এখানে রাঢ়দেশের জাঙ্গলখণ্ডে লৌহখনির উল্লেখ আমরা পাইতেছি। বঁকুড়া-বীরভূমে-সাঁওতালভূমে তো এখনও জায়গায় জায়গায় লোহা আহরণ এবং লোহার তৈজসপত্র, গৃহোপযোগী অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি তৈরি করা স্থানীয় দরিদ্রতর জনসাধারণের জীবন-ধারণের অন্যতম উপায়। এ-সব জায়গায় লোহা গলানোর পদ্ধতিও প্রাগৈতিহাসিক। ভারতবর্ষের বৃহত্তম লৌহ কারখানা তো এখনও বাঙলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমা-সংলগ্ন। তাম্র বা তামা সম্বন্ধেও প্রায় একই কথা। সুবর্ণরেখার তীর ধরিয়া জামশেদপুর এবং তারপর পশ্চিমে চক্ৰধরপুর ছাড়াইয়া সমানেই তাম্রসমাবেশ এবং তাম্রখনিনিচয়। আমার তো মনে হয়, তাম্রলিপ্ত নামটির মধ্যেও এই তাম্রাসমৃদ্ধির স্মৃতি জড়িত। এই স্মৃতিও প্রাগৈতিহাসিক।
বাঙলাদেশের হীরাসমৃদ্ধির প্রমাণ আরও কিছু আছে। রত্নপরীক্ষা, বৃহৎসংহিতা, নবরত্নপরীক্ষা, রত্নসংগ্ৰহ প্রভৃতি গ্রন্থে সর্বত্রই উল্লেখ আছে, পৌণ্ডদেশ এক সময় হীরার জন্য বিখ্যান্য ছিল; অগস্তিমত-গ্রন্থের মতে বঙ্গেও কিছু কিছু হীরা পাওয়া যাইত। তবে, মনে হয়, এই সমৃদ্ধি খ্রীস্টপূর্ব শতকের; পেরিপ্লাস-গ্রন্থের সময় সে সমৃদ্ধি আর ছিল না। পেরিপ্লাসে গাঙ্গেয় মুক্তার উল্লেখের কথা আগেই বলা হইয়াছে; তাহা ছাড়া, রত্নপরীক্ষা গ্রন্থে এবং মহাভারতের সভাপর্বে পূর্বদেশে সমুদ্রতীরের জনপদগুলিতে মুক্তাসমৃদ্ধির উল্লেখ আছে।
পশুপক্ষী, হাতি, হরিণ, মহিষ, বরাহ, ব্যাঘ্র ইত্যাদি
বাঙলাদেশের রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও সংস্থাপনার মধ্যে হন্তীর একটি প্রধান স্থান ছিল। গ্ৰীক ঐতিহাসিকদের বিবরণীতে পাই, Prasio = প্রাচ্য ও Gangaridae = গঙ্গারাষ্ট্রের সম্রাট Agrammes বা ঔগ্রসৈন্যের সামরিক শক্তি অনেকটা হস্তীর উপর নির্ভর করিত। পাল ও সেন রাজাদের হস্তী, অশ্ব ও নৌবল লইয়াই ছিল সামরিক শক্তি। এই হস্তী আসিত কোথা হইতে? কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰে আছে, কলিঙ্গ, অঙ্গ, করূষ এবং পূর্বদেশীয় হন্তীই হইতেছে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই পূর্বদেশ বলিতে কৌটিল্য বাঙলাদেশ, বিশেষভাবে উত্তর-বঙ্গ ও কামরূপের পার্বত্য অঞ্চলের কথা বলিতেছেন, তাহা অনুমান করা যাইতে পারে। এখনও তো গারো পাহাড় অঞ্চল হাতির জায়গা। আর এই বাঙলাদেশেই তো পরবর্তী কালে হাতি ধরার এবং হন্তী-আয়ুৰ্বেদ নামে এক বিশেষ বিদ্যা ও শাস্ত্রের উদ্ভব হইয়াছিল, সে কথা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় বহুদিন আগেই প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন। প্রাচীন গৌড়দেশ যে হাতির জন্য বিখ্যাত ছিল তাহা রাজতরঙ্গিণীর কবির নিকটও সুবিদিত ছিল। প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র দেশও একই কারণে বিখ্যাত ছিল, তাহা মেগাস্থিনিসের বিবরণে, এবং কামরূপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (গারো পাহাড়ে?) যুথবদ্ধ হাতি বিচরণ করিত তাহা যুয়ান-চোয়াঙের বিবরণে জানা যায়। জীবজন্তু পশুপক্ষীও দেশের ধন-সম্বলের মধ্যে গণ্য। হাতি ছাড়া অন্যান্য পশুর উল্লেখ কিছু কিছু বাঙলার লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতে একটি গহন বন কাটিয়া নূতন এক গ্রাম পত্তন করিবার কথা আছে; সেই বনে যে-সব জীবজন্তুর উল্লেখ আছে তাহার মধ্যে হরিণ, মহিষ, বরাহ, ব্যাঘ্র ও সর্প অন্যতম। আদিম বাঙালীর সর্প ও ব্যাঘ্র-ভীতি সুবিদিত, এবং এই দুইটি প্রাণী ভয় দেখাইয়া কী করিয়া তাহাদের পূজা আদায় করিয়াছিল তাহাও এখন আর অবিদিত নয়। মধ্যযুগে মনসাপূজা এবং দক্ষিণরায় বা ব্যাঘ্ৰপূজার বিস্তৃত প্রচলন এই দুইটি প্রাণী হইতেই। বনবহুল বৃষ্টিবহুল গ্ৰীষ্মপ্রধান এই দেশে এই দুয়েরই অপ্রতিহত প্রভাব। বিশেষভাবে বনময় জলময় সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলি তো এই দুই প্রাণীর লীলাস্থল। পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলকগুলিতে এবং কোনও কোনও প্রস্তরচিত্রে আরও অন্যান্য নানা জীবজন্তুর পরিচয় পাওয়া যায়; তাহার মধ্যে গোরু, বানর, হরিণ, শূকর, ঘোড়া ও উট উল্লেখযোগ্য। শেষোক্ত দুইটি প্রাণী বিদেশাগত, সন্দেহ নাই এবং যুদ্ধ ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত ব্যাপারেই হয়তো ইহাদের আমদানি হইয়াছিল। পক্ষীর উল্লেখ ও পরিচয় কমই পাওয়া যায়; তবে হাঁস, বন্য ও গৃহপালিত কুকুট, কপোত, নানা জাতীয় জলচর বিহঙ্গ, কাক ও কোকিলের উল্লেখও পরিচয় লিপিগুলিতে, মৃৎ ও প্রস্তর চিত্রে ও সমসাময়িক সাহিত্যে দুর্লভ নয়। বাঘ, হরিণ, বন্য মহিষ, নানা প্রকার হাঁস, বানর ইত্যাদি যে বাঙলার সাধারণ বন্য প্রাণী তাহা মধ্যযুগের Ralph Fitch (1583-91)- Fernandes (1598)- Fonseca (1599) প্রভৃতি পর্যটকদের বিবরণী পড়লেও জানিতে পারা যায়।
০৪. শিল্পজাত দ্রব্যাদি : বস্ত্ৰশিল্প
বাঙলার শিল্পজাত দ্রব্যাদির কথা বলিতে গিয়া প্রথমেই বলিতে হয় বস্ত্রশিল্পের কথা। বাঙলাদেশের বস্ত্রশিল্পের খ্যাতি শ্ৰীস্টের জন্মের বহু পূর্বেই দেশে-বিদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, এবং ইহাই যে এ দেশের প্রধান শিল্প ছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰে, Periplus of Erythrean Sea নামক গ্রন্থে, আরব, চীন, ও ইতালীয় পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের বৃত্তান্তের মধ্যে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের সাক্ষ্যই প্রথম উদ্ধৃত করা যাক। কৌটিল্য বলিতেছেন, বঙ্গদেশের (বাঙ্গক।) দুকুল খুব নরম ও সাদা; পুণ্ড্রদেশের (পৌণ্ডক) দুকূল শ্যামবর্ণ এবং দেখিতে মণির মতো পেলাব; সুবর্ণকুড্যদেশের (কামরূপ) দুকুলের রং নবেদিত সূর্যের মতন। টীকাকার যোজনা করিতেছেন, দুকুল বস্ত্র খুব সূক্ষ্ম, ক্ষৌম বস্ত্র একটু মোটা। পত্রোর্ণ (জাত) বস্ত্ৰ মগধ (মাগধিকা), সুবর্ণকুড্যক (সীেবর্ণকুড্যকা) অর্থাৎ কামরূপ এবং পুণ্ড্রদেশে (পৌণ্ডিকা) উৎপন্ন হইত। পত্রোর্ণজাত বস্ত্ৰ বোধহয় এণ্ডি ও মুগাজাতীয় বস্ত্ৰ (পত্ৰ হইতে যাহার উর্ণা = পত্রোর্ণ?)। আমরকোষের মতে পত্রোর্ণ সাদা অথবা ধোয়া কৌষেয় বস্ত্ৰ; টীকাকার পরিষ্কার বলিতেছেন, কীটবিশেষের জিহ্বারস কোনও কোনও বৃক্ষপত্রকে এই ধরনের উর্ণায় রূপান্তরিত করে। লক্ষণীয় এই যে, কৌটিল্যোক্ত দেশগুলিতে এখন খুব ভাল এণ্ডি-মুগাজাতীয় বস্ত্ৰ উৎপন্ন হয়, বিশেষভাবে কামরূপে। পুণ্ড্রদেশে যে শুধু দুকুল ও পত্রোর্ণ বস্ত্ৰ উৎপন্ন হইত। তাঁহাই নয়, মোটা ক্ষৌম বস্ত্ৰও উৎপন্ন হইত, কৌটিল্য সেকথাও বলিতেছেন। শ্রেষ্ঠ কার্পাসবস্ত্র উৎপন্ন হইত মধুরা (মাদুরা), অপরান্ত, কলিঙ্গ, কাশী, বঙ্গ, বৎস এবং মহিষ জনপদে। বঙ্গে শ্বেতম্বিন্ধ দুকুল যেমন উৎপন্ন হইত, তেমনই শ্রেষ্ঠ কাপাসাবস্ত্রেরও অন্যতম উৎপত্তিস্থল ছিল এই দেশ ৷ বঙ্গে ও পুণ্ডে প্রাচীনকালে তাহা হইলে চারিপ্রকার বস্ত্ৰশিল্প ছিল—দুকুল, পত্রোর্ণ, ক্ষৌম ও কাপসিক। প্রাচীন বাঙলার এই সম্পদের কথা গ্ৰীক ঐতিহাসিকেরা বারবার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। ইহার রপ্তানির উল্লেখ পাওয়া যায়। Periplus গ্রন্থে। Schoff-এর ইংরেজী অনুবাদটুকু সমস্তই উদ্ধৃত করিতেছি। এইজন্য যে, এই উপলক্ষে আমাদের দেশের অন্যান্য রপ্তানি দ্রব্যেরও কিছু কিছু খবর পাওয়া যাইবে। হিমালয়ের সানুদেশে পার্বত্য অসভ্য কিরাত জাতিদের উল্লেখের পরেই বলা হইতেছে;
