নৌশিল্প
সকল শিল্পের মধ্যে নৌশিল্প বা নদীগামী নৌকা ও সমুদ্রগামী পোত-নির্মাণ শিল্পের একটা বিশেষ স্থান নিশ্চয়ই ছিল; তাহার প্রমাণ শুধু বর্তমান চট্টগ্রামে কিংবা মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে নয়, প্রাচীন বাঙলার লিপিগুলিতে এবং সংস্কৃত সাহিত্যেও ইতস্তত ছড়াইয়া আছে। মৌখরী-রাজা ঈশানবর্মের হড়াহা লিপিতে (ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ) গৌড়দেশবাসীদের (গৌড়ান) “সমুদ্রাশ্রয়ান” বলা হইয়াছে; ইহার অর্থ সমুদ্র-তীরবর্তী গৌড়দেশ হইতে পারে, অথবা সামুদ্রিক বাণিজ্যই যাহার আশ্রয়, সেই গৌড়দেশও বুঝাইতে পারে। কালিদাস রঘুবংশে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে বাঙালীকে “নৌসাধনোদ্যতান” বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন। পাল ও সেন বংশের লিপিমালায় নৌবাটি, নৌবিতান (fleet of boats) প্রভৃতি শব্দ তো প্রায়শ উল্লিখিত হইয়াছে। এই উভয় রাজবংশের, এবং সমসাময়িক বাঙলাদেশের অন্যান্য রাজবংশেরও, সামরিক শক্তি নৌবলের উপর অনেকটা নির্ভর করিত; ইহার উল্লেখ তো অনেক শিলালিপিতেই আছে। বৈদ্যদেবের কমীেলি লিপিতে নৌযুদ্ধের বর্ণনাও আছে। সাধারণ লোকদের যাতায়াত এবং ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য নৌযানের প্রয়োজন ছিল যথেষ্ট এই নদীমাতৃক, খাড়িপ্রধান, বারিবহুল, এবং বহুলাংশে নিম্নভূমির দেশে ইহা তো স্বাভাবিক এবং সহজেই অনুমেয়। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর লিপিতে (৫০৭-৮ খ্ৰী) নৌযোগ অর্থাৎ নৌকাঘাট বা বন্দর বা পোতাশ্রয়ের উল্লেখ আছে; এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, যে ভূমি-সীমানা সম্পর্কে এই নৌযোগের উল্লেখ, সেই ভূমি ত্রিপুরা জেলার গুণাইঘর গ্রামের নিকটবতী জলপ্লাবিত দেশে। ফরিদপুর জেলায় প্রাপ্ত মহারাজ ধর্মদিত্যের ১ নং তাম্রপট্টোলীতে ভূমির সীমা সম্পর্কে “নাবাত-ক্ষেণী” কথা উল্লেখ আছে। “নাবাত” পাঠ খুব শুদ্ধ বলিয়া মনে হয় না, প্রকাশিত প্ৰতিলিপিতে “ভাবতা” পোঠই সমীচীন মনে হয়; কিন্তু “দ্ভাবতা-ক্ষেণী” কথার কোনও সংগত অর্থ এস্থলে করা যায় না। সেইজন্য পার্জিটার সাহেবের আনুমানিক পাঠ “নাবাত-ক্ষেণী” আপাতত স্বীকার করা যাইতে পারে তিনি ইহার অনুবাদ করিয়াছেন, Ship-building harbour)। ধর্মাদিত্যের ২ নং শাসনে অন্য একটি ভূমির সীমা সম্পর্কে “নৌদণ্ডক” কথার উল্লেখ আছে, বোধ হয় “নৌদণ্ডক” কথার অর্থও নৌকার আশ্রয়, নৌকা যেখানে বাধা হইত সেই স্থা , অর্থাৎ বন্দর, ঘাট। এইসব উল্লেখ হইতে স্পষ্টই বুঝা যায়, নদনদীগামী ছােটবড় নৌকা, সমুদ্রগামী পোত ইত্যাদি নির্মাণ-সংক্রান্ত একটা সমৃদ্ধ শিল্প ও ব্যবসায় প্রাচীন বাঙলায় নিশ্চয়ই ছিল। রক্তমৃত্তিকাবাসী মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের কাহিনী সুপরিচিত। ভাটেরার গোবিন্দকেশবের লিপিতেও জনৈক নাবিক দ্যোজ্যের উল্লেখ পাইতেছি।
০৫. ব্যবসা-বাণিজ্য
পান, গুবাক ও নারিকেলের ব্যাবসা। লবণের ব্যাবসা
এই নৌশিল্পের কথা হইতেই ধনোৎপাদনের তৃতীয় উপায় ব্যাবসা-বাণিজ্যের কথার মধ্যে আসিয়া পড়া যাইতে পারে। এ-পর্যন্ত ভূমিজাত ও শিল্পজাত যে-সব দ্রব্যাদির কথা বলিয়াছি, তাহাই ছিল ব্যাবসা-বাণিজ্যের উপকরণ। ফলফুল, অর্থাৎ আম, কঁাটাল, মহুয়া ইত্যাদি লইয়া কোনও বিস্তৃত ব্যাবসা সম্ভব ছিল না; মৎস্য সম্বন্ধেও তাহাই। তবু গ্রাম হইতে গ্রামান্তরের হাটে হাটে এইসব জিনিস লইয়া ছোটখাটো ব্যাবসা-বাণিজ্য চলিত বই-কি। হট্ট, হট্টিকা, হট্টিয়গৃহ, হট্টবর, আপণ, মানপ (তীেলদার = দোকানদার = ছোট ব্যবসায়ী) ইত্যাদি শব্দের উল্লেখ প্রায়শ লেখমালাগুলিতে দেখা যায়। অষ্টম শতক-পরবর্তী লিপিগুলিতে তো অনেক স্থলেই হাট-বাজার-ঘাট সমেত (সহট্ট সঘট্ট) জমি দান করা হইয়াছে। হট্টপতি, শৌন্ধিক, তরিক ইত্যাদি রাজকর্মচারীর উল্লেখ হইতেও একটা সমৃদ্ধ অন্তর্বাণিজ্যের কতকটা আভাস পাওয়া যায়; হাটবাজার, বাণিজ্য-শুদ্ধ এবং পারঘাটা-খেয়াঘাটের কর ইত্যাদি আদায়ের দায়িত্ব ছিল ইহাদের উপর। প্রসঙ্গ উল্লেখ হইতে মনে হয়, এইসব উপায় হইতে রাষ্ট্রের যথেষ্ট অর্থাগম হইত। ধর্মদিত্যের পট্টোলী দুইটিতে “ব্যাপার-কারাগুয়া” এবং “ব্যাপোরণ্ড্য” ও গোপচন্দ্রের পট্টোলীতে “ব্যাপারায় বিনিযুক্তক” নামে একপ্রকার রাজপুরুষের উল্লেখ আছে; খুব সম্ভব। ইহারা ব্যাবসা-বাণিজ্য রক্ষণাবেক্ষণের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন এবং ছোটবড় নগরগুলিই এইসব ব্যাবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। নব্যাবকাশিকা এবং কোটীবর্ষ যে বণিক ও ব্যবসায়ীদের খুব সমৃদ্ধ মিলনকেন্দ্র ছিল এ খবর তো কোটালিপাড়া ও দামােদরপুর পট্টোলীতেই পাওয়া যায়। পুণ্ড্রবর্ধনের কোনও এক অনুল্লিখিত স্থানে যে বিচিত্র বিপণিমালা শোভিত এক সমৃদ্ধ, বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল, সে খবর পাওয়া যাইতেছে সোমদেবের কথাসরিৎসাগর গ্রন্থে। কিন্তু শহর ছাড়া গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারেও কিছু কিছু ব্যাবসা-বাণিজ্য নিশ্চয়ই চলিত। ইরদা লিপিতে দেখিতেছি হাটসহ একটি গ্রাম দান করা হইতেছে; দামোদর লিপি, ধর্মপালের খালিমপুর লিপি, গোবিন্দকেশবের ভাটেরা লিপি প্রভৃতিতেও হাটবাজার সমেত অনুরূপ ভূমি বা গ্রাম দান-বিক্রয়ের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এইসব গ্রাম ও গ্রামান্তরের হাটে স্থানীয় উৎপন্ন ও নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি লইয়াই ক্ৰয়-বিক্রয় চলিত। ভূমিজাত অন্যান্য কিছু কিছু দ্রব্য, যেমন পান, সুপারি, নারিকেল ইত্যাদির ব্যাবসা নিশ্চয়ই বিস্তৃততর ছিল সন্দেহ নাই, এবং শুধু বাঙলাদেশের ভিতরেই নয়, দেশের বাহিরেও প্রতিবেশী দেশগুলিতে সুপারি ও নারিকেল এই দুই দ্রব্যই কিছু কিছু রপ্তানি হইত, এরূপ অনুমান করা যায়। পরবর্তী মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যের প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া। বংশীদাসের মনসামঙ্গলে ও কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে পাই, দক্ষিণ-ভারতের সমুদ্রোপকূল বাহিয়া বাঙালী বণিকেরা গুজরাট পর্যন্ত যে বাণিজ্য-সম্ভার লইয়া যাইতেন, তাহার মধ্যে গুয়া(ক) বা গুবাক, পান ও নারিকেল উল্লেখ্য। গুয়ার বদলে লইয়া আসিতেন মাণিক্য, পানের বদলে মরকত এবং নারিকেলের বদলে শঙ্খ। গুয়া বা গুবাক যে সুপারি নাম লইল, তাহার ইতিহাসের মধ্যে বাঙলাদেশের এই দ্রব্যটির বাণিজ্য ইতিহাসও লুকাইয়া আছে। বর্তমান গৌহাটি শহরের নামটি আসিয়াছে গুয়া হইতে; গুবাক৷ ক্রয়-বিক্রয়ের হাট বা হাটি অর্থে গুবাহাটি = গুয়াহাটি = গৌহাটি। যাহা হউক, এই গুবাক৷ প্রাচীন কালেই আরব-পারস্য প্রভৃতি দেশগুলিতে রপ্তানি হইত; ঐ দেশীয় বণিকেরা এই দ্রব্য জাহাজ বোঝাই করিতেন বাঙলাদেশের কোনও সামুদ্রিক বন্দর হইতে নয়, পশ্চিম-ভারতের বন্দর শূর্পারক = সুপ্পারক = সোপারা হইতে, এবং তাহারা এই দ্রব্যকে সোপারার ফল বলিয়াই জানিতেন; এই অর্থে পরবর্তী কালে গুবাক হইল সুপারি এবং সেই নামেই ভারতের সর্বত্র ইহার পরিচয়; কিন্তু বাঙলাদেশের, বিশেষত পূর্ববাঙলার গ্রামে গ্রামে এখনও ইহার নাম গুবা বা গুয়া। গুবকের ব্যাবসা যে খুবই প্রশস্ত ছিল, এবং তাহা হইতে এই দেশের প্রচুর অর্থগমও হইত, তাহার প্রমাণ তো ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমল পর্যন্তও পাওয়া যায়। কোম্পানির আমলে সুপারি বাঙলাদেশের একচেটিয়া ব্যাবসা ছিল। এই সুপারি-নারিকেলের অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যের ইতিহাস যদি পরবর্তী মধ্যযুগ বাহিয়া কোম্পানির আমল পর্যন্ত অনুসরণ করা যায়, তবেই বুঝা যাইবে প্রাচীন বাঙলার ভূমিদানি-সম্পর্কিত লিপিগুলিতে বিশেষ করিয়া গুবাক, নারিকেল এবং পানের বরজের বির (অস্ট্রিক) = পান; বরজ = পান যেখানে জন্মায়; পানের বরজ যাহাদের জীবিকা তাহারা বারুজীবী = বারুই] উল্লেখ কেন করা হইয়াছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে তাহা হইতে আয়ের পরিমাণও কেন উল্লেখ করা হইয়াছে। লবণ সম্বন্ধেও ঠিক একই কথা বলা চলে। বাঙলাদেশের লবণ সামুদ্রিক লবণ। মধ্যযুগের যে দুইটি কাব্যের নাম কিছু আগে করিয়াছি, তাহাতেই প্রমাণ আছে, লবণও অন্যতম বাণিজ্যসম্ভার ছিল। বাঙালী বণিকেরা সামুদ্রিক লবণের বিনিময়ে পাথুরে লবণ লইয়া আসিতেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমলেও দেখি, লবণের ব্যাবসা লইয়া কাড়াকড়ি; কোম্পানির সওদাগরেরা অনবরত চেষ্টা করিতেছেন। লবণের ব্যাবসা একচেটিয়া করিতে। এই প্ৰয়াসের ইতিহাস পড়িলে স্বতই মনে হয়, ব্যাবসাটা খুবই লাভবান ছিল। সে-কথাটি না বুঝিলে প্রাচীন লিপিগুলিতে কেন যে ভূমি-দানের সময় বারবারই ‘সলবণ” কথাটি উল্লেখ করা হইতেছে, সে-রহস্যটি ধরা পড়ে না।
