বাণিজ্যপথ
এই সমৃদ্ধ বাণিজ্য স্থলপথ ও জলপথ উভয় পথেই চলিত। বাণিজ্যপথের বিস্তৃততর আলোচনা দেশ-পরিচয় অধ্যায়ে ইতিপূর্বেই করিয়াছি; এখানে ইঙ্গিতামাত্রই যথেষ্ট। এই নদীমাতৃক দেশে নৌশিল্পের প্রচলন যেমন দেখিতে পাই, যত “নাবাত-ক্ষেণী’, ‘নৌবাটি’, ‘নৌদণ্ডক’, ‘নৌবিতান, ইত্যাদির উল্লেখ পাইতেছি, চর্যচর্যবিনিশ্চয়-গ্রন্থ হইতে আরম্ভ করিয়া প্রাকৃত-পৈঙ্গল পর্যন্ত প্রাকৃত ও অপভ্রংশে রচিত অসংখ্য গান ও পদে যত নদ-নদী-নৌকা সংক্রান্ত রূপক ও উপমার দেখা পাইতেছি তাহাতে অনুমান হয়, নৌবাণিজ্যই প্রবলতর ও প্রশস্ততর ছিল। গুজরাট হইতে গৌড়ে, কিংবা বারাণসী হইতে পুণ্ড্রবর্ধনে যে বাণিজ্যের আভাস বিদ্যাপতির পুরুষপরীক্ষায় কিংবা সোমদেবের কথাসরিৎসাগরে পাওয়া যায়, জাতকের বহু গল্পে তাম্রলিপ্তিতে বণিকদের যে আনাগোনার খবর পাওয়া যায়, তাহা হয়তো স্থলপথেই বেশি হইত, বৌদ্ধ-যুগের সুপরিচিত বাণিজ্যপথ ধরিয়া। বারাণসী হইতে মগধের ভিতর দিয়া অঙ্গের রাজধানী চম্পা হইয়া পুণ্ড্রবর্ধন পর্যন্ত সাৰ্থবাহের গোরুর গাড়ির লহর চলাচলের পথও ছিল, এ কথা মনে করিতে সুদূরবিন্সপী কল্পনার আশ্রয় লইবার কোনও প্রয়োজন নাই। চম্পা হইতে গঙ্গা ও ভাগীরথী বাহিয়া গঙ্গাবিন্দর ও তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত নৌকাপথও প্রশস্ত ছিল। মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে এই নদীপথের বন্দর ও দেশগুলির বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। বংশীদাসের মনসামঙ্গলে, এবং অন্যান্য মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এবং বিস্তৃত ভাবে মুকুন্দরামের চণ্ডীকাব্যে, বিভিন্ন চৈতন্যচরিত কাব্যে এই পথের কিয়দংশের বন্দরগুলির উল্লেখ আছে। এই বিবরণের মধ্যে প্রাচীন স্মৃতি কিছু লুকাইয়া নাই, এ কথা কে বলিবে? স্থলপথের আর একটি আভাস য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণীতে পাওয়া যায়। কজঙ্গল বা উত্তররাঢ় হইতে তিনি গিয়াছিলেন পুণ্ড্রবর্ধনে এবং সেখান হইতে একটি বৃহৎ নদী পার হইয়া কামরূপে। এই পরিব্রাজক নিজে নূতন করিয়া পথ কাটিয়া অগ্রসর হন নাই; যে পথ বহু দিন আগে হইতেই বহুলোক-যাতায়াতে প্রশস্ত হইয়াছে, সেই পথেই তিনি গিয়াছিলেন, এ অনুমানই সংগত। এই পথেই কামরূপের সঙ্গে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্য-সম্বন্ধ চলিত। পূর্ব ও নিম্নবঙ্গের সঙ্গে কামরূপের বাণিজ্য-সম্বন্ধ ছিল সেই পথ ধরিয়া যে পথে এই চীন-পরিব্রাজক কামরূপ হইতে সমতট ও তাম্রলিপ্তিতে আসিয়াছিলেন। আর, উড়িষ্যার সঙ্গে বাণিজ্য-সম্বন্ধের স্থলপথ ধরিয়াই যে পরবতী কালে চৈতন্যদেব নীলাচল গিয়াছিলেন, তাহা তো সহজেই অনুমেয়। এইসব পথ বহু প্রাচীন এবং বহুজনের চরণচিহ্নে অঙ্কিত।
গঙ্গাবন্দর ও তাম্রলিপ্তি; বৌদ্ধবণিক বুদ্ধগুপ্ত
সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান বন্দর যে ছিল গঙ্গািবন্দর ও তাম্রলিপ্তি, তাহাও সুস্পষ্ট। তাম্রলিপ্তিই জাতকের দামলিপ্তি এবং Ptolemy’র Tamalites, য়ুয়ান-চোয়াঙের তিন-মো-লিহ-তি। সিংহলের সঙ্গে তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যপথের আভাস ফাহিয়ান রাখিয়া গিয়াছেন (চতুর্থ শতক)। তাহারও তিন-চারি শত বৎসর আগে ভারতের দক্ষিণ-সমুদ্রতীর বাহিয়া গঙ্গাবিন্দর ও তাম্রলিপ্তির সঙ্গে সুদূর রোম-সাম্রাজ্যের বাণিজ্য-সম্বন্ধের আভাস তো Periplus ও Ptolemy-র গ্রন্থেই পাওয়া যায়। এ-সমস্ত সাক্ষ্যই অত্যন্ত সুপরিচিত। মিলিন্দ-পঞহ গ্রন্থে বঙ্গ বা পূর্ববঙ্গকেও একটি অন্যতম সামুদ্রিক বাণিজ্য-কেন্দ্ৰ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, অন্যান্য অনেক বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে। বলা হইয়াছে, বঙ্গদেশে বাণিজ্যব্যাপদেশে অনেক সমুদ্রগামী জাহাজ একত্র হইত। এই বন্দর কোন বন্দর তাহা অনুমান করিবার উপায় নাই। তবে বুড়ীগঙ্গা (Ptolemy-র Antibole?) বা মেঘনার মুখের কোনও বন্দর হওয়া অসম্ভব নয়, অথবা চট্টগ্রামও হইতে পারে, কিন্তু মধ্যযুগের Bengala বন্দর হওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বহু পরবর্তী কালেও সপ্তগ্রাম হইতে আরম্ভ করিয়া অন্তত ভৃগুকচ্ছ-সূরাষ্ট্র-পাটন পর্যন্ত এই বাণিজ্য-সম্বন্ধের বিস্তৃততর বিবরণ পাওয়া যাইবে মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারায়। ব্ৰহ্মদেশ ও যবদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপ ও পূর্বদক্ষিণ বৃহত্তর ভারতের দ্বীপগুলির সঙ্গে বাঙলাদেশের বাণিজ্য সম্বন্ধ বিষয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিছু নাই, তবে অনুমান খুব সহজেই করা যাইতে পারে। উত্তর-ব্রহ্মের সঙ্গে আসাম ও মণিপুরের ভিতর দিয়া স্থলপথে একটা নিকট-সম্বন্ধ তো ছিলই, এ কথা অন্যত্র বলিয়াছি। বর্তমােন ত্রিপুরা জেলার পট্টিকেরার রাজবংশের সঙ্গে যে পাগানের আনাউরহথা ও চ্যািনজিথথার রাজবংশের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল, তাহাও আমি অন্যত্র দেখাইয়াছি। মধ্যযুগে এই পথ দিয়াই একাধিক বার মণিপুরে ব্ৰহ্মদেশের যুদ্ধাভিযান আসিয়াছে। নিম্নব্রহ্মের সঙ্গে সমুদ্রোপকূল বাহিয়া জলপথও ছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় ব্ৰহ্মদেশীয় প্রাচীন রাজবংশাবলীগুলির ইতিহাসের মধ্যে, কিছু কিছু লিপিমালায়; ব্ৰহ্মদেশে থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও আমার অন্য দুটি প্রাসঙ্গিক গ্রন্থে সে কথা প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি। এখানে উল্লেখ নিম্প্রয়োজন। যবদ্বীপ সুবর্ণদ্বীপের সঙ্গে পূর্ব-দক্ষিণ সমুদ্রের দেশ ও দ্বীপগুলির সম্বন্ধের প্রমাণ আছে মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের লিপিতে (চতুর্থ-পঞ্চম শতক), মেঘবৰ্মন-সমুদ্র গুপ্ত (চতুর্থ শতক) প্রসঙ্গে, রাজা বালপুত্রদেবের নালন্দা লিপিতে (দশম শতক), ইৎসিঙের (৭ম শতক) ভ্ৰমণ-বৃত্তান্তে, বৌদ্ধ মহাপণ্ডিত ধৰ্মকীর্তির জীবন-ইতিহাসের মধ্যে (একাদশ শতক)। এই-সমস্ত সাক্ষ্যই এত সুপরিচিত যে, ইহাদের উল্লেখ পুনরুক্তি দোষে দুষ্ট হইবে। তাহা ছাড়া, ইতিপূর্বেই দেশ-পরিচয় অধ্যায়ে এ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করা হইয়াছে। সাধারণ ভাবে এইসব পূর্ব-দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপ ও দেশগুলিতে বাঙলাদেশের ধর্মসাধনা ও সংস্কৃতির প্রভাব এত সুস্পষ্ট এবং পণ্ডিতমহলে এত বেশি আলোচিত হইয়াছে যে, প্রাচীন বাঙলাদেশের সঙ্গে ইহাদের নিকট-সম্বন্ধের কথা এখন আর কল্পনার বিষয় নয়। সত্য, এইসব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সিদ্ধান্ত একটিও প্রত্যক্ষভাবে বাণিজ্য-সংক্রান্ত নয়, যদিও এ কথা অনুমান করিতে বাধা নাই যে, বাণিজ্য-সম্বন্ধের উপর নির্ভর করিয়াই ক্ৰমে ক্ৰমে বাঙলাদেশের ও ভারতের অন্যান্য দেশের ধর্মসাধনা ও সংস্কৃতি ক্রমশ এইসব অঞ্চলে ছাড়াইয়া পড়িয়াছিল। অন্য দেশে সংস্কৃতিবিস্তার এইভাবেই হইয়া থাকে, প্রাচীন কালেও হইয়াছিল, বর্তমান কালেও হইয়াছে ও হইতেছে। সর্বাগ্রে বণিক, বণিকের সঙ্গে বণিকের প্রয়োজনেই ধর্ম ও পুরোহিত, তারপরেই ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে আসিয়া পড়ে সামরিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব। যাহা হউক, প্রত্যক্ষ বাণিজ্য-সম্বন্ধের প্রমাণ প্রাচীন বাঙলায় পাইতেছি না, কিন্তু নানা মনসামঙ্গল কাব্যে সে প্রমাণ ছাড়াইয়া আছে; আরাকান ও ব্রহ্মদেশের সঙ্গে বাণিজ্য-সম্বন্ধের আভাসও এইসব গ্রন্থে পাওয়া যায়। অনুল্লিখিত-নাম যে দেশের বিবরণ সওদাগরদের শুনানো হইতেছে, সেই দেশ যে ব্ৰহ্মদেশ, বিবরণটি একটু মনোযোগ দিয়া পড়িলে এ সম্বন্ধে আর সন্দেহ থাকে না। কিন্তু প্রাচীনকালে এই পূর্ব-দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপ ও দেশগুলির সঙ্গে বাঙলাদেশের বাণিজ্য সম্বন্ধের একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণও কি নাই? আমার মনে হয়, আছে। সেই প্রমাণটি উল্লেখ করিয়াই এই ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রসঙ্গ শেষ করিব। মালয় উপদ্বীপের ওয়েলেসলি জেলার একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মধ্য হইতে ১৮৩৪ খ্ৰীষ্টাব্দে একটি স্লেট পাথরে উৎকীর্ণ লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছিল। পাথরটির মাঝখানে উৎকীর্ণ বীেদ্ধস্তুপের প্রতিকৃতি; স্তুপটির দুই পাশে লিপি উৎকীর্ণ। লিপিটির পাঠ এইরূপ :
