অজ্ঞানাচীয়তে কর্ম জন্মনঃ কর্ম কারণ [ম]
জ্ঞানান্ন চীয়তে [কর্ম কর্মভাবান্ন জায়াতে]
ইহা একটি বৌদ্ধ সূত্র। এর পরেই দক্ষিণতম প্রান্তে লেখা আছে :
মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তস্য রক্তমৃত্তিকা বাস [ত ব্যস্য]
এবং তার পরেই বাম প্রান্তে ও পার্থে আছে :
সর্বেণ প্রকারেণ সবস্মিন সর্বথা স (র) কাব-সিদ্ধ যাত রি] [ঃ] সন্তু।
এই মহানাবিক বুদ্ধগুপ্ত পণ্ডিতমহলে সুপরিচিত; লিপিটি বহু আলোচিত। বুদ্ধগুপ্তের বাড়ি ছিল রক্তমৃত্তিকায়। সিদ্ধযাত্র ও সিদ্ধযাত্ৰা কথাটি লইয়া বহু তর্কবিতর্ক হইয়াছে। বেশির ভাগ তর্ক নিরর্থক। কথাটি এ পর্যন্ত এই দেশ ও দ্বীপগুলির অন্তত সাতটি প্রাচীন লিপিতে পাওয়া গিয়াছে। সিদ্ধযাত্রিক, সিদ্ধযাত্ৰীত্ব, যাত্রাসিদ্ধি কাম ইত্যাদি কথা পঞ্চতন্ত্রে ও জাতকমালায় বার বার পাওয়া যায়। জাতকমালার সুপারগ-জাতকে পূর্ব ভারতের বণিকদের সুবৰ্ণভূমি বা নিমব্ৰহ্মদেশে যাত্রার কথা আছে (সুবৰ্ণভূমি বণিজ্যে যাত্রাসিদ্ধিকমাঃ)- তাহাদের যাত্রা সিদ্ধিলাভ করুক, এই কামনা তাহাদের মনে ছিল সেইজন্য তাহাদের বলা হইয়াছে যাত্রাসিদ্ধিকমাঃ। বুদ্ধগুপ্তের এই লিপিটির শেষ ছত্রটির অর্থেরও অস্পষ্টতা কিছু নাই; সর্বপ্রকারে, সকল বিষয়ে, সৰ্বথা বা সর্ব উপায়ে সকলে সিদ্ধযাত্ৰ হউক, এই প্রকার একটা কামনা বা আশীৰ্বাদ করা হইতেছে। এই কামনা বা আশীৰ্বাদ করা হইয়াছিল যাত্রার পূর্বে, ইহাই তো “সন্তু এই ক্রিয়াপদটির এবং সমস্ত আশীর্বাদটির ইঙ্গিত। কামনা বা আশীর্বাদ করা হইয়াছিল খুব সম্ভব কোনও বৌদ্ধ পুরোহিত বা ধর্মগোষ্ঠীর পক্ষ হইতে; স্তুপের প্রতিকৃতিটি তাহার প্রমাণ, এবং এই আশীর্বাদের একটি লিপি বৌদ্ধসূত্র সহ, ধর্মনিদর্শন সহ খোদাই করিয়া, রক্ষাকধাচের মতো বুদ্ধগুপ্তের সঙ্গে দিয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই প্রথা তো এখনও বাঙলার বহু পরিবারে প্রচলিত। এই মহানাবিকের বাস্তব্য অর্থাৎ বাড়ি ছিল রক্তমৃত্তিকায়। এই রক্তমৃত্তিকা কোথায়, ইহাই হইতেছে। প্রশ্ন। অধ্যাপক কার্ন বলিয়াছিলেন, এই রক্তমৃত্তিক চৈনিক উপাদানের Chrih tru, সিয়াম দেশের সমুদ্রোপকূলের একটি স্থানের সঙ্গে অভিন্ন। অক্ষর দেখিয়া লিপিটির তারিখ পণ্ডিতেরা অনুমান করিয়াছেন খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতক। লিপিটির ভাষা শুদ্ধ সংস্কৃত; ধর্মপ্রেরণা একান্তভাবেই ভারতীয়; মহানাবিকটির নাম ও ধাম একান্তভাবেই ভারতীয়; বুদ্ধগুপ্ত নামটি যেন বিশেষ করিয়াই ভারতীয়। এই অবস্থায় নাবিকটিকে সিয়ামদেশবাসী বলিয়া মনে করিতে একটু ঐতিহাসিক দ্বিধা বোধ হয় বই-কি! বিশেষত রক্তমৃত্তিকার সন্ধান যদি ভারতবর্ষে কোথাও পাওয়া যায়, তাহা হইলে তো কথাই নাই। য়ুয়ান-চোয়াঙ (সপ্তম শতক) কিন্তু কৰ্ণসুবর্ণের বিবরণ দিতে বসিয়া এক রক্তমৃত্তিকার সন্ধান দিতেছেন; বলিতেছেন, কর্ণসুবর্ণের রাজধানীর একেবারে পাশেই ছিল লো-টো-মো-চিহ্ন (Lo-to-mo-chih) নামে বৃহৎ বৌদ্ধ-বিহার। চীন লো-টো-মো-চিহ্ন পালি অথবা প্রাকৃত লওমছি = রক্তমত্তি = রক্তমৃত্তি বা রক্তমৃত্তিকা, বাঙলা, রাঙামাটি। আমার তো মনে হয়, বুদ্ধগুপ্তের বাড়ি কর্ণসুবর্ণের এই রক্তমৃত্তিকা বা রাঙামাটি। তাহা ছাড়া, আর একটি রাঙামাটির খবর আমরা জানি চট্টগ্রামে। প্রাচীন ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক পরিবেশের কথা মনে রাখিলে মহানাবিক বুদ্ধগুপ্ত যে বাঙলাদেশের তাম্রলিপ্তি বন্দর হইতে যাত্রা করিয়াছিলেন পূর্ব-দক্ষিণ সমুদ্রতীরের দেশে, এই অনুমানই তো বিজ্ঞানসম্মত সত্য বলিয়া মনে হয়। এবং যদি তাঁহাই হয়, তাহা হইলে এইখানে আমরা প্রাচীন বাঙলার সামুদ্রিক বাণিজ্য-বিস্তারের একটা পাথুরে ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইলাম। লক্ষণীয় এই যে, লিপির তারিখ খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতক। পরে আমি একাধিক প্রমাণ ও অনুমানের সাহায্যে দেখাইতে চেষ্টা করিব যে, খ্ৰীষ্টপূর্বকাল হইতে আরম্ভ করিয়া আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্তই বাঙলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ; ইহার পর আদিপর্বে বাঙলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের সেই যুগ আর ফিরিয়া আসে নাই।
সামুদ্রিক বাণিজ্যলব্ধ সমৃদ্ধি
এই যে আমরা একটা প্রশস্ত, সমৃদ্ধ ও সুবিস্তৃত অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যের পরিচয় পাইলাম, এই বাণিজ্যে বাঙলাদেশে প্রচুর অর্থাগম হইত এবং সে অর্থের অধিকাংশ বণিকদের হাতেই কেন্দ্রীকৃত হইত, এই ইঙ্গিত আগেই করিয়াছি। কিন্তু এই অর্থ কী? ইহা কি মুদ্রায় বিনিময় দ্রব্যাদিতে রূপান্তরিত? প্লিনি যে বলিয়াছেন, আধ সেরা পিপ্পলির দাম হইত ১৫ স্বর্ণ দিনার, এবং ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের বার্ষিক রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় এক লক্ষ মুদ্রা, তাহা হইতে অনুমান হয়, বণিকেরা বাণিজ্য-পসরার বদলে মুদ্ৰাই লইয়া আসিতেন, এবং এই মুদ্রা সবুর্ণমুদ্রা dinarius বা দিনার ও রৌপ্যমুদ্রা drachm বা দ্রাহ্ম। পঞ্চম হইতে অষ্টম শতক পর্যন্ত প্রায় সমস্ত পট্টোলীগুলিতে ভূমির মূল্যের উল্লেখ (স্বর্ণ) দিনার অনুযায়ী, কিংবা পরবর্তী পাল ও সেনা-বংশের লিপিগুলিতে মূল্যের উল্লেখ পাই রৌপ্য দ্রহ্মে (ধর্মপালের মহাবোধি লিপির ত্ৰিতয়েন সহস্ৰেণ দ্রাহ্মণাং খানিতা”; বিশ্বরূপ ও কেশবসেনের দুইটি লিপিতেও ভূমির মূল্য বোধহয় দেওয়া হইয়াছে দ্রহ্মে?)। এই দুইটি মুদ্রার নাম হইতে মনে হয়, এক সময়ে এই দুই বিদেশী মুদ্ৰাই বেশ-কিছু পরিমাণে বাঙলাদেশে আসিত, এবং বিনিময়-মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত এবং গৃহীতও হইত; পরে ইহাদের নাম হইতেই স্বর্ণ ও রৌপ্য-মুদ্রা বাঙলাদেশে দিনার ও দ্রাহ্ম নামে পরিচিত হইয়াছিল। ‘দাম এবং ‘দৰ্মা’ (বেতন) এই কথা দুইটি তো ‘দ্রাহ্ম হইতেই আমরা পাইয়াছি। এই দুই মুদ্রাপ্রচলনের মধ্যেও প্রশস্ত বৈদেশিক বাণিজ্য সম্বন্ধের স্মৃতি লুক্কায়িত আছে, সন্দেহ নাই।
