প্রাকৃত বাঙালীর খাদ্য । অগুরু, কস্তুরী ইত্যাদি
এইসব ছাড়া আরও কিছু কিছু ভূমিজাত অথবা বৃহত্তর অর্থে কৃষি-সম্পর্কিত দ্রব্যাদির খবর ইতস্তত অনুসন্ধানে জানা যায়। যেমন, বিদ্যাপতি তাহার কীর্তিকৌমুদী গ্রন্থে গৌড়দেশকে “আজ্যসার গৌড়” বলিয়া বিশেষিত করিয়াছেন। আজ্য অর্থে ঘূত; আজ্য বা ঘূত যে গৌড়দেশের শ্রেষ্ঠ বস্তু, সেই গৌড় হইল আজ্যসার গৌড়; তাহাকে রাজা মোদকের মতন করতলগত করিয়াছিলেন। চতুর্দশ শতকের অপভ্রংশ ভাষায় রচিত প্রাকৃত-পৈঙ্গল গ্রন্থের একটি পদে প্রাকৃত বাঙালীসুলভ যে আহার্য-বৰ্ণনা আছে, তাহাতে কলাপাতায় ওগরা ভাত ও নালিতা শাক এবং মীেরলা মাছের সঙ্গে সঙ্গে গব্য (মহিষের নয়) ঘূত ও দুগ্ধের উল্লেখ আছে। সন্ধ্যাকর নদীর রামচরিতে দেখিতেছি, বরেন্দ্রভূমিতে এলাচের সুবিস্তৃত চাষ ছিল; সেইসব ক্ষেতে খুব ভালো এলাচ উৎপন্ন হইত। প্রিয়ঙ্গুলতাও উৎপন্ন হইত। প্রচুর। এলাচ ও প্রিয়ঙ্গু-সরিষা। যেমন হইত। লবঙ্গও জন্মাইত তেমনই প্রচুর। সরিষার বাণিজ্যিক চাহিদা কেমন ছিল জানা নাই, কিন্তু ভারতবর্ষ হইতে অন্যান্য মসলার সঙ্গে সঙ্গে এলাচ ও লবঙ্গ যে প্রচুর পরিমাণে এশিয়া, মিশর এবং পূর্ব ও দক্ষিণ যুরোপে রপ্তানি হইত, পেরিপ্লাস-গ্রন্থে ও টলেমির ইণ্ডিকা-গ্রন্থেই সে প্রমাণ আছে। রাজশেখর তাহার কাব্য-মীমাংসা গ্রন্থে পূর্বদেশে ১৬টি জনপদের উল্লেখ করিয়াছেন— যথা, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, কোশল, তোসল, উৎকল, মগধ, মুদগর (মুদগগিরি = মুঙ্গের), বিদেহ, নেপাল, পুণ্ড্র, প্রাগ-জ্যোতিষ, তাম্রলিপ্তক, মলদ, মল্লবর্তক, সুহ্ম ও ব্রহ্মোত্তর। এই ষোলটি জনপদের উৎপন্ন দ্রব্যের ক্ষুদ্র একটি তালিকাও তিনি দিয়াছেন, যথা, লবলী, গ্রস্থিলর্ণক, অগুরু, দ্রাক্ষা, কস্তুরিকা। এই তালিকা রাজশেখর কী উদ্দেশ্যে করিয়াছিলেন, বলা শক্ত; কিন্তু এ কথা বুঝা শক্ত নয় যে, তিনি গন্ধদ্রব্য এবং আয়ুৰ্বেদীয় উপকরণের একটি ক্ষুদ্র তালিকা মাত্র দিয়াছেন। এই তালিকায় দ্রাক্ষা দ্রব্যটি সন্দেহজনক। যে কয়টি দেশের নাম তিনি করিয়াছেন তাহাদের কোথাও দ্রাক্ষা জন্মানো প্রায় অসম্ভব বলিলেই চলে। আমার মনে হয়, দ্রব্যটি হইবে লাক্ষা; এটি লিপিকর-প্রমাদ, অশুদ্ধ পাঠ। দ্রাক্ষা হয় না বটে, কিন্তু পূর্ব-ভারতের অনেক স্থানে লাক্ষা জন্মায়। এই ষোলোটি জনপদের চারিটি বর্তমান বাঙলাদেশে; যথা, পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্তক, সুহ্ম ও ব্রহ্মোত্তর। লাক্ষা রাঢ়দেশে ও উত্তরবঙ্গে বা বরেন্দ্রভূমিতে এখনও জন্মায়। অগুরু বাঙলাদেশে কোথাও জন্মায় কিনা, জানি না; তবে কামরূপের নানা জায়গায় জন্মায়, তাহার প্রমাণ পাইতেছি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ও তাহার টীকায়। ইবন খুর্দদবা নামে একজন আরব ভৌগোলিক (দশম শতক) রহমি দেশে (রহন = আরাকান)। অগুরুকাষ্ঠ জন্মায়, এ কথা বলিতেছেন। কস্তুরী বা কিন্তুরিকা নেপালে হিমালয়ের পাদদেশে হয়তো পাওয়া যাইত; পূর্বদেশের অন্য কোনও জনপদে কন্তুরী-মৃগের বিচরণস্থান ছিল বলিয়া জানি না, তবে কিন্তুরিকা নামে একপ্রকার ভৈষজ্য আছে; রাজশেখর তাহারও ইঙ্গিত করিয়া থাকিতে পারেন। লবলী বরেন্দ্রীতে প্রচুর জন্মাইত; তাহার উল্লেখ রামচরিতে আছে (৩, ১১)। এই শ্লোকেই উল্লিখিত আছে যে, বরেন্দ্রী দেশে বড় বড় লকুচি, শ্ৰীফল ও খাদ্যোপযোগী কন্দমূল জন্মাইত।
হীরা, মুক্তা, সোনা, রূপা, তামা, লোহা ইত্যাদি
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের টীকাকার বাঙলাদেশের একটি আকরজ দ্রব্যের খবর দিতেছেন। কৌটিল্য যে অধ্যায়ে মণিরত্নের খবর বলিতেছেন, সেই অধ্যায়ে হীরামণির উল্লেখ আছে। টীকাকার এই হীরামণির খনি কোথায় কোথায় ছিল, তাহা একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা দিয়াছেন; এই তালিকার দুইটি জনপদ নিঃসন্দেহে বাঙলাদেশে; তাহাদের নাম, টীকাকারের ভাষায়—পৌণ্ডক এবং ত্রিপুর (= ত্রিপুরা)। জৈন আচারাঙ্গ সূত্রের মতে, রাঢ়দেশের দুইটি বিভাগ ছিল বজ্রভূমি ও সুবভিভূমি (=সুহ্মভূমি)। বজ্রভূমিতে খুব সম্ভব হীরার খনি ছিল; তাহা হইতেই হয়তো বজাতৃভূমি নামের উৎপত্তি। আইন-ই-আকবরী-গ্রন্থে কিন্তু মদারণ বা গড়মন্দারণে এক হীরার খনির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই ভূমি হয়তো পশ্চিম দিকে বিহার-সীমায় অবস্থিত কোখরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জাহাঙ্গীরের আমলে কোখরায় একাধিক হীরাখনির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। আর একটি আকরজ দ্রব্যের উল্লেখও অর্থশাস্ত্ৰে দেখা যায়। গৌড়িক নাম কয়েকপ্রকার খনিজ-রৌপ্যের নাম কৌটিল্যা করিয়াছেন, এবং তাহা যে গৌড়দেশোৎপন্ন, তাহাও তিনি বলিয়াছেন। টীকাকার বলিতেছেন, এই রৌপ্যের রঙ অগুরু। ফুলের মতন। আর একটি খনিজ দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায় কতকটা অর্বাচীন একটি গ্রন্থে—ভবিষ্যপুরাণে। এই গ্রন্থ কতটা প্রাচীন এবং ইহার ব্ৰহ্মখণ্ড প্রক্ষিপ্ত, না মূল গ্রন্থের সমসাময়িক, বলা কঠিন। ইহার ব্ৰহ্মখণ্ডে রাঢ়দেশের জাঙ্গল-বিভাগের বিবরণে আছে
ত্ৰিভাগজাঙ্গলং তত্ৰ গ্ৰামশৈচবৈকভাগকঃ
স্বল্প ভূমিরুর্বরা চ বহুলা চোষরা মতাঃ।
রারী (ঢ়ী) খণ্ডজাঙ্গলে চ লৌহধাতোঃ কাচিৎ ক্কচিৎ
আকারো ভবিতা তত্ৰ কলিকালে বিশেষতঃ ॥
