শম্ভুভাই, ময়দানে শুকনো নেশার কারবারি। বয়স আশির কোঠায়। সর্বক্ষণ গাঁজার নেশায় রক্তলাল দুটো চোখ। গুঁড়িগুঁড়ি করে ছাঁটা চুল। হাতে মোটা তামার বালা। পেশিবহুল চেহারা বয়সের কারণে একটু ভারীর দিকে। তবে দেখলেই বোঝা যায় একসময় প্রচণ্ড তাগদ রাখত শরীরে। শম্ভুভাই। লুঙ্গির গেঁজে সবসময় দশ বারোটা গাঁজার পুরিয়া। লোকাল আর মণিপুরি। মণিপুরির দাম বেশি। ময়দানে ফিসফাস জনশ্রুতি ছিল লোকটা আসলে নাকি একসময়ের উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত ডাকাত। বহু খুন আর ডাকাতির কেসে ফেরার হয়ে পালিয়ে এসেছে এখানে। অতঃপর অগতির গতি এই গাঁজার কারবার। সত্যিমিথ্যে যাচাই করে দেখা হয়নি কোনওদিন। এই অধম প্রতিবেদক আর তার কয়েকজন বন্ধুকে খুব ভালবাসত শম্ভুভাই। মাঝেমধ্যেই তুরীয় আনন্দের সন্ধানে ঢুঁ মারতাম ওর কাছে। মনে আছে তীব্র গরমকালের এক রাতে শম্ভুপ্রসাদ প্রাপ্ত হয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম মোহনবাগান মাঠের পিছনে র্যামপার্ট ঘেঁষা রাস্তাটা ধরে। গা ছমছমে পরিবেশ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিস্তব্ধ চারপাশ। মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের আড়ালে মৃদু শাড়ির খসখস। হালকা চুড়ির আওয়াজ। ফিসফিসে গলার আহ্বান— ‘বসবে?’ ইতিউতি ঘোরাফেরা করা সন্দেহজনক চেহারার সব ছায়ামানুষ। এবড়ো খেবড়ো মেঠো অসমান রাস্তা। টাল খেতে খেতে রেড রোডের মোড় টপকে ঢুকে পড়েছিলাম ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের গা ঘেঁষে। লোহার ব্যারিকেডে ঘেরা জীর্ণ প্যাটন ট্যাঙ্ক। ঘাসে ঝিঁঝির ডাক। কয়েকদিন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির আঙুলডোবা জলে কুনো ব্যাঙের কটকট। গাছের আড়াল থেকে রোজগারের ধান্দায় রাত জাগা বৃহন্নলাদের খোনাখোনা গলার ডাক, ফটাফট হাততালি… অনেকটা দূরে মায়াবী আলোয় আলোয় ভেসে যাচ্ছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল… ঘোরলাগা চোখে দেখতে দেখতে অনেকটা হেঁটে এসে হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম বিশাল বিশাল বট, অশথ আর পাকুড় গাছে ঘেরা ঘাসজমিটার সামনে। ধক্ করে উঠেছিল বুকটা! যে ময়দান নিরাশ্রয়, বেকার, বাতিল হয়ে যাওয়া মানুষজনের মাথার ওপর ছায়া জোগায়… রুটিরুজির ব্যবস্থা করে কতজনের… সেই ভোর থাকতে উঠে ময়দানে চলে আসা হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে স্বপ্ন দেখায় রোজ… সেই ময়দানেই আজ থেকে অনেকগুলো বছর আগে… সেই সত্তরের দশকে এক কাকভোরে এক কবির স্বপ্নদর্শী চোখদুটোকে বরাবরের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল ঘাতকেরা। ঠিক এই গাছগুলোর নীচে। সেই স্বপ্ন হননের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এইসব আদিম মহাবৃক্ষরাজি। বহু প্রেম, আশা, নিরাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের আবাসভূমি হয়ে শহরের বুকে জেগে রয়েছে কলকাতা ময়দান। আজও।
০৫. পেডোফাইল কলকাতা
সময়টা উনিশশো তিরানব্বই কি চুরানব্বই। বম্বে হেডকোয়ার্টার থেকে কলকাতার অফিসে এসেছিল প্রজেক্টটা। একদিন সকালে অফিসে ঢুকতেই সোস্যাল রিসার্চ ডিভিশনের ব্রাঞ্চ চিফ ড. অর্না শীল, ডেকে পাঠালেন ওনার ঘরে। “পেডোফাইল সম্পর্কে কিছু জানো?” পেডোফাইল? জীবনে প্রথমবার শুনলাম শব্দটা। অগত্যা ঘাড় নেড়ে জানাতেই হল অজ্ঞতার কথা। “বসো” সামনে চেয়ারটার দিকে ইশারা করলেন অর্নাদি। অতঃপর সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলেন ব্যাপারটা।
পেডোফাইল মানে বিকৃতকাম এক ধরনের মানুষ, যারা শিশুদের তাদের বিকৃত যৌনলালসার শিকার বানায়। এদের অধিকাংশই এদেশে ঘুরতে আসা বিদেশি এবং স্বভাবতই ধনী। ভারতে এদের মূল বিচরণক্ষেত্র গোয়া। সেখানে রীতিমতো একটা অপরাধচক্র গরিবগুর্বো ঘরের বাচ্চাদের অভিভাবকদের পয়সার টোপ ফেলে, ফুসলেফাসলে, প্রয়োজনে জোর খাটিয়ে তুলে এনে চালান করে দেয় স্থানীয় হোটেল, রিসর্ট আর ফার্ম হাউসগুলোয়। এর ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে গোয়ার শৈশব। একটা আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ সংস্থা সমগ্র গোয়া জুড়ে কাজ করছে এর বিরুদ্ধে। তারাই আমাদের সংস্থাকে বরাত দিয়েছে চারটে মেট্রো শহর সমেত হায়দ্রাবাদ আর বেঙ্গালুরুতে এ বিষয়ে একটা সমীক্ষা চালানোর জন্য। মনে রাখতে হবে যে সময়ের কথা বলছি তখনও পরিচালক মধুর ভাণ্ডারকরের ‘পেজ থ্রি’ (পেডোফাইল চক্রের কার্যকলাপ বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছিল সিনেমাটিতে) মার্কেটে রিলিজ করতে অন্তত বছর পনেরো বাকি। গুগুল সার্চ তো কোন দূরের গ্রহ। অর্নাদির দেওয়া এতটুকু তথ্যের ভিত্তিতে কতদূর এগোনো সম্ভব? কিন্তু কিছু করার নেই। নামী ফান্ডিং এজেন্সির প্রজেক্ট কনসাইনমেন্ট। রিপোর্ট তো পাঠাতেই হবে। কাজটা হাতে নিয়েই টার্গেট এরিয়া হিসেবে প্রথমেই বেছে নিলাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, রিপন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্ক্যুইস স্ট্রিট… এইসব অঞ্চলকে। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদর স্ট্রিট এলাকা। কলকাতা জাদুঘরের গা ঘেঁষে সোজা গিয়ে মিশেছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। ছোট, বড়, মাঝারি… প্রচুর হোটেলের ছড়াছড়ি গোটা এলাকা জুড়ে। শয়ে শয়ে বিদেশির আনাগোনা নিত্যরোজ। কিছুক্ষণ ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করলেই চোখে পড়তে বাধ্য দৃশ্যটা। ফুটপাথের ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু দরিদ্র শ্রেণির মহিলা। পেশা ভিক্ষাবৃত্তি। প্রত্যেকের কোলে কাঁখে একটা দুটো করে বাচ্চা। কিন্তু স্বদেশি মানুষজনের কাছে ভিক্ষে চাইতে তেমন একটা উত্সাহী নয় কেউই। সেই আপাতনিস্পৃহ ভাবটাই মুহূর্তে কেটে যাচ্ছে বিদেশি-বিদেশিনীদের দেখামাত্র। বিগলিত হেসে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদেশিদের কোলে তুলে দিচ্ছে বাচ্চাদের। আশেপাশে দাঁড়ানো খুদেগুলোও ছুটে গিয়ে হাতজামার খুঁট ধরে ঝুলে পড়ছে সাহেব মেমসাহেবদের। ওরাও কোলে তুলে নিচ্ছেন, খুনসুটিতে মাতছেন বাচ্চাদের সঙ্গে। দামি এস এল আর ক্যামেরায় ছবি তুলছেন ঘনঘন। প্রথম দু-তিনদিন স্রেফ নজর করেছিলাম ব্যাপারটা। লক্ষ করেছিলাম ভিখারিনিদের প্রায় সবাই খানিকটা ভাঙাচোরা ইংরেজি জানেন যেরকম— ‘হাই’, ‘হ্যালো’, ‘গুড মর্নিং’, ‘হাউ (আর বাদ) ইউ?’ ‘ভেরি পুওর’, ‘টু মেনি চিলড্রেন’, ‘হাংরি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। বাকিটা বোঝানো হচ্ছে হাত-পা নেড়ে, শরীরী ভাষায়। আরেকটা ব্যাপারও গুরুত্বপূর্ণভাবে লক্ষণীয়, বলার কায়দা বা অ্যাকসেন্টটা অবিকল বিদেশিদের মতো। হয়তো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফল। দিনকয়েক অনুসরণ করার পর একটু একটু করে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলাম। ঘনিষ্ঠতা বলতে বাচ্চাগুলোকে টুকটাক লজেন্স-টফি কিনে দেয়া, মায়েদের সঙ্গে এটা সেটা গল্পগাছা করা… এইসব আর কী। যারা এতে একটু আধটু খুশি হচ্ছিল অর্থাৎ সোশ্যাল রিসার্চের ভাষায় ‘পজিটিভ রেসপন্স’ জানান দিচ্ছিল, তাদের মধ্যে দু’জনকে টার্গেট বা ‘কী রেসপনডেন্ট’ (মুখ্য উত্তরদাতা) হিসেবে বেছে নেয়া হল। অতঃপর শিপ্রার পালা।
