পর যা উঠে এসেছিল সেটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং চিন্তায় ফেলে দেবার মতো। যেসব বিদেশিরা এখানে আসেন, বাচ্চাদের কোলে তুলে আদর করেন, দামি দামি চকলেট আর বিস্কুটের প্যাকেট উপহার দেন, মায়েদের হাতে গুঁজে দেন বিশ-পঞ্চাশ-একশো টাকার নোট, তাদের অধিকাংশের উদ্দেশ্য দরিদ্র দেশের গরিবগুর্বো মানুষ আর পথশিশুদের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছি ভেবে সন্তুষ্টি লাভ করা হলেও সবার উদ্দেশ্য কিন্তু অতটা সহজ সরল নয়। ওইসব অঞ্চলের বেশকিছু হোটেলে মোটা অর্থের বিনিময়ে রমরমিয়ে চলে পেডোফাইল চক্র, হোটেল মালিক ম্যানেজার কর্মচারী এবং ওই অঞ্চলের অপরাধ জগতের কুশীলবদের সহায়তায়। কিছুদিন সমীক্ষা চলার পর কোনও কারণ না দর্শিয়ে হঠাৎই মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় প্রজেক্টটা।
কেন?— সেটা আজও অপরিসীম দুর্জ্ঞেয় রহস্য এই অধম প্রতিবেদকের কাছে। পরবর্তীতে বিষয়টা নিয়ে কলকাতায় আর কখনও কোনওরকম কাজ হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। ফলে এই বিষবৃক্ষের চারা এতদিনে মহীরুহে পরিণত হয়েছে কিনা জানা নেই সেটাও। সবচেয়ে মর্মান্তিক যেটা, শিপ্রা যার উপস্থিত বুদ্ধি আর দুঃসাহস ছাড়া এ কাজটা করা সম্ভব হত না কোনওমতেই, মারাত্মক বোন-ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চলে গেছে মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। তাই সম্ভবত একমাত্র আমিই বেঁচে আছি আজও এ শহরে, এক ভয়ংকর এবং একই সঙ্গে হাড় হিম করে দেওয়া ঘটনাক্রমের সাক্ষী হয়ে।
০৬. সুমন কলকাতা
সালটা উনিশশো তিরানব্বই। ছোট বোন সবে কলেজে পড়ানোর চাকরিটা পেয়েছে। পোস্টিং মেদিনীপুরে। উইক এন্ডে বাড়ি ফেরে। এমনিতে প্রতি সোমবার ভোরের ট্রেনে কাজের জায়গায় ফিরে গেলেও সেবার কোনও একটা জরুরি কাজে আটকে পড়ায় সকালে আর ফেরা হয়নি। ফলে যে করে হোক সন্ধ্যার ট্রেন ধরে কর্মস্থলে ফিরে পরদিন জয়েন করাটা অত্যন্ত জরুরি। সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশের মুখ গোমড়ানো। মাঝে মাঝেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। এই দুর্যোগে ওকে একা ছাড়ার ভরসা না পেয়ে ট্রেনে তুলে দিতে হাওড়ায় যাওয়া। তুলে দিয়ে ফেরার পথে বৃষ্টিটা আরও ঝাঁপিয়ে কাঁপিয়ে নামল। সঙ্গে প্রবল দমকা হাওয়া। এর মধ্যেই কোনও মতে বাড়ি ফেরার বাসটা পেয়ে গেলেও হঠাৎ মাঝপথে ধর্মতলায় নেমে পড়লাম। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই কাজের জায়গায়… চেনাজানা মহলে… বন্ধুদের আড্ডায় টুকরো টুকরো সংলাপ, কিছু মন্তব্য এবং প্রশ্ন…-র গান শুনেছিস?… একদম অন্যধরনের… অনুষ্ঠান দেখেছিস?… টিকিটই পাওয়া যায় না! এই ধরনের কথাবার্তা এবং তার ফলে আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠা কৌতূহল… সব মিলিয়ে একটা বেদম বেহাল অবস্থা আমাকে কীরকম একটা ঘোর-লাগা, ভূতগ্রস্থ অবস্থায় ওই প্রবল বর্ষণের রাতে মাঝপথে নামিয়ে দিল। মেট্রো সিনেমার ঠিক পাশেই ব্যাপক পরিচিত মিউজিক ক্যাসেটের দোকানটিতে কাকভেজা বললেও কম বলা হয় এমন অবস্থায় গিয়ে ঢুকে পড়লাম। সাধারণ অবস্থায় ওই দোকানটিতে খদ্দেরের ভিড়ে তিলধারণের জায়গা থাকে না। কিন্তু সেদিন একেবারে ফাঁকা। বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাড়ি ফেরার চিন্তায় উদ্বিগ্ন কাউন্টার সেলসম্যানরা আমাকে দেখে কিছুটা চমকেই গেলেন। আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, সুমনের গানের ক্যাসেট আছে? তখনও ক্যাসেটের টাইটেল জানি না। ওদের মধ্যে একজন বিনা বাক্যব্যয়ে আমার হাতে ক্যাসেটটি এনে দিলেন। অন্ধকারের মাঝখানে আবছা মায়াবী নীল আলোয় গিটার হাতে শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখ। ক্যাসেটের নাম ‘তোমাকে চাই’। তখনও মোবাইল যুগ শুরু হয়নি। ফলে ওই অবস্থায় বেশ দেরিতে বাড়ি ফিরে মাতৃদেবী ও অর্ধাঙ্গিনীর চোখা চোখা বাক-মিসাইলের ঝাঁকের মধ্যে দিয়ে কোনওমতে বাথরুমে গিয়ে-বেরিয়ে এসে এবং নিজেকে ডিফেন্ড করার ন্যূনতম প্রচেষ্টা না করে মিউজিক সিস্টেমের মধ্যে ক্যাসেটটা ঢুকিয়ে যখন প্লে-বাটনে আঙুলটা চাপলাম তখন উভয় প্রতিপক্ষই খানিকটা হতভম্ব এবং বাকরুদ্ধ। এরপর কী ঘটল এটা এককথায় বলতে গেলে আমাকে তারাপদ রায়ের কাছে একটি লাইন ধার করতেই হচ্ছে— ওই বর্ষণমুখর কালো রাতেও ‘নীল দিগন্তে তখন ম্যাজিক!’ হালকা তরঙ্গের মতো সিন্থেসাইজারের সুর। মেঘমন্দ্র ব্যারিটোন ভয়েস। আর গানের কথা— আমার মতো পাতি মধ্যবিত্তর গান শোনার অভিজ্ঞতার অ্যাকোয়ারিয়ামটা যেন কোন সাংঘাতিক কালাপাহাড়ের আঘাতে নিমেষে ভেঙে চুরমার। এ যেন মহাসমুদ্রে গিয়ে পড়া। কিছুই মিলছে না আবার যেন খুব কাছের। যখন শুনছি— ‘চৌরাস্তার মোড়ে-পার্কে দোকানে/শহরে-গঞ্জে-গ্রামে-এখানে ওখানে/স্টেশন-টার্মিনাস-মাঠে-বন্দরে/অচেনা ড্রয়িংরুমে চেনা অন্দরে/বালিশ-তোষক-কাঁথা-পুরনো চাদরে/ঠান্ডা শীতের রাতে লেপের আদরে’— আমার ভীষণ পরিচিত এই শহরটা কখনও না পড়া একটা বইয়ের মতো পাতায় পাতায় খুলে যাচ্ছিল চোখের সামনে। মনে হচ্ছিল এ তো আমারই কথা, কী ভয়ংকর রকম চেনা অথচ কখনও শুনতে পাইনি অথবা বলতে পারিনি। অন্য কেউও শোনাতে অথবা বলতে পারেননি। সেই রাতে দুটো ঘটনা ঘটেছিল— এক) তুচ্ছ কারণে স্ত্রীর সঙ্গে বেশ কয়েকদিন ধরে চলা ঝগড়ার কিঞ্চিৎ প্রেমময় সমাপ্তি। দুই) ওই একটাই গান বারবার বাজিয়ে চলেছিলাম যতক্ষণ না পাশের ঘর থেকে মা তার পেটেন্ট পূর্ববঙ্গীয় টানে মৃদু ধমক দেন— ‘অরে, এইবার বন্ধ কর। ক্যাসেটটা তো খারাপ হইয়া যাইব’— ‘তোমাকে চাই’ বন্ধ হয়নি। রাতের ঘড়ি তখন দুটোর কাঁটা ছাড়িয়েছে। এখানে একটা কথা বলা দরকার— ওই একটা গানই বারবার বাজিয়ে শুনছিলাম কারণ পরেরগুলি শুনে ওঠার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছিলাম না। কী জানি যদি এইরকম ভাল না হয়। যদি মোহভঙ্গ ঘটে। কারণ একটি অথবা দুটি মহৎ সৃষ্টির পর মান পড়ে গেছে এমন উদাহরণ অন্তত সাহিত্যে অথবা চলচ্চিত্রে কম নেই। যাইহোক এক-আধদিনের জড়তা-ভয় কাটিয়ে সেই বিশাল সাংগীতিক মহাসমুদ্রে ডিঙি নামিয়েছিলাম। অনেকটা সেই হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’-র নায়কের মতো। আর জালে উঠে এল একের পর এক— ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’, ‘দশ ফুট বাই দশ ফুট’, ‘কখনও সময় আসে’, ‘গড়িয়াহাটার মোড়’-এর মতো অতিকায় সব প্রাগৈতিহাসিক মাছ। ততদিনে বাইশ গজের পিচে দাঁড়িয়ে ভিভ রিচার্ডসের অনায়াস ভঙ্গিতে রাজকীয় ছয় মারার মতো শ্রোতাদের গ্যালারিতে এসে পড়ছে ‘বসে আঁকো’, ‘ইচ্ছে হল’-র মতো জাদুমাখানো বল। শুরু হচ্ছে আরও নতুন আরও সাম্প্রতিক কিছুর জন্য প্রতীক্ষা।
