‘বাঙলাদেশের লোকেরা প্রচুর কার্পাস উৎপাদন করে, এবং তাহাদের কার্পাসের ব্যবসা ছিল খুব সমৃদ্ধ। পঞ্চদশ শতকে আর একজন চীন-পরিব্রাজক মা-হুয়ান (১৪০৫) বাঙলাদেশে আসিয়াছিলেন; সৈফুদ্দিন হামজা সাহ তখন গৌড়ের রাজা। কার্পাসবাস্ত্রের উল্লেখ ছাড়াও তাহার বিবরণটি অন্যান্য ধনসম্বলের পরিচয়ের দিক হইতে উল্লেখযোগ্য। চেহাটি-গান (চট্টগ্রাম) ও সোনা-উরু-কোঙ (সোনারগাঁ—সুবর্ণগ্রাম) উল্লেখের পর তিনি গৌড় রাজধানীর কথা বলিতেছেন, এই রাজ্যের নগরগুলি প্রাচীরবেষ্টিত; অধিবাসীরা কৃষ্ণবর্ণ এবং মুসলমান। ভাষার নাম বাঙলা, তবে পারস্য ভাষার ব্যবহারও আছে। মুদ্রার নাম টঙ্কা; অল্প মূল্যের জন্য কড়িও ব্যবহার করা হয়। সমস্ত বৎসর ধরিয়া চীনদেশের গ্ৰীষ্মকালের মতন গরম। নানা প্রকার ধান, যব, গম ও সর্ষপ এ দেশের প্রধান শস্য। এই দেশে নারিকেল, ধান, তাল ও কাজঙ্গ হইতে মদ তৈরি করা হয়, এবং সেই মদ প্রকাশ্যভাবে বিক্রয় করা হয়। উৎপন্ন ফলের মধ্যে কলা, কঁাটাল, আম, ডালিম ও ইক্ষু প্রধান। এ দেশে ছয় প্রকারের সূক্ষ কাপািসবন্ত্র প্রস্তুত হয়; এই বস্ত্ৰ সাধারণত প্রস্থে দুই এবং দৈর্ঘ্যে উনিশ হাত। এই দেশে রেশমের কীট পালিত হয় ও রেশমনির্মিত বস্ত্ৰ বয়ন করা হয়।…’
কার্পাস সম্বন্ধে একটু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে চর্যাগীতি-গ্ৰন্থ হইতেও। এই গ্ৰন্থ সহজিয়া গুহাসাধনার আনন্দ-সংগীত, ইহার অনেক পদের অর্থ সুস্পষ্ট নয়। তথাপি নানা রাগরাগিণীর এই গানগুলি যে সাধনার আনন্দ প্রকাশ করিতেছে, এ কথা সহজেই বুঝা যায়। এই গ্রন্থে শবরপাদের একটি পদে আছে:–
হেরি সে মেরি তাইলা বাড়ী খসমে সমতুলা।
সুকড় এসে রে কপাসু ফুটিলা ৷
তইলা বাড়ীর পাসেঁর জোহ্না বাড়ী উএলা।
ফিটেলি অন্ধ্যারি রে আকাশ ফুলিআ ৷।
ইহার প্রথম দুই লাইনের তিব্বতী অনুবাদ হইতে প্ৰবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় সংস্কৃত অনুবাদ করিয়াছেন এইরূপ:—“মম উদ্যানবাটিকাং দৃষ্টবা খসম-সমতুল্যাম। কার্পাসপুষ্পম প্রস্ফুটিতম অত্যৰ্থং আনন্দিতঃ ভবতি।” বাড়ির বাগানে কার্পাসফুল ফুটিয়াছে, দেখিয়াই আনন্দ, যেন ঘরের চারপাশ উজ্জ্বল হইল, আকাশের অন্ধকার টুটিল। ইহা হইতেই বুঝা যায়, কার্পাসকে কতখানি মূল্য দেওয়া হইত তদানীন্তন বাঙলাদেশে। শান্তিপাদের একটি পদে আছে:–
তুলা ধুনি আঁসুরে আঁসু।
আঁসু ধুনি ধুনি নিরবীর সোসু ॥
তুলা ধুনি ধুনি সুনে আহারিউ।
পুন লইয়া অপনা চটারিউ ৷
ভাবাৰ্থ এই : তুলা ধূনিয়া ধুনিয়া আঁশ তৈরি করা হইতেছে, আঁশ ধূনিয়া ধুনিয়া আর কিছু বাকি নাই। তুলা ধুনিয়া ধুনিয়া শূন্যে উড়াইতেছি; আবার তাহাই লইয়া ছড়াইয়া দিতেছি। হয়তো ইহার গৃঢ় অর্থ আছে; কিন্তু তুলা ধুনিবার যে ইহা একটি বাস্তব চিত্র, তাহাতে আর সন্দেহ কি? কাহ্নপাদের একটি পদে তাঁতবিক্রয়ের কথাও আছে; সাধারণত ডোমনীরাই বোধ হয় তাত (বাঁশের) তৈরি করিত [তান্তি বিকণঅ ডোম্বী অবর না চাংগেড়া (বাঁশের চাঙাড়ি)]। আর একটি পদের রচয়িতার নাম পাইতেছি। তন্ত্রীপাদ। তন্ত্রীপাদের বুৎপত্তিগত অর্থ হইতেছে, তাত-শিক্ষক অথবা তীতি-গুরু। ইহাই বোধহয় এই পদ-রচয়িতার পূর্বতন বৃত্তি ছিল। পরে তিনি ‘সিদ্ধা হইয়াছিলেন। এই অনুমানের কারণ পদটির ভিতরেই আছে। ইহার মূল বাঙলা পাওয়া যায় নাই; তবে তিব্বতী অনুবাদ হইতে প্ৰবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় যে সংস্কৃত অনুবাদ করিয়াছেন, তাহার কিয়দংশ হইতে বুঝা যাইবে, গীত ও সাধন-সংবদ্ধ সমস্ত রূপকটি গড়িয়া উঠিয়াছে বস্ত্রবয়নকে অবলম্বন করিয়া।
কালপঞ্চকতন্ত্রং নির্মলং বঁস্ক্রিং বয়নং করোতি।
অহং তন্ত্রী আত্মনঃ সূত্রম।
আত্মনঃ সূত্রস্য লক্ষণং ন জ্ঞাতম ৷।
সাৰ্দ্ধত্ৰিহস্তং বয়নগতিঃ প্ৰসরতি ত্ৰিধা।
গগনং পূরণং ভবতি অনেন বস্ত্ৰবয়নেন ৷।
নির্ধন ব্ৰাহ্মণের গৃহে নারীরা যে তুলা ধূনিয়া সূতা কাটিতেন তাহা কবি শুভাঙ্কের (আনুমানিক, একাদশ-দ্বাদশ শতক) একটি প্রশস্তি শ্লোকে জানা যায়।
“কাপাসাস্থিপ্রচয়নিচিন্তা নিধান শ্রোত্ৰিয়াণাং
যেষাং বাত্যাপ্রবিতত কুটীপ্রাঙ্গণান্তা বভুবুঃ ।” (সদুক্তিকর্ণামৃত)।
সমসাময়িক কালেরই আর একজন অজ্ঞাতনামা কবি বঙ্গ-বারাঙ্গনাদের সূক্ষ্ম বসনের (বাসঃ সূক্ষ্মং বপুষি)। উল্লেখ করিয়াছেন (সদুক্তিকর্ণামৃত)। চতুর্দশ শতকে তীরভূক্তিবাসী জ্যোতিরীশ্বর তাহার বর্ণরত্নাকর গ্রন্থে বাঙলাদেশের ‘মেঘ-উদুম্বর’, ‘গঙ্গা-সাগর’, ‘লক্ষ্মীবিলাস’, ‘সিলহটী’ (শ্ৰীহট্ট-জাত), ‘গাঙ্গেরী’ ইত্যাদি পট্ট ও নেতবস্ত্রের উল্লেখ করিয়াছেন।
উপরের এই আলোচনা হইতেই বুঝা যাইবে, কার্পাসের চাষ, গুটিপোকার চাষ, কার্পাস ও অন্যান্য বস্ত্ৰশিল্পই ছিল প্রাচীন বাঙলার সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত শিল্প এবং ধনোৎপাদনের অন্যতম উপায়। পট্টবস্ত্ৰ বা পাটের কাপড়ের শিল্পও ছিল, এবং নানা উপলক্ষে, বিশেষভাবে পূজা, ব্ৰত, বিবাহানুষ্ঠান ইত্যাদি ব্যাপারে। পট্টবস্ত্রের ব্যবহারেরও খুব প্রচলন ছিল। মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে পট্টবস্ত্রের উল্লেখ সুপ্রচুর। পাটের চাষ এখনকার মতো বিস্তৃত না হইলেও ছিল যে সন্দেহ নাই, এবং পাটের কচিপাতা বা নালিত শাক এখনকার মতো তখনও বাঙালীর প্রিয় খাদ্য ছিল। প্রাকৃত-পৈঙ্গল-গ্রন্থে সে কথার প্রমাণ আছে, অন্যত্র তাহা উল্লেখ করিয়াছি।
