আম, মহুয়া, কাঁটাল ও অন্যান্য ফল
অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতকের শেষ পর্যন্ত সমস্ত লেখমালাগুলি এবং রামচরিত ও অন্যান্য গ্রন্থ বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গেল, ধান্য এবং অন্যান্য শস্য ছাড়া প্রাচীন বাঙলার প্রধান ভূমি ও কৃষি জাত দ্রব্য হইতেছে, আম্র অথবা সহকার, মধুক অর্থাৎ মহুয়া, পনস অর্থাৎ কাঁটাল, ইক্ষু, ডালিম্ব বা দাড়িম্ব, পর্কটি, খর্জুর, বীজ, গুবাক অর্থাৎ সুপারি, নারিকেল, পান মৎস্য ও লবণ। আমি তো বাঙলাদেশের সর্বত্রই জন্মায়, কম-বেশি এই মাত্র; এইজন্যই প্রায় সব-কাটি লিপিতেই আমের উল্লেখ আছেই। মহুয়ার উল্লেখ যো-কাটি লিপিতে এবং অন্যান্য জায়গায় আছে। প্রত্যেকটিরই স্থানের ইঙ্গিত উত্তর-বঙ্গে, শুধু ইরদা তাম্রপট্টের ইঙ্গিত মেদিনীপুর জেলার দাঁতনের দিকে। মহুয়ার চাষ এই অঞ্চলে নিশ্চয়ই তখন ছিল, এখনও কিছু কিছু আছে। ঈশ্বর ঘোষের রামগঞ্জশাসনেও মহুয়া বা মধুকের উল্লেখ দেখা যায়। পনস অর্থাৎ কঁাটালের ইঙ্গিত পাইতেছি। বিশেষভাবে পূর্ব-বাঙলায়, ঢাকা অঞ্চলে। য়ুয়ান-চোয়াঙ কিন্তু বলিতেছেন কাঁটাল প্রচুর জন্মাইত পুণ্ড্রবর্ধনে, অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে, এবং সেখানে এই ফলের আদরও ছিল খুব। গুবাক ও নারিকেল তো এখনও প্রচুরতর পরিমাণে জন্মায় বাঙলার গঙ্গা-পদ্মা-ভাগীরথী-করতোয়া ও বিশেষভাবে সমুদ্রতীর-নিকটবতী অঞ্চলগুলিতে; আশ্চর্যের বিষয় কিছু নয়, লেখমালার ইঙ্গিতও তাই। ইক্ষুর কথা তো আগেই বলিয়াছি; বিচিত্র উল্লেখ হইতে মনে হয়, ইক্ষুচায্যের প্রধানতম স্থান ছিল। উত্তর-বঙ্গ, তবে গঙ্গা-ভাগীরথীবাহিত দেশগুলিতেও বোধ হয় কিছু কিছু জন্মাইত। এক ডালিম্ব ক্ষেত্রের উল্লেখ পাইতেছি লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর-পট্টোলীতে; ইহার অবস্থিতি ছিল বর্তমান হাওড়া জেলায় বেতড় গ্রামের নিকটেই, গঙ্গাতীরের সন্নিকটে। পৰ্কটি বৃক্ষের উল্লেখ পাইতেছি। একাধিক পট্টোলীতে; ইহাদের মধ্যে ধর্মাদিত্যের কোটালিপাড়া-শাসন অন্যতম। বীজফল ও খেজুরের উল্লেখ তো ধর্মপালের খালিমপুর-লিপিতেই আছে। কদলী বৃক্ষ বা ফলের উল্লেখ কোনও পট্টোলীতে বড় একটা দেখা যাইতেছে না; কিন্তু পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলকে এবং নানা প্রস্তরচিত্রে বারবার ফলসমন্বিত বা ফলবিযুক্ত কলাগাছের চিত্ৰ দেখিতে পাওয়া যায়। সেই অস্ট্রিক আদি অস্ট্রেলীয় আমল হইতেই কলা বাঙালীর প্রিয় খাদ্য। উত্তর-রাঢ়ে, বরেন্দ্রীতে গুবাক ও নারিকেলের উল্লেখ পাইতেছি, সন্দেহ নাই; শুধু যে লিপিগুলিতেই আছে তাহা নয়, রামচরিতেও আছে। এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ আছে যে, বরেন্দ্রীর মাটি নারিকেল উৎপাদনের পক্ষে খুব প্রশস্ত। যাহাই হউক, বাঙলাদেশের সর্বত্রই তো সুপারি-নারিকেল জন্মায়, তবু অধিক উল্লেখ পাই বঙ্গে বিক্রমপুর-ভাগে, সুন্দরবনের খাড়িমণ্ডলে, বঙ্গের নাব্য অর্থাৎ নিম্ন জলাভূমি অঞ্চলে, ঢাকা জেলার পদ্মাতীরবর্তী ভূমি অঞ্চলে। খড়গবংশীয় রাজা দেবখড়েগির (অষ্টম শতক) আম্রফপুর তাম্র-পট্টোলী (২নং) দ্বারা তলপািটক গ্রামে / পািটক ভূমি দান করা হইতেছে, এবং এই ভূমিখণ্ডে যে দুইটি সুপারি বাগান(গুবাক বাস্তুদ্বয়েন সহ) আছে তাহা স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দেওয়া হইতেছে। ইহা হইতেই বুঝা যাইবে, ধন-সম্বল হিসাবে সুপারির আদর কতটুকু ছিল। পানের বরজের উল্লেখ যে পাই, সে-ও বঙ্গের নাব্য প্রদেশে; অন্যান্য স্থানেও হইত সন্দেহ নাই। মৎস্যের সবিশেষ উল্লেখ বাঙলার কোনও লিপি অথবা শাসনে নাই, কিন্তু যখনই ভূমি দান করা হইয়াছে, সজল অর্থাৎ জলাধার, খাল, বিল, প্ৰণুল্লী, নালা, পুষ্করিণী ইত্যাদির অধিকার সমেতই দান করা হইয়াছে; অষ্টম শতক-পরবর্তী শাসনগুলিতে সর্বত্রই তাহার উল্লেখও আছে। এই যে ‘সজল ভূমি দান, ইহা সমৎস্য দান, এই অনুমান কিছু অসংগত নয়। তাহা ছাড়া, এই নদ-নদী বহুল খালবিলাকীর্ণ বাঙলাদেশে মৎস্য যে একটি প্রধান সামাজিক ধনসম্পদ প্রাচীন কালেও ছিল, তাহাও সহজেই অনুমেয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অরণ্য এবং বহু ক্ষেত্রেই ঝাটবিটপ, তরুষণ্ডাদিসহ ভূমি দান করা হইয়াছে; ইহার আয়ও কম ছিল না। ঝাট অথবা ঝাড় আমার তো বাঁশের ঝাড় বলিয়াই সন্দেহ হয়, এবং অরণ্য ও বিটপ যে কাঠের কঁচামাল তাহাও সুস্পষ্ট। বাঁশ ও কাঠ এখনও পর্যন্ত বাঙলাদেশের অন্যতম ধন-সম্বল “লবণ ঠিক কৃষিজাত অথবা ভূমিজাত দ্রব্য না হইলেও এইসঙ্গেই উল্লেখ করা যাইতে পারে। এ কথা অনেকেই জানেন, বাঙলার সমুদ্রতীরের নিম্নভূমিগুলিতে কিংবা পদ্মার উজান বাহিয়া জোয়ারের জল সামুদ্রিক লবণ বহন করিয়া আনে। এই অঞ্চলের লোকেরা কী করিয়া লবণ প্রস্তুত করে, তাহা আগেই বলিয়াছি। সেইজন্যই দেখা যাইবে, উল্লিখিত শাসনগুলিতে যেখানে ‘সলবণ ভূমি দান করা হইতেছে, সেই ভূমি সর্বদাই সমুদ্রতীরবর্তী নিম্নভূমিতে অথবা পদ্মার তীরে তীরে, ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ -নারায়ণগঞ্জের পদ্মাতীরে মেদিনীপুর জেলার দাঁতন, চট্টগ্রামে। বিক্রমপুরে প্রাপ্ত শ্ৰীচন্দ্রের ধুল্লা-শাসনে যে লোনিয়াজোড়া- প্রস্তরের উল্লেখ আছে, তাহা যে লবণের গর্তের মাঠ এমন ধারণা বোধ হয় সহজেই করা চলে। ইহাও বিক্রমপুর অঞ্চলে।
