যাহাই হউক, মাৎস্যন্যায়-পর্বের শেষে পালরাজারা যখন দেশে প্রতিষ্ঠিত হইলেন এবং শান্তি ও সুশাসন ফিরিয়া আসিল তখন আবার দেশে রৌপ্যমুদ্রার (এবং সঙ্গে সঙ্গে তাম্রমুদ্রার) প্রচলন যেন ফিরিয়া আসিল। কিন্তু সুবর্ণমুদ্রা আর ফিরিল না। সুবর্ণমুদ্রার ক্রমশ অবনতি ঘটিতে ঘটিতে শেষে যেন একেবারে বিলুপ্ত হইয়া গেল। বস্তুত, পালরাজা ও সেনরাজাদের আমলের একটি সুবর্ণমুদ্রাও বাঙলাদেশে কোথাও আবিষ্কৃত হয় নাই, কিংবা সমসাময়িক সাহিত্যে কোথাও তাহার কোনও উল্লেখও নাই। সপ্তম শতকের পর হইতেই সুবর্ণ দিনার বা যে-কোনও প্রকার সুবৰ্ণমুদ্রা একেবারে অনুপস্থিত। বাঙলা ও বিহারের কোথাও কোথাও “শ্ৰী বি (গ্রহ)” নামাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে; কোথাও কোথাও ঐ নামাঙ্কিত বা কোনও নামাঙ্কন ছাড়া পালযুগীয় তাম্রমুদ্রাও পাওয়া গিয়াছে (যেমন, পাহাড়পুরে)। “শ্ৰী বি (গ্রহ)” পালরাজ প্রথম বিগ্রহপাল; নিকৃষ্ট তাম্রমুদ্রগুলি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিগ্রহপালের আমলেরও হইতে পারে, এমন-কি সমসাময়িক বা পরবর্তী “অন্য কোনও রাজারও হইতে পারে। ঐ নামাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা সাধারণত দ্রাহ্ম (drachm) নামে অভিহিত হইয়া থাকে। ধর্মপালের মহাবোধি লিপিতে দ্রাহ্ম নামক একপ্রকার মুদ্রার উল্লেখ আছে; এই উল্লেখই পাল আমলে দ্রাহ্মী মুদ্রার প্রচলনের প্রমাণ। উক্ত রাজার রাজত্বের ষোলো বৎসরে কেশর নামক এক ব্যক্তি তিন সহস্র দ্রাহ্ম মুদ্রা খরচ করিয়া (ত্রিতয়েন সহস্ৰেণ দ্রাহ্মাণাং খানিতা) একটি পুকুর খনন করাইয়াছিলেন। সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন তো ছিলই না, এবং আবিষ্কৃত মুদ্রগুলি হইতে মনে হয়, রৌপ্যমুদ্রারও যথেষ্ট অবনতি ঘটিয়াছিল। যে অবনতি গুপ্ত-পরবর্তী যুগে দেখা গিয়াছিল, পালরাজারাও সেই অবনতি ঠেকাইতে পারেন। নাই; এমন-কি আবিষ্কৃত তাম্রমুদ্রগুলিও মূল মূল্য বা আকৃতি বা শিল্পীরূপের দিক হইতে অত্যন্ত নিকৃষ্ট। ভাস্করাচার্যের (১০৩৬ শক = ১১১৪ খ্ৰী) লীলাবতী-গ্রন্থে একটি আর্য আছে; কুড়ি কড়া বা কড়িতে এক কাকিনী, চার কাকিনীতে এক পণ, ষোলো পণে এক দ্রাহ্ম (রৌপ্যমুদ্রা), ষোলো দ্রহ্মে এক নিষ্ক। আমরকোষের মতে এক নিষ্ক এক দিনারের সমান, অর্থাৎ ষোলো দ্রহ্মে এক দিনার অর্থাৎ ষোলো দ্রাহ্ম – ষোলো রূপক। দ্রাহ্ম যে রৌপ্যমুদ্রা তাহা হইলে এ সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ থাকিল না। কিন্তু রৌপ্যমুদ্রা হইলে কী হইবে, পাল রৌপ্যমুদ্রা যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের; মূল মূল্য (intrinsic value) এবং বাহ্যরূপ উভয় দিক হইতেই নিকৃষ্ট।
সেন আমলে কিন্তু তাহাও নাই। সুবর্ণমুদ্রা তো দূরের কথা, রৌপ্যমুদ্রাও একেবারে অন্তহিঁত। বস্তুত, ধাতুমুদ্রা প্রচলনের একটা চেষ্টা পাল আমলে যদি বা ছিল, সেন আমলে তাহাও দেখিতেছি না। এই আমলে দেখিতেছি, উর্ধর্বতম মুদ্রামান পুরাণ বা কপর্দক পুরাণ। এই পুরাণ বা কপর্দক পুরাণের একটিও বাঙলাদেশের কোথাও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। সেইজন্যই এই মুদ্রার রূপ ও প্রকৃতি সম্বন্ধে অনুমান ছাড়া আর কোনও উপায় নাই! কেহ কেহ বলেন, যে পুরাণ মুদ্রার আকার ছিল কপর্দক বা কড়ির মতন, সেই মুদ্রাই কপর্দক পুরাণ। দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর মহাশয় এইরূপ মনে করেন এবং বলেন কপৰ্দক পুরাণ রৌপ্যমুদ্রা। এইরূপ মনে করিবার কারণ এই যে, পুরাণ ৩২ রতি বা ৫৮ মাষ পরিমাণের সুবিদিত রৌপ্যমুদ্রা বলিয়া নানা গ্রন্থে কথিত। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, প্রায় প্রত্যেকটি লিপিতেই শত শত পুরাণ-মুদ্রার উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত বাঙলাদেশে একটিও পুরাণ-মুদ্রা পাওয়া গেল না কেন? এবং অন্যদিকে, মিনহাজই বা কেন বলিতেছেন, তুরুষ্কেরা রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন দেখে নাই, হাটবাজারে কড়িরই প্রচলন ছিল? এমনকি রাজার দানমুদ্রাও ছিল কড়ি! এ রহস্যের অর্থ কি এই যে, কপর্দক পুরাণ বা পুরাণ বলিয়া যথার্থত কোনও ধাতু-মুদ্রার অস্তিত্বই সেন আমলে ছিল না, আন্তর্দেশিক ব্যাবসা-বাণিজ্যে মুদ্রার উর্ধর্বতম ও নিম্নতম উভয় মানই ছিল কড়ি? অথবা, কপর্দক-পুরাণ ছিল একটা কাল্পনিক রৌপ্যমুদ্রা মান, এবং এক নির্দিষ্ট সংখ্যক কড়ির মূল্য ছিল সেই রৌপ্যমানের সমান? বহির্বাণিজ্য এবং পরদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্যই কি এইরূপ মান নির্ধারণের প্রয়োজন ছিল? বোধ হয় তাহাই। সুরেন্দ্ৰকিশোর চক্রবর্তী মহাশয় নানা অনুমানসিদ্ধ প্রমাণের সাহায্যে এই ধরনের ইঙ্গিতই করিতেছেন, বলিতেছেন,
“…Payments were made in cowries and a certain number of them came to be equated to the silver coin, the purana, thus linking up all exchange transactions ultimately to silver, just as at present, the silver coin is linked up to gold at a certain ratio.”
গুপ্তযুগের পর অর্থাৎ খ্ৰীষ্ট্ৰীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতক হইতেই মুদ্রার, বিশেষভাবে সুবর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার, এরূপ অবনতি ঘটিল কেন, এই প্রশ্ন অর্থনীতিবিদ এবং ঐতিহাসিক উভয়ের সম্মুখেই উপস্থিত করা যাইতে পারে। প্রথমাবস্থায় সুবর্ণমুদ্রার অবনতি ঘটিল, কিছুদিন গুপ্ত সুবর্ণমুদ্রার নকলও চলিল এবং তারপর একেবারে অন্তৰ্হিত হইয়া গেল! রৌপ্যমুদ্রা সপ্তম শতকেই একবার অন্তহিঁত হইয়া গিয়াছিল, তবে পাল আমলে আবার তাহার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা দেখা যায়, কিন্তু সে চেষ্টা সার্থক হয় নাই। সেন আমলে আর তাহা দেখাই গেল না, এমন-কি তাম্রমুদ্রাও নয়। গুপ্ত আমলে স্পষ্টত স্বর্ণই ছিল অর্থমান নির্দেশক, পাল আমলে রৌপ্য; সেন আমলেও স্বীকারত রৌপ্য, কিন্তু সে রৌপ্য দৃশ্যত অনুপস্থিত। নিম্নতম মান কড়ি সব সময়ই ছিল, এবং ছোটখাটো কেনাবেচায় ব্যবহারও হইত, কিন্তু অর্থমান নির্ণীত হইত সোনা বা রূপায়। সেন আমলে কড়িই মনে হইতেছে সর্বেসর্ব। মুদ্রার এই ক্রমাবনতি কি দেশের সাধারণ আর্থিক দুৰ্গতির দিকে ইঙ্গিত করে? না, রাষ্ট্রের স্বর্ণের ও রৌপ্যের গচ্ছিত মূলধনের স্বল্পতার দিকে ইঙ্গিত করে? মুদ্রার প্রচলন কি কমিয়া গিয়াছিল? সুবর্ণমুদ্রার অবনতি এবং বিলুপ্তি হয়তো Gresham Law দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়; রৌপ্যমুদ্রার অবনতিও কি সেই কারণে? যে ব্যাবসা-বাণিজ্যের উপর, বিশেষ করিয়া বহির্বাণিজ্যের উপর, প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধি নির্ভর করিত, তাহার অবনতি ঘটিয়াছিল। কি? সোনা ও রূপার অভাব ঘটিয়াছিল কি? রাজকোষে সমস্ত সোনা ও রূপা সঞ্চিত হইতেছিল কি?
