পিপ্পলির দাম : বস্ত্ৰ-ব্যাবসা ও বিস্ত্রের মূল্য
Periplus Erythri Mari-গ্রন্থে তেজপাতা ও পিপ্পলের উল্লেখ আমরা দেখিয়াছি। এই দুটি দ্রব্যের ব্যাবসাও খুব লাভজনক ব্যাবসা ছিল সন্দেহ নাই। সব দ্রব্যের বাণিজ্য-মূল্য উপাদানের অভাবে জানিবার উপায় নাই; কিন্তু পিপ্পলির বাণিজ্যমূল্যের খানিকটা আভাস পাইতেছি প্লিনির ইণ্ডিকা নামক গ্ৰন্থ হইতে (খ্ৰী প্রথম শতক)। তিনি বলিতেছেন, রোম সাম্রাজ্যে এক পাউন্ড বা আধ সের পিপ্পলির দাম ছিল তখনকার দিনে ১৫ দিনার, অর্থাৎ পনরাটি স্বর্ণমুদ্রা। ইহা হইতেই বুঝা যাইবে, এইসব বাণিজ্যসম্ভার হইতে দেশে কম। অর্থাগম হইত না। কার্পাস ও অন্যান্য বস্ত্ৰশিল্প সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। এই শিল্প সম্বন্ধে আগে যে-সমস্ত প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহা হইতেই বুঝা যাইবে, নানাপ্রকার বস্ত্রের ব্যাবসা বাঙলাদেশে খুব সুপ্রাচীন এবং শুধু প্রাচীন বাঙলায়ই নয়, একেবারে অষ্টাদশ শতকের শেষ, উনবিংশ শতকের প্রথম পর্যন্ত সর্বদাই এই বস্ত্রশিল্পের ব্যাবসা দেশের অর্থাগমের একটা মস্ত বড় উপায় ছিল। প্লিনি সেই খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতকেই বলিতেছেন, ভারতবর্ষ হইতে যত রেশম ও কার্পাস ইত্যাদি বস্ত্ৰ পশ্চিমের বণিকেরা বহন করিয়া লইয়া যাইত, তাহার বার্ষিক মূল্য ছিল (আনুমানিক) এক লক্ষ (স্বর্ণ?) মুদ্রা। এই অর্থের একটা বৃহৎ অংশ যে বাঙলাদেশে আসিত, তাহাতে সন্দেহ কী?
বাণিজ্যে তাম্রলিপ্তের স্থান
রাষ্ট্র ও সমাজে বণিক ব্যবসায়ীর স্থান
বংশীদাসের জনসামঙ্গল অথবা মুকুন্দরামের চণ্ডীকাব্যে বাঙালীর অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যের যে ছবি পাওয়া যায়, তাহা অতিরঞ্জিত সন্দেহ নাই। গ্রন্থ দুইটি আমাদের যুগের পক্ষে অর্বাচীনও, কিন্তু তৎসত্ত্বেও সাক্ষ্য দুটি যে বাঙালীর প্রাচীন বাণিজ্যস্মৃতি বহন করে, এ কথা সকলেই স্বীকার করেন। ইহার সাক্ষ্য আমাদের বক্ষ্যমান বিষয়ে প্রামাণিক কিছুতেই নয়, তবু এই দেশজাত পান, গুবাক, নারিকেল ইত্যাদির পরিবর্তে বণিকেরা যে-সব মূল্যবান দ্রব্য লইয়া আসিতেন তাহার অংশমাত্রও যদি সত্য হয়, তাহা হইলেও এ কথা অনুমান করা চলে যে, প্রাচীন বাঙলায় অর্থাগমের অন্যতম নয়, প্রথম ও প্রধান উপায়ই ছিল বাণিজ্য। এ কথা যে একেবারে শূন্যকথা নয়, তাহা বস্ত্ৰশিল্প ও পিপ্পল সম্বন্ধে প্লিনির উক্তি হইতেও কতকটা বুঝা যায়। ইক্ষু ও ইক্ষুজাত দ্রব্য, লবণ, নানা প্রকারের হীরা, মুক্তা ও সোনা, তেজপাতা ও অন্যান্য মসলা দ্রব্য ইত্যাদির কথা তো আগেই বলিয়াছি। হাজারিবাগ জেলার দুধপানি পাহাড়ে একটি লিপি উৎকীর্ণ আছে; অক্ষরের রূপ দেখিয়া মনে হয় লিপিটি খ্ৰীষ্টীয় অষ্টম শতকের। এই লিপিতে আছে :
অথ কস্মিংশ্চি [ৎস] ময়ে বাণিজো ভ্রাতরস্ত্ৰয়ঃ।
তাম্রলিপ্তি [ম] যোধ্যায়া যযুঃ পূর্বম্বণিজয়া ৷।
ভূয়ঃ প্রতিনিবৃত্তান্তে সমাবাসং বিয়াসবঃ।
প্রয়োজনেন কেন্যাপি চিরঞ্চকুরিহ স্থিতিং ॥
সুবৰ্ণমণি মাণিক্য মুক্ত প্রভৃতি যৈর্ধ নং।
বিত্তাপম্পৰ্ধয়েবা সোদপর্যন্তমুপার্জিতং ॥
অষ্টম শতকে বলা হইতেছে, ‘কোনো-এক সময়ে’ অর্থাৎ এখানে যে উল্লেখটি আছে, তাহা একটি প্রাচীন দিনের ঘটনার স্মৃতি। কিন্তু, বাণিজ্য উপলক্ষে তিন ভাই অযোধ্যা হইতে তাম্রলিপ্তিতে আসিয়া কিছুকালের মধ্যে প্রচুর ধনরত্ন উপার্জন করিয়া নিজের দেশে ফিরিয়া গিয়াছিলেন, এ কথাটির মধ্যে ঐতিহাসিক সত্য নিহিত আছে, তাহাতে আর সন্দেহ কী? বৌদ্ধ জাতকের অনেক গল্পে বাণিজ্য উপলক্ষে তাম্রলিপ্তির উল্লেখও সুপরিচিত; পুনরুল্লেখ নিম্প্রয়োজন। সোমদেবের কথাসরিৎসাগরে একাধিক জায়গায় উল্লেখ আছে, পাটলীপুত্র হইতে বাণিজ্য উপলক্ষে বণিকদের পুণ্ডে অথবা পুণ্ড্রবর্ধনে আসিবার কথা। ই-ৎসিঙুও এই পথেরই উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন, তাম্রলিপ্তি হইতে পশ্চিমবাহী পথ ধরিয়া যখন তিনি বুদ্ধগয়া যাইতেছিলেন তখন তাহার পথসঙ্গী হইয়াছিল শত শত বণিক। তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যের উল্লেখও বারবার নানা গ্রন্থে দেখা যাইতেছে। বিদ্যাপতির পুরুষপরীক্ষায় গুজরাটের সঙ্গে গৌড়ের বাণিজ্য-সম্বন্ধের আভাস পাইতেছি। গঙ্গার মুখে গঙ্গািবন্দরের কথা, তাম্রলিপ্তি ও কর্ণসুবর্ণের বাণিজ্য-সমৃদ্ধির উল্লেখ তো যুয়ান-চোয়াঙও করিয়া গিয়াছেন। য়ুয়ান-চোয়াঙ বলেন, নানা প্রকার মূল্যবান দ্রব্য, মণিরত্ন ইত্যাদির প্রচুর সমাগম হইত। তাম্রলিপ্তিতে; তাম্রলিপ্তির লোকেরা এই হেতুই খুব বিত্তবান ছিলেন। কথাসরিৎসাগরের মতে তাম্রলিপ্তি বিত্তশালী বণিকদের কেন্দ্র ছিল; তাহারা লঙ্কা, সুবর্ণদ্বীপ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। উত্তাল বিক্ষুব্ধ সমুদ্রকে তুষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে তাঁহারা মণিরত্ন ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি জলে অৰ্পণ করিয়া পূজা করিতেন। এই সুপ্রাচীন রীতির উল্লেখ। মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যেও দেখা যায়। এই সমস্ত সাক্ষ্যই সুপরিচিত। এইসব সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখিলে সহজেই মনে হয়, প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধি যাহা ছিল, তাহা বহুলাংশে নির্ভর করিত ব্যাবসা-বাণিজ্যেরই উপর। তাহা ছাড়া পঞ্চম হইতে অষ্টম শতক পর্যন্ত দেখিতেছি, ভূমি দান-বিক্রয়ের দলিলগুলিতে স্থানীয় অধিকরণে যাঁহাদের আহ্বান করা হইতেছে, সেই পাঁচ জনের মধ্যে দুই জন তো রাজকর্মচারীই-বিষয়পতি স্বয়ং এবং প্রথম-কায়স্থ বা জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ। বাকি তিন জনের মধ্যে দুই জন ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রতিনিধি-নগরশ্রেষ্ঠী অর্থাৎ শ্রেষ্ঠীগোষ্ঠীর যিনি প্রধান তিনি এবং প্রথম-সার্থবাহ অর্থাৎ বণিকদের মধ্যে যিনি প্রধান তিনি। অবশিষ্ট যিনি রহিলেন, তিনি প্রথম-কুলিক অর্থাৎ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তাহা হইলে দেখিতেছি, সমসাময়িককালে রাষ্ট্রেও কতকটা আধিপত্য এই বণিক ও ব্যবসায়ীরাই করিতেছেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যাপারেও ‘প্রধান ব্যাপারিণঃ’ যাহারা তাহাদের সাহায্য লওয়া হইতেছে, মহত্তর অর্থাৎ সমাজের অন্যান্য গণ্যমান্য লোকদের সঙ্গে সঙ্গে। এই সম্বন্ধে পরবর্তী এক অধ্যায়ে আরও বলিবার সুযোগ আসিবে; এইখানে এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে, ব্যাবসা-বাণিজ্যের ফলে এইসব শ্রেষ্ঠী ও বণিকদের হাতে যে অর্থগম হইত, তাহার ফলেই ইহারা রাষ্ট্রে আধিপত্য লাভ করিবার সুযোগ পাইয়াছিলেন। আমাদের শাস্ত্ৰে যে আছে, ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ তদর্ধং কৃষিকৰ্মণি’, ঐ কথা প্রাচীন বাঙলায় যথার্থ সার্থকতা লাভ করিয়াছিল বলিলে ইতিহাসের অমর্যাদা হয় না। প্রাচীন বাঙলার লক্ষ্মী ব্যাবসা-বাণিজ্য-নির্ভরই ছিলেন বেশি, এবং সেই লক্ষ্মী বাস করিতেন বণিক, ব্যাপারী, শ্রেষ্ঠী ইত্যাদির ঘরে-ধর্মাদিত্যের ২ নং এবং গোপচন্দ্রের তাম্রপট্টে যাঁহাদের যথাক্রমে বলা হইয়াছে ব্যাপার-কারগুয়ঃ, ব্যাপারিণঃ, তাহাদের ঘরে। মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে সওদাগরদের ব্যাবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কাহিনীগুলিতেও সে কথার প্রমাণ আছে; ধনপতি, হীরামাণিক, দুলালধন, ইত্যাদি নাম যে বণিকদের মধ্যেই পাই, তাহা একেবারে নিরর্থক নয়। বর্তমান হুগলী জেলার ভুরশুট গ্রামে প্রাচীন বাঙলার শ্রেষ্ঠীদের খুব বড় একটা কেন্দ্র ছিল। ভুরশুটের প্রাচীন নাম ভূরিশ্রেষ্ঠিক = ভূরিসৃষ্টি = ভূরিশ্রেষ্ঠীর উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় ভট্টভবদেবের শিলালিপিতে, শ্ৰীধর আচার্যের ন্যায়কন্দলী-গ্রন্থে। শেষোক্ত গ্রন্থে স্পষ্টই বলা হইয়াছে “ভূরিসৃষ্টিরিতি গ্রাম ভূরিশ্ৰেষ্ঠী-জনাশ্রয়”। গ্রামটিতে বিত্তবান সমৃদ্ধ বণিকসম্প্রদায় ছিল কাজেই সঙ্গে সঙ্গে শ্রেষ্ঠীরাও ছিলেন। অষ্টম শতকপূর্ব লিপিগুলিতে দেখা যায় রাষ্ট্রে ও সমাজের সার্থিবাহদের সঙ্গে শ্রেষ্ঠীদেরও যথেষ্ট আধিপত্য ছিল।
