সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আজও হয়তো সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু তথ্য ও তথ্যগত অনুমান উল্লেখ করা যাইতে পারে। গুপ্ত রাজাদের আমলের পর হইতেই, এমন-কি শশাঙ্কের আমলেই, বাঙলার রাষ্ট্ৰীয় অবস্থায় গুরুতর চাঞ্চল্য দেখা দিয়াছিল। প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ চলিতেছিল। তারপর তো প্রায় সুদীর্ঘ এক শতাব্দীরও উপর দুরন্ত মাৎস্যন্যায়ের অপ্ৰতিহত রাজত্ব চলিয়াছে; অন্তর্বাণিজ্য বহির্বাণিজ্য দুইই খুবই বিচলিত হইয়াছিল সন্দেহ নাই, এবং সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিও খানিকটা শিথিল হইয়াছিল। এই অবস্থায় সুবর্ণমুদ্রার অবনতি ঘটা কিছু অস্বাভাবিক নয়, নকল মুদ্রা চলাও অস্বাভাবিক নয়। আর, রৌপ্যমুদ্রার অবনতিও একই কারণে হইয়া থাকিতে পারে। রূপা বাঙলাদেশের কোথাও পাওয়া যায় না; ইহাও হইতে পারে যে, বিদেশ হইতে রূপার আমদানি কোনও কারণে বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু পালসাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুবিস্তৃত হইবার পরও সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন ঘটিল না কেন, রৌপ্যমুদ্রাই বা সগৌরবে ও যথার্থ মূল্যে প্রতিষ্ঠিত হইল না কেন, এ তথ্য অন্যতম বিস্ময়কর। পালরাজাদের আদান-প্ৰদান ও যোগাযোগ ছিল উত্তর-ভারত জুড়িয়া এবং হয়তো দক্ষিণ-ভারতেও; সমসাময়িক কালে অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে সুবর্ণমুদ্রার প্রচলনও ছিল অল্পবিস্তর। আনুমানিক একাদশ শতকে জনৈক বারেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণ কামরূপের রাজা জয়পালের নিকট হইতে (হোন্নাম শতানি নবী) নয়শত সুবর্ণ (মুদ্রা) দান গ্রহণ করিয়াছিলেন, সিলিমপুর লিপিতে এ তথ্য পাওয়া যাইতেছে। অথচ, বাঙলাদেশে তখন সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন একেবারে নাই, পরেও নাই। পাল ও সেনা-বংশের মতন সমৃদ্ধ ও সচেতন রাজবংশ সুবর্ণমুদ্রার প্রচলনে প্ৰয়াসী হইলেন না কেন? বৈদেশিক বাণিজ্যের মধ্যে কি এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাইতে পারে?
খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রারম্ভেই আরবী মুসলমানেরা সিন্ধুদেশ অধিকার করে। ইহাদের পূর্বদিশাভিযান আগেই আরম্ভ হইয়াছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমদেশভিযানও চলিয়াছিল। দেখিতে দেখিতে ইহারা একদিকে স্পেন ও অন্যদিকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব এবং চীনদেশ পর্যন্ত বাণিজ্যপ্ৰভুত্ব বিস্তার করে। ভূমধ্যসাগর হইতে আরম্ভ করিয়া ভারত-মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্বশায়ী দ্বীপগুলি পর্যন্ত যে সামুদ্রিক বাণিজ্য ছিল একসময় রোম ও মিশর-দেশীয় বণিকদের করতলগত সেই সুবিস্তৃত বাণিজ্য-ভার চলিয়া যায় আরব বণিকদের হাতে। অবশ্য একদিনে তা হয় নাই। সপ্তম শতকের মাঝামাঝি হইতেই এই বিবর্তনের সূত্রপাত এবং দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকে আসিয়া চরম পরিণতি। এই বিবর্তন-ইতিহাসের বিস্তৃত উল্লেখের স্থান। এখানে নয়, কিন্তু সংক্ষেপত এই কথা বলা যায়, এই সুবৃহৎ বাণিজ্যে উত্তর-ভারতীয়দের যে অংশ ছিল তাহা ক্রমশ খর্ব হইতে আরম্ভ করে। প্রথম পশ্চিম-ভারতের বন্দরগুলি চলিয়া যায় আরবদেশীয় বণিকদের হাতে, এবং পরে পূর্ব-ভারতের। দক্ষিণ-ভারতীয় পল্লব, চোল ও অন্য ২/১ টি রাজ্য প্রায় চতুর্দশ শতক পর্যন্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখিয়াছিল, কিন্তু পরে তাহাও চলিয়া যায়। মুঘল আমলে তো প্রায় সমস্ত ভারতীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যটাই আরব ও পারস্যদেশীয় বণিকদের হাতে ছিল; সেই বাণিজ্য লইয়াই তো পরে পর্তুগীজ-ওলন্দাজ-দিনেমার-ফরাসী-ইংরেজে কাড়াকড়ি মারামারি।
যাহাই হউক, আমি আগেই দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, এই সামুদ্রিক বাণিজ্য হইতে প্রাচীন বাঙলাদেশে প্রচুর অর্থাগম হইত। গঙ্গাবিন্দর ও তাম্রলিপ্তি হইতে জাহাজ বোঝাই হইয়া মাল বিদেশে রপ্তানি হইত, এবং তাহার বদলে দেশে প্রচুর সুবর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা আমদানি হইত।; এই সুবৰ্ণ রোমক দিনার এবং রৌপ্য রোমক দ্রাহ্ম হওয়াই সম্ভব। খ্ৰীষ্টপূর্ব শতক হইতেই এই সমৃদ্ধির সূচনা দেখা দিয়াছিল এবং সমানে চলিয়াছিল। প্রায় খ্ৰীষ্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত। কিন্তু তারপরেই এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যস্রোতে যেন ভাটা পড়িয়া গেল। ভারতীয় দ্রব্যসম্ভারের কাছে পশ্চিমের সুবিস্তৃত হাট বন্ধ হইয়া গেল। যখন আবার সেই হাট খুলিল তখন বাণিজ্যকর্তৃত্ব চলিয়া গিয়াছে আরব বণিকদের হাতে এবং সেই হাটেরও চেহারা বদলাইয়া গিয়াছে। পশ্চিমের বাজারে যে-সব জিনিসের চাহিদা ছিল তাহাও অনেক কমিয়া গিয়াছে। অন্তত এই সুসমৃদ্ধ বাণিজ্যে বাঙলাদেশের যে অংশ ছিল তাহা যে খর্ব হইয়া গিয়াছে, এ সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। বাঙলাদেশের প্রধান বন্দর ছিল তাম্রলিপ্তি; সেই তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যসমৃদ্ধির কথা সকলের মুখে মুখে, পুঁথির পাতায় পাতায়। সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙ ও ই-ৎসিঙ তাম্রলিপ্তির সমৃদ্ধির বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে বা কোনও হিসাবেই তাম্রলিপ্তির উল্লেখ অষ্টম শতকের পর হইতে আর পাইতেছি না। যে নদীর উপরে ছিল তাম্রলিপ্তির অবস্থিতি পলি পড়িয়া পড়িয়া সেই নদীটির মুখ বন্ধ হইয়া গেল অথবা নদীটি খাত পরিবর্তন করিল। তাম্রলিপ্তির সৌভাগ্য-সূর্য অস্তমিত হইল, এবং আশ্চর্য এই, অষ্টম হইতে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বাঙলাদেশে আর কোথাও সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র গড়িয়া উঠিল না! চতুৰ্দশ শতকে দেখিতেছি। সরস্বতী-তীরবর্তী সপ্তগ্রাম তাম্রলিপ্তির স্থান অধিকার করিতেছে এবং পূর্ব-দক্ষিণতম বাঙলায় নূতন দুইটি বন্দর বেঙ্গলী ও চট্টগ্রাম গড়িয়া উঠিতেছে। সত্যই এই সুদীর্ঘ ছয়-সাত শত বৎসর সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাঙলাদেশের বিশেষ কোনও স্থান নাই। এবং সেই হেতু বাহির হইতে সোনারূপার আমদানিও কম। ভারতের অন্তর্বাণিজ্যে বাঙলার অংশ নিঃসন্দেহে আছে; বাঙলাদেশ বিদেশেও ভারতবর্ষে তাহার বস্ত্ৰসম্ভার, চিনি, গুড়, লবণ, নারিকেল, পান, সুপারি ইত্যাদি রপ্তানি করিতেছে প্রচুর, কিন্তু তাহার নিজস্ব কোনও সামুদ্রিক বন্দর নাই; যেটুকু তাহার অংশ তাহা শুধু আন্তর্দেশিক ব্যাবসা-বাণিজ্যে। সেই সূত্রে সোনারূপার দাম সে পাইতেছে কি না। বলা কঠিন, পাইলেও বোধহয় তাহা আগেকার মতন আর লাভজনক নয়, সুপ্রচুরও নয়। স্বর্ণ-দ্বারা অর্থমান নির্ণয় করিবার মতন ইচ্ছা বা অবস্থা পরবর্তী পাল বা সেন রাষ্ট্রের আর নাই, স্পষ্টতই বোঝা যাইতেছে। অথবা, যেহেতু বৈদেশিক সামুদ্রিক বাণিজ্য র্তাহাদের আর নাই, সেই হেতু স্বর্ণমানের প্রয়োজনও নাই। অথচ পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে দেখিতেছি, সাধারণ গৃহস্থও ভূমি কেনাবেচা করিতেছেন স্বর্ণমুদ্রার সাহায্যে। সেন আমলের শেষ পর্যন্ত অন্তত স্বীকারত রৌপ্যই হয়তো অর্থমন-নিৰ্ণক, কিন্তু তৎসত্ত্বেও পাল আমলে রৌপ্যমুদ্রার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, সেন আমলে মৃত। ভিন্ন প্রদেশের সঙ্গে আদানপ্রদানের জন্যই হয়তো রৌপ্যমান বজায় রাখা প্রয়োজন হইয়াছিল। মুদ্রার অবস্থা যাহাই হউক, এ তথ্য অনস্বীকার্য যে, অষ্টম শতক ও তাহার পর হইতেই ভারতীয় সামুদ্রিক বহির্বাণিজ্যে বাঙলাদেশের আর কোনও বিশেষ স্থান ছিল না, এবং অন্তর্বাণিজ্যে অল্পবিস্তর আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও সেই হেতু বণিককুল ও ব্যবসায়ীদের সমাজে ও রাষ্ট্রে সে প্রভাব ও প্রতিপত্তি আর থাকে নাই। অষ্টম শতক হইতে দেখা যাইবেপরবর্তী এক অধ্যায়ে আমি তাহা দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি— বঙ্গীয় সমাজ ক্রমশ কৃষি-নির্ভর হইয়া পড়িতে বাধ্য হইয়াছে, এবং কৃষকেরাই সমাজদৃষ্টির সম্মুখে আসিয়া পড়িয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে দেখিতেছি, বণিক ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিপত্তিও হ্রাস পাইয়াছে। রাষ্ট্রের অধিষ্ঠানাধিকরণগুলিতে শ্রেষ্ঠী, সার্থবাহ, কুলিক ও ব্যাপারী প্রভৃতিদের যে আধিপত্য পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে দেখা যায় অষ্টম শতকে ও তাহার পর আর তাহা নাই।
