কিন্তু স্বর্ণমুদ্রার অনস্তিত্ব। এবং রৌপ্যমুদ্রার অবনতি ও অনস্তিত্ব শুধু বহির্বাণিজ্যের অবনতি ও বিলুপ্তিদ্বারা সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পাল ও সেন আমলে খুব যে নামিয়া গিয়াছিল মনে হয় না। এই দুই আমলের লিপিগুলি এবং সমসাময়িক সাহিত্যরামচরিত, পবনদূত, গীতগোবিন্দের মতন কাব্য, সদুক্তিকর্ণামৃতের মতন সংলকন-গ্রন্থে উদ্ধৃত সমসাময়িক বাঙালী কবিদের রচনা— পাঠ করিলে, নানা বিচিত্ৰ অলংকারশোভিত মূর্তিগুলি দেখিলে, অসংখ্য সুদৃশ্য সুউচ্চ মন্দির-রচনার কথা স্মরণ করিলে, যাগযজ্ঞে পূজানুষ্ঠানে রাজারাজড়া এবং অন্যান্য সমৃদ্ধ লোকদের দানধ্যানের কথা স্মরণ করিলে মনে হয় না লোকের, অন্তত সমাজের উচ্চতর আর্থিক শ্রেণীগুলির, ধনসমৃদ্ধির কিছু অভাব ছিল। মণিমুক্তাখচিত সোনারূপার অলংকারের যে-সব পরিচয় লিপিগুলিতে, সমসাময়িক সাহিত্যে এবং শিল্পে পড়া ও দেখা যায় তাহাতে তো মনে হয় সোনারূপাও দেশে যথেষ্ট ছিল। তৎসত্ত্বেও এই দুই রাজবংশ সুবৰ্ণমুদ্রা, এমন-কি সেনরাজারা রৌপ্য-মুদ্রার প্রচলন করিলেন না। আন্তর্ভারতীয় বাণিজ্য এবং অন্যান্য ব্যাপারে কিসের সাহায্যে নিষ্পন্ন হইত? ভিনদেশীরা তো নিশ্চয়ই কড়ি গ্রহণ করিতেন না!! রাষ্ট্রকে বিনিময়ে সোনা ও রূপা নিশ্চয়ই দিতে হইত। সেন আমলে স্বর্ণ বা রৌপ্য-মুদ্রা কিছুই তো ছিল না; তবে কি বিনিময় ব্যাপারটা সােনা বা রূপার তালের সাহায্যে নিষ্পন্ন হইত? রাজকোষে যে অর্থ সঞ্চয় হইত। তাহাও কি সোনা ও রূপার তাল? আন্তর্ভারতীয় বাণিজ্য, ভিনদেশীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন প্রভৃতি কি রাষ্ট্রের মারফতে বা মধ্যবর্তিতায় নিষ্পন্ন হইত?
মুদ্রা-সংক্রান্ত এইসব অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর ঐতিহাসিক গবেষণার বর্তমান অবস্থায় একরূপ অসম্ভব বলিলেই চলে।
০৭. সংযোজন – ধন-সম্বল
মুদ্রায় সামাজিক ধনের রূপ
প্রাচীন বাঙলায় মুদ্রায় সামাজিক ধনের রূপ কি ভাবে ধরা পড়েছিল, এ-সম্বন্ধে নূতন কিছু তথ্য ইতোমধ্যে জানা গেছে, কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ও অনুসন্ধানের ফলে, কিছু নূতন আলোচনা-বিশ্লেষণের ফলে। এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এখন কিছুটা স্পষ্টতর। সংক্ষেপে এই স্পষ্টতর রূপটির একটু পরিচয় নেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রগঠনের অল্পবিস্তর সার্থক প্রয়াস ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের অল্পবিস্তর বিস্তার ছাড়া মুদ্রা-প্রচলনের প্রয়োজন সাধারণত হয় না; অন্তত ভারতবর্ষের ইতিহাসে তেমন প্রমাণ নেই, তা শীলমোহর মুদ্রিত (Punch-marked) মুদ্ৰাই হোক আর তঙ্কশালার ঢালাই করা (cast) মুদ্রাই হোক। শুধু স্থানীয় হাটবাজারের কেনা-বেচার ব্যাপারেই নয়, বহির্বাণিজ্যের ব্যাপারেও দ্রব্য-বিনিময়ে (exchange by barter) ব্যাবসা-বাণিজ্য চালানো যায়, ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত দুর্লভ নয়। তবে, যে-সমাজে ব্যাবসা-বাণিজ্যিক ব্যাপারে রাষ্ট্রের বা বণিক গোষ্ঠীর (guild) অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত, অন্যার্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের দিক থেকে যে-সমাজ অর্থনৈতিক ব্যাপারে যত বেশি সুবিন্যস্ত ও সুনিয়ন্ত্রিত, সে-সমাজে মুদ্রার প্রচলন তত বেশি। অর্থাৎ,
মুদ্রা-বিনিময়-নির্ভর অর্থনৈতিক জীবনকে সভ্যতার অন্যতম দ্যোতক বলে মনে করা হয়। বাঙলাদেশে প্রাচীনতম ধাতুর (তামা) মুদ্রা পাওয়া গেছে। প্রত্নোৎখনন বা প্রত্নানুসন্ধানের ফলে, উত্তরবঙ্গের মহাস্থান (বগুড়া জেলা) ও বাণগড়ে (দিনাজপুর জেলা), আর পাওয়া গেছে নিম্নগাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গের তমলুক (মেদিনীপুর) ও চন্দ্ৰকেতুগড়ে (২৪ পরগনা)। উভয় অঞ্চলেই শীলমোহর-মুদ্রিত এবং ঢালাই করা, দু’রকমের মুদ্রাই পাওয়া গেছে। প্রত্নখননের সংস্তরের (stratification) সর্বত্র খুব সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত নয়, তবু মোটামুটি বলা চলে, ঢালাই-মুদ্রা থেকে শীলমোহরিত মুদ্রা প্রাচীনতর এবং এই মুদ্রার প্রচলন বহুদিন অব্যাহত ছিল। গাঙ্গেয় উত্তরভারতে যে-সব জায়গায় এই দুই জাতীয় মুদ্রাই পাওয়া গেছে, সে-সব জায়গায়, যেমন, হস্তিনাপুরে, দিল্লীর পুরানো কেল্লায়, কৌশাম্বীতে, উজ্জয়িনীতে, এই দুই মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। (একমাত্র প্রমাণ, প্রত্ন-সংস্তরের সাক্ষ্য) মোটামুটি খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে। প্রাচীন বাঙলায় তা হয়েছিল বলে মনে হয় না। বস্তুত প্রত্নসংস্তরের সাক্ষ্য থেকে এই দুই জাতীয় মুদ্রারই প্রচলন শুরু খ্ৰীষ্টপূর্ব মোটামুটি ৩২৫-৩০০-র আগে হয়েছিল বলে অনুমান করবার কোনও কারণ নেই। অন্যতর সাক্ষ্যের ইঙ্গিতও একই। মহাস্থানে মৌর্য-ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা যে ভগ্নাংশ-লিপিটি পাওয়া গেছে তাতে দুই মূল্যের দুটি মুদ্রার উল্লেখ আছে, একটি গণ্ডক, আর একটি কাকনিক (= অর্থশাস্ত্রোক্ত কাকনিকা)। এই মুদ্রা দুটির স্বরূপ কী ছিল জানবার উপায় নেই। এ দুটি কি ধাতুমুদ্রা না। আর কিছু, তা-ও নিশ্চয় করে বলবার উপায় নেই। শুধু এইটুকু আমাদের জানা আছে, বাঙলাদেশে কিছুদিন আগেও প্রচলিত ছিল চার কড়িতে এক গণ্ডা, আর কৌটিল্য ও অন্যান্য সাক্ষ্য থেকে বলা যায়, এক কাকনিক ছিল বিশ কড়ির সমান মূল্য। এই একান্ত ঐতিহ্যবাহিত, পরম্পরাগত আর্যগণনা থেকে হয়তো বলা যায়, প্রাচীন বাঙলায় কড়িই ছিল নিম্নতম দ্রব্যমূল্যমান,* এবং সেই মান দ্বারাই নির্ণীত হতো উচ্চতর মুদ্রামান। আমার নিজের ধারণা, গণ্ডক ছিল শীলমোহরিত নিম্নতম মুদ্রা, আর কাকনিক ছিল ঢালাই করা তাঙ্কশালার মুদ্রা। অনুমান করা চলে, মৌর্য আমল থেকে শুরু করে বেশ-কিছুকাল এই দুই মুদ্রারই প্রচলন ছিল বাঙলাদেশে। খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর তৃতীয়পদে অজ্ঞাতনামা গ্ৰীক গ্রন্থকারের লেখা Periplus গ্রন্থে বলা হয়েছে, দক্ষিণতম বঙ্গের গঙ্গা (Ganga) বন্দরে সমসাময়িক কালে Caltis নামে এক সুবৰ্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল। এই উক্তির ঐতিহাসিক যাথার্থ কতটুকু, বলা কঠিন। বাঙলাদেশে এই সময়ে সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন ব্যাখ্যা করা একটু মুশকিল। তবে, এমন হতে পারে, কেউ কেউ তা বলেওছেন, এই Calitis। কুষাণ সম্রাটদের প্রচলিত সুবর্ণমুদ্রা। কুষাণেরা যে এই সময় বারাণসী পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন, এবং তাদের আধিপত্যের প্রভাব যে পূর্বভারতেও বিস্তৃতিলাভ করেছিল, এ-সম্বন্ধে অন্য সাক্ষ্যপ্রমাণও বিদ্যমান।
