চিনি, লবণ ও মৎস্য শিল্প
বস্ত্ৰশিল্পের পরেই উল্লেখ করিতে হয় চিনি, লবণ ও মৎস্যের কথা। একটু পরেই এ সম্বন্ধে বিস্তৃত উল্লেখ করা হইয়াছে। চিনি মারফত দেশে প্রচুর অর্থগম হইত বলিয়া মনে হয়। পৌণ্ডক ইক্ষু হইতে যে প্রচুর চিনি উৎপন্ন হয় এ কথা সুশ্রুত বহুদিন আগেই বলিয়াছেন। ত্ৰয়োদশ শতকে বাঙলাদেশ হইতে প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে চিনির উল্লেখ করিয়াছেন মার্কে পোলো। ষোড়শ শতকের গোড়ায়ও ভারতের বিভিন্ন দেশে, সিংহলে, আরব ও পারস্য প্রভৃতি দেশে চিনি রপ্তানি লইয়া দক্ষিণ-ভারতের সঙ্গে বাঙলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতেছে, এ সাক্ষ্য দিতেছেন পর্তুগীজ পর্যটক বারবোসা। লবণের ব্যাবসা লইয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কড়াকড়ির কথা সুবিদিত; ইহা হইতেই অনুমান হয়, অষ্টাদশ শতকেও লবণের ব্যাবসা খুব লাভজনকই ছিল। মৎস্যের একটা বিস্তৃত আন্তদেশীক ব্যাবসা নিশ্চয়ই ছিল, কঁচা এবং শুকনা মৎস্য দুয়েরই। বাঙলাদেশ তো চিরকালই মৎসাহারী, এবং বাঙালী স্মৃতিকার ব্ৰাহ্মণ ভবদেব ভট্ট যেমন করিয়া বাঙালীর মৎস্যাহারের সপক্ষে যুক্তি দিয়াছেন তাহাতে মনে হয়, আজিকার মতন তখনও বাঙলার বাহিরে বাঙালীর এই মৎস্যগ্ৰীতি সম্বন্ধে একটা ঘূণার ভাব ছিল। ভবদেব ভট্ট নানাপ্রকার মৎস্যের উল্লেখ করিয়াছেন; শুকনা মাছের কথাও বলিয়াছেন। দুইই ছিল ভক্ষ্য এবং সেই হেতু ব্যাবসা-বাণিজ্যের অন্যতম দ্রব্য। যে-ভাবে দান-বিক্রয়ের পট্টোলীগুলিতে মৎস্যের উল্লেখ করা হইয়াছে তাহাতেই মনে হয়, এই দ্রব্যটির মূল্য ও চাহিদা যথেষ্টই ছিল; পাহাড়পুরের ২/১ টি পোড়ামাটির ফলকে তাহার ইঙ্গিতও আছে।
কারুশিল্প : তক্ষণ ও স্থাপত্যশিল্প;
অলংকার শিল্প; লৌহশিল্প; মৃৎশিল্প; কাষ্ঠশিল্পী; দন্তশিল্প; কাংস্যশিল্প
কারুশিল্পও কম ছিল না। তাহার লিপি-প্রমাণ বিশেষ নাই, কিন্তু অনুমান সহজেই করা চলে। তক্ষণ ও স্থাপত্যশিল্প, স্বর্ণ ও রৌপ্যশিল্পের কথা আগেই প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিয়াছি; এখানে আর বিস্তৃত করিয়া উল্লেখ করিবার বিশেষ কিছু নাই। সোনা, রূপা, মণি, হীরা ও বিচিত্র দ্যুতিময় প্রস্তরসজ্জিত নানা অলংকার বিত্তশালী সমাজে ব্যবহৃত হইত, এ কথা তো সহজেই অনুমেয়। অন্যত্র উল্লিখিত বিচিত্র দেবদেবীর অলংকরণ। ঐশ্বর্য দেখিলে তাহা বুঝিতে বিলম্ব হয় না। তবকত্ব-ই-নাসিৱী গ্রন্থে উল্লেখ আছে, লক্ষ্মণসেন সোনা ও রূপার বাসনে আহার করিতেন। ইহা কিছু অত্যুক্তি নয়। রাজারাজড়া তো করিতেনই, বণিক সাধু-সওদাগরেরাও করিতেন; তাহার কিছু আভাস মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যেও আছে। রামচরিত কাব্যে মণিময় ঘুঙুর, মুক্তা, হীরা ও নানা বিচিত্ৰবৰ্ণ প্রস্তরখচিত অলংকারের উল্লেখ আছে; বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপি, লক্ষ্মণসেনের নৈহাটীলিপি এবং অন্যান্য লিপিতে দেবদাসী, রাজান্তঃপুরের নারী ও পরিচারিকদের নানা মূল্যবান অলংকার-সজ্জার উল্লেখ আছে। এই বিলাস ঐশ্বর্যের প্রদর্শনী সেন আমলেই বেশি আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। লৌহশিল্পও ছিল; দুই-একটি শাসনে কর্মকার তো রাজপাদোপজীবী বলিয়াই উল্লিখিত হইয়াছেন। চাও-জু-কুয়া যে বলিয়াছেন, বাঙলাদেশে দুমুখো খুব ধারালো তলোয়ার তৈরি হয়, তাহার মধ্যে লৌহ ইত্যাদি ধাতুশিল্পে এ দেশের শিল্প-কৃতিত্ব প্রকাশ পাইতেছে। লৌহশিল্পের প্রচলন যে খুবই ছিল তাহা অনুমান করা কঠিন নয়। কর্মকারের সুপ্রাচুর্য না থাকিলে তো কৃষিকর্ম এবং কৃষিসমাজ চলিতেই পারে না। দা, কুড়াল, কোদালি, খন্তা, খুরপি, লাঙ্গল ইত্যাদি ছাড়া লোহার জল-পাত্ৰ (ইদিলপুর লিপি), তীর, বর্শা, তরোয়াল ইত্যাদি যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্ৰও প্রচুর তৈরি হইত। অগ্নিপুরাণের মতে অঙ্গ ও বঙ্গদেশ তরোয়ালের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল; বঙ্গদেশীয় তরোয়াল নাকি ছিল খুব শক্ত ও ধারালো। কুম্ভকারের মৃৎশিল্পের প্রচলন ছিল খুব। কুম্ভকারের উল্লেখ ২/১ টি লিপিতে আছে (যথা, বৈদ্যদেবের কমীেলি লিপি), এবং একাধিক লিপিতে কুম্ভকার-গর্তের উল্লেখও আছে (যথা, নিধনপুর লিপি)। এই উল্লেখ-প্রসঙ্গ হইতে মনে হয়, কুম্ভকার-বৃত্তির কেন্দ্র ছিল গ্রাম। পোড়ামাটির নানা প্রকারের থালা, বাটি, জলপাত্র, রন্ধনপাত্র, দোয়াত, প্ৰদীপ ইত্যাদি। পাহাড়পুরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে, বজযোগিনীর সন্নিকটস্থ রামপালে, ত্রিপুরায় ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া গিয়াছে। পাহাড়পুর, মহাস্থান, সাভার ইত্যাদি স্থানে প্রাপ্ত অসংখ্য পোড়ামাটির ফলকও বিস্তৃত মৃৎশিল্পের সাক্ষ্য বহন করিতেছে।
শ্ৰীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দ-কেশবের শাসনে আমরা রাজবিগ নামে জনৈক দন্তকারের উল্লেখ পাইতেছি; মনে হইতেছে, হস্তিদন্ত-শিল্পের প্রচলনও ছিল, কেশবসেনের ইদিলপুর লিপিতে দ্বিপদন্ত-দণ্ড শিবিকার উল্লেখ পাইতেছি। সূত্রধরের উল্লেখও কয়েকটি লিপিতে পাইতেছি। আশ্চর্যের বিষয় এই, ইহাদের উল্লেখ তাম্রপট্টগুলির খোদাইকররূপে; লিখিত শাসন ইহারাই তাম্রপট্টে উৎকীর্ণ করিতেন। এই অর্থে আমরা এখন আর এই শব্দটি ব্যবহার করি না, কিন্তু যে-যুগের কথা আমরা বলিতেছি সেযুগে যে ব্যবহৃত হইত, তাহাতে সন্দেহ নাই। না হইবারও কারণও নাই। সূত্ৰধর যে শুধু কাঠ-মিস্ত্রী, তাহাই নয়; আমাদের প্রাচীন বাস্তু-শাস্ত্ৰে (যেমন, মানসারে) সূত্রধর বলিতে স্থপতি, তক্ষণকার, খোদাইকর, কাঠ-মিস্ত্রী সকলকেই বুঝাইত। কাঠের শিল্পের প্রচলনও কম ছিল না। কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি কালের ভ্ৰক্ষেপ উপেক্ষা করিয়া আজ আর বাঁচিয়া নাই, কিন্তু স্তম্ভ, খিলান, খুঁটি ইত্যাদির ২/৪ টি টুকরা আজও যাহা পাওয়া যায় তাহাদের কারু ও শিল্পনৈপুণ্য বিস্ময়কর। ঢাকার চিত্রশালায় তেমন নিদর্শন কয়েকটি আছে। সংসারের আসবাবপত্র, ঘরবাড়ি, মন্দির, পালকি, গোরুর গাড়ি, রথ, বিশেষভাবে নদীগামী নানাপ্রকার নৌকা ও সমুদ্রগামী বৃহদাকৃতি নৌকা বা জাহাজ ইত্যাদি সমস্তই তো ছিল কাঠের। সেই দিক দিয়া দেখিলে কাষ্ঠশিল্পের সমৃদ্ধি সহজেই অনুমেয়, এবং সমাজের মধ্যে এই শিল্পীদের একটা স্থানও ছিল। সাধারণ ভাবে শিল্পী ও শিল্পীগোষ্ঠীর কথার আভাস তো বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপির খোদাইকর রাণিক শূলপাণির “বারেন্দ্রক শিল্পীগোষ্ঠীচুড়ামণি” এই বিশেষণটির মধ্যেও আছে। তাহা ছাড়া, পঞ্চম হইতে অষ্টম শতকের তাম্রপট্টোলীগুলিতে ভূমি দান-বিক্রয় ব্যাপারে বিষয়পতি বা অন্য রাজপ্রতিনিধি রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে যে-কয়জন প্রধানের মতামত গ্ৰহণ করিতেন, অর্থাৎ যে-কয়জনে মিলিয়া অধিকরণ গঠিত হইত, তাহাদের মধ্যে প্রথম-কুলিক সর্বদাই অন্যতম। কুলিক অর্থ শিল্পী (artisan); এই প্রথম-কুলিক খুব সম্ভবত ছিলেন শিল্পীগোষ্ঠী বা নিগমের প্রধান প্রতিনিধি। নগরের অথবা বিষয়ের শ্রেষ্ঠ গণ্যমান্য শিল্পী যিনি ছিলেন, তিনিই এই জাতীয় অধিকরণে আসন লইবার জন্য আহুত হইতেন। রাজপাদােপজীবীদের মধ্যেও কোথাও কোথাও কুলিক বা শ্রেষ্ঠ শিল্পীর নাম পাওয়া যাইতেছে। পূর্বোল্লিখিত ভাটেরা গ্রামের গোবিন্দ-কেশবদেবের লিপিতে গোবিন্দ নামে এক কাংস্য অর্থাৎ কাংস্যকার বা কাসারীর উল্লেখ পাইতেছি। কঁাসা বা bell-metal এর শিল্পের আভাসও তাহা হইলে কিছু পাওয়া গেল। নানাপ্রকার মিশ্র ধাতুশিল্পের প্রমাণ ও পরিচয় আরও পাওয়া যায় অসংখ্য ব্রোঞ্জ ও অষ্টধাতুর রচিত মূর্তিগুলির মধ্যে।
