কিন্তু বিনিময়-বাণিজ্যও (trade by barter) সঙ্গে সঙ্গে ছিল না, একথাও বলা চলে না। Periplus-গ্রন্থে ভারতীয় বহির্বাণিজ্যের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাহাতে তো মনে হয়, এই বাণিজ্য পণ্য-বিনিময়েও মাঝে মাঝে চলিত। বংশীদাস ও মুকুন্দরামের যে সাক্ষ্য আগে একাধিক বার উল্লেখ করিয়াছি তাহা হইতেও প্রমাণ হয় যে, মধ্যযুগেও এই বিনিময় বাণিজ্য বহির্বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ম ছিল। টেভারনিয়ারের যে সাক্ষ্য ত্রিপুরাদেশাগত সোনা সম্বন্ধে আগে উল্লেখ করিয়াছি, তাহাতে তো দেখা যায়, অন্তর্বাণিজ্যেও এই ব্যবস্থা কতকটা প্রচলিত ছিল। এই দুটি সাক্ষ্যই মধ্যযুগীয়; তবু মনে হয় প্রাচীন ধারা কিছুটা মধ্যযুগেও অক্ষুঃ ছিল। তবে বিনিময় বাণিজ্যই যে একমাত্র নিয়ম ছিল না। তাহা খ্ৰীষ্টীয় শতকের আগে হইতে সমৃদ্ধ মুদ্রাপ্ৰচলন হইতেই সুপ্রমাণিত হয়।
০৬. মুদ্রায় সামাজিক ধনের রূপ
কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের আলোচনা শেষ হইল। এগুলি সমস্তই সামাজিক ধনসম্পদের বনিয়াদ; এই তিন উপায়েই দেশের অর্থোৎপাদন হইত। মুদ্রায় এই অর্থের রূপান্তর কিরূপ ছিল দেখা প্রয়োজন।
মুদ্রায় সামাজিক ধনের রূপ
বিনিময়ের জন্য মুদ্রার ব্যবহার অর্থনৈতিক সভ্যতার দ্যোতক। খ্ৰীষ্ট্ৰীয় শতকের আগে হইতেই বাঙলাদেশে মুদ্রার প্রচলন দেখা যায়। মহাস্থানের শিলাখণ্ডের লিপিটিতে গণ্ডক নামে একপ্রকার মুদ্রার প্রচলন দেখিতে পাইতেছি। এই মুদ্রা সোনা রূপার, বলার কোনও উপায় নাই। তবে বহু পূৰ্ববতী কালের ‘গণ্ডা” গণনা রীতির সঙ্গে যে এই গণ্ডক মুদ্রার একটা শব্দতাত্ত্বিক সম্বন্ধ ছিল এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। এই গণ্ডক মুদ্রার চেহারা যে কিরূপ ছিল তাহাও আমরা কিছু জানি না। কেহ কেহ মনে করেন, মহাস্থান লিপিতে ‘কাকনিক’ নামে আর একপ্রকার মুদ্রারও উল্লেখ আছে। এই মুদ্রারও রূপ, মূল্য বা ওজন সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না। গণ্ডকের সঙ্গে ইহার সম্বন্ধ যে কী ছিল তাহাও বলা যায় না। পেরিপ্লাস-গ্রন্থে খবর পাওয়া যাইতেছে, গঙ্গা-বন্দরে ক্যালটিস (Calitis) নামে একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল; ইহা তো খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতকের কথা। কেহ কেহ মনে করেন, Calitis। সংস্কৃত ‘কলিত’ অর্থাৎ সংখ্যাঙ্কিত শব্দেরই রূপান্তর। পেরিপ্লাস-গ্রন্থের সম্পাদক মনে করেন Calitis এবং দক্ষিণ-ভারতের Kalais, একই মুদ্রা। ভিনসেন্ট স্মিথ তো বলেন, Kalais নামেও বাঙলাদেশে একপ্রকার মুদ্রার প্রচলন ছিল। কনকলাল বড়ুয়া মনে করেন, আসামের ‘কলিত বণিকেরা একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করিত, তাহার নাম ছিল। Kallis। বোধহয় ইহারও আগে এক ধরনের নানা চিহ্নাঙ্কিত (punch marked) রৌপ্য ও তাম্র-মুদ্রার বিস্তৃত প্রচলন ছিল বাঙলাদেশে। চব্বিশ পরগনার নানা প্রত্নস্থানে, রাজশাহীর ফেটুগ্ৰাম, মৈমনসিংহের ভৈরববাজার, মেদিনীপুরের তমলুক এবং ঢাকার উয়াড়ী প্রভৃতি স্থানে এই ধরনের সীসা, রৌপ্য ও তাম্র-মুদ্রা প্রচুর আবিষ্কৃত হইয়াছে; ইহাদের সঙ্গে ভারতবর্ষের নানাস্থানে প্রাপ্ত এই জাতীয় মুদ্রার নিকট আত্মীয়তা সহজেই ধরা পড়ে। সেই হেতু, সর্বভারতীয় সাধারণ অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে বাঙলার একটা যোগাযোগ ছিল এই অনুমান হয়তো নিতান্ত মিথ্যা না-ও হইতে পারে। কুষাণ আমলের দুই-চারিটি স্বর্ণমুদ্রাও বাঙলাদেশে পাওয়া গিয়াছে। বাঙলাদেশ কখনও কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না; কাজেই অনুমান হয়, বুকুতুবপদেশে বা অন্য কোনও উপায়ে কিছু কিছু কুষাণ স্বর্ণমুদ্রা বাঙলাদেশে আসিয়া উত্তর-বঙ্গ গুপ্ত-সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল এ তথ্য সুবিদিত। সেই আমলে গুপ্ত মুদ্রারীতি বাঙলাদেশে বহুল প্রচলিত ছিল। এই মুদ্রা ছিল প্রধানতম সুবর্ণ ও রৌপ্যের; স্বন্দগুপ্তের আমলে গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার ওজন ছিল ১৪২ মাষের কাছাকাছি, এবং রৌপ্যমুদ্রার ওজন একটি রৌপ্য কাৰ্যাপণের প্রায় সমান অর্থাৎ ৩৬ মাষ। পূর্ববর্তী সম্রাটদের কালে স্বর্ণমুদ্রা ওজনে আরও কম ছিল। যাহাই হউক, গুপ্ত আমলে এই দুই মুদ্রাই যে বাঙলাদেশে প্রচলিত হইয়াছিল। তাহার লিপি-প্রমাণ প্রচুর; বিনিময়-মুদ্রা হিসাবে এই মুদ্রাই ব্যবহৃত হইত। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টোলীগুলিতে ভূমির মূল্য দেওয়া হইয়াছে (স্বর্ণ) দিনারে (denarious aureus)। প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রাই যে ছিল দিনার, তাহা ইহাতেই সপ্রমাণ। রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল রূপক। দৃষ্টান্তস্বরূপ বৈগ্রাম পট্টোলীর উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই লিপি হইতেই প্রমাণ হয় যে, আটটি রূপক মুদ্রা অর্ধ-দিনারের সমান, অর্থাৎ ষোলোটিতে এক দিনার। প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালে (ধনাইদহ, দামোদরপুর ও বৈগ্রাম পট্টোলীর কালে) এক স্বর্ণ দিনারের ওজন ছিল ১১৭-৮ হইতে ১২৭-৩ মাষ পরিমাণ, এবং এক রূপকের ওজন ছিল ২২•৮ হইতে ৩৬.২ মাষ পরিমাণ। ইহা হইতে সোনার সঙ্গে রূপার আপেক্ষিক সম্বন্ধের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহাতে মনে হয়, রূপার আপেক্ষিক মূল্য সোনা অপেক্ষা অনেক বেশি ছিল। খুবই আশ্চর্য ব্যাপার সন্দেহ নাই, কিন্তু ইহার কারণ বর্তমানে যে ঐতিহাসিক উপাদান আমাদের হাতে আছে তাহার মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। হইতে পারে, দেশে রৌপ্যের অপ্রতুলতাই ইহার কারণ, অথবা কোনও-না-কোনও কারণে দেশে রৌপ্যের আমদানি বন্ধ হইয়া গিয়াছিল, অথবা পট্টোলীগুলির মধ্যে আমরা যে স্বর্ণ দিনারের উল্লেখ দেখিতেছি তাহার যথার্থ স্বর্ণমূল্য (intrinsic value) অনেক কম ছিল, অর্থাৎ সুবর্ণমুদ্রার স্বর্ণগত অবনতি ঘটিয়াছিল। (debasement)। দেখিতেছি, গুপ্ত আমলের অব্যবহিত পরেই বাঙলাদেশে যখন স্ব স্ব প্রধান ছোট ছোট রাজবংশের স্বতন্ত্র আধিপত্য চলিতেছে তখন রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন একবারে নাই, অথচ স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন অব্যাহত, এবং এই স্বর্ণমুদ্রার যথার্থ মূল স্বর্ণমূল্য অনেক কম; ইহা অবনত (debased) স্বর্ণমুদ্রা, যদিও ওজনে তাহা কমে নাই। বাঙলাদেশের বহু স্থানে কিছু কিছু গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। তাহার কিছু সাধারণ সরকারী গ্রন্থশালায় রক্ষিত, কিন্তু ব্যক্তিগত সংগ্রহে যাহা আছে তাহার সংখ্যাও কম নয়। ১৭৮৩ খ্ৰীষ্টাব্দে কালীঘাটে প্রায় ২০০ (গুপ্ত?) সুবর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়াছিল। কিন্তু তাহার অধিকাংশই গলাইয়া ফেলা হইয়াছিল। গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে যশোহরের মহম্মদপুরে, হুগলিতে ও হুগলি জেলার মহানাদে। গুপ্ত রৌপ্য ও তাম্র-মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। যশোহরের মহম্মদপুরে, বর্ধমান জেলার কাটোয়ায়। ‘নকল গুপ্তমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে উপরোক্ত মহম্মদপুরে, ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায়, ঢাকা জেলার সাভার গ্রামে এবং রংপুরে। বাঙলাদেশের নানা জায়গায় শশাঙ্ক, জয় (নাগ?), সমাচা (র দেব?) এবং অন্যান্য রাজার নামাঙ্কিত এই ধরনের কিছু কিছু সুবর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। রৌপ্যমুদ্রা একেবারেই নাই। আশ্চর্যের বিষয় এই গুপ্ত আমলেও, যখন স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্রমুদ্রা বহুল প্রচলিত, তখনও মুদ্রার নিম্নতম মােন কিন্তু কড়ি। চতুর্থ শতকে ফাহিয়ান বলিতেছেন, লোকে ক্রয়বিক্রয়ে কড়িই ব্যবহার করিত, এবং নিম্নতম মান কড়ি একেবারে উনবিংশ শতক পর্যন্ত কোনও দিনই ব্যবহারের বাইরে চলিয়া যায় নাই। চর্যাপদ (দশম-একাদশ শতকগুলিতে) দেখিতেছি, কবাডি (কড়ি) এবং বোডির (বুড়ি) ব্যবহার। মিনহাজ উদ্দীন তুরস্কাভিযানের বিবরণ দিতে গিয়া বলিয়াছেন, অভিযাত্রী তুরষ্কেরা বাঙলাদেশে কোথাও রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন দেখিতে পান নাই; সাধারণ ক্রিয়-বিক্রয়ে লোকে কড়িই ব্যবহার করিত। এমন-কি রাজাও যখন কাহাকেও কিছু দান করিতেন, কড়ি দ্বারাই করিতেন; লক্ষ্মণসেনের নিম্নতম দান ছিল এক লক্ষ কড়ি। ত্ৰয়োদশ শতকেও কড়ির প্রচলনের সাক্ষ্য অন্যত্ৰ পাইতেছি। পঞ্চদশ শতকে মা-হুয়ান একই সাক্ষ্য দিতেছেন, মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য এবং বিদেশী পর্যটকদের সাক্ষ্যও একই প্রকার। এমন-কি। ১৭৫০ খ্ৰীষ্টাব্দে ইংরাজ বণিকেরাও দেখিয়াছেন, কলিকাতা শহরে কর আদায় হইত। কড়ি দিয়া; বাজারে অনেক ক্ৰয়-বিক্রয়ও কড়ির সাহায্যেই হইত।
